মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — সপ্তম পর্ব: রাজুর সাথে দেখা
পাড়ার রাস্তায় সাইকেল নিয়ে যাচ্ছিল একজন। চুল পাতলা, পিঠ একটু বাঁকা। কিন্তু সেই হাঁটার ভঙ্গি। পঁচিশ বছর পর — 'রাজু?' — সে ঘুরে তাকাল। এক শব্দে বলল, 'আয়।' পলুর মা বললেন — 'শুধু পাশে ছিলি। সেটাই যথেষ্ট ছিল।'
একটি স্মৃতির উপন্যাস
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর
“রাজুর সাথে দেখা”
দ্বিতীয় দিনের সকাল।
সকাল সাতটা। ডিসেম্বরের কুয়াশা এখনও কাটেনি পুরো। পাড়ার চায়ের দোকানে বসেছে অনিমেষ। এক কাপ লাল চা নিয়ে। রোদ উঠতে শুরু করেছে।
তখন দেখল।
রাস্তার উল্টো দিকে একজন মানুষ সাইকেল নিয়ে যাচ্ছে।
চুল পাতলা হয়েছে। বয়স হয়েছে। কিন্তু সেই হাঁটার ভঙ্গি। সেই কাঁধের ভঙ্গি।
পঁচিশ বছর পরেও মানুষের হাঁটার ভঙ্গি বদলায় না।
অনিমেষ চা রেখে উঠে দাঁড়াল।
“রাজু?”
লোকটা থামল। সাইকেল থামল। ঘুরে তাকাল।
সেই চোখ। একটুও বদলায়নি।
দুজনে তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে। রাস্তার দুপাশ থেকে।
তারপর রাজু একটাই শব্দ বলল: “আয়।”
পঁচিশ বছর মুছে গেল।
![]()
— ✦ —
রাজুর বাড়ি ছোট কিন্তু পরিপাটি। উঠোনে গাঁদাফুল।
দুই ছেলে রাজুর। বড়টা কলেজে, ছোটটা ক্লাস সেভেন।
অনিমেষ রনিকে ফোন করে আনল। রনি আর রাজুর ছোট ছেলে উঠোনে খেলায় মাতল। দুজন বয়সের মানুষ চায়ের কাপ নিয়ে বসল।
“ঢাকায় গিয়েছিলাম একবার,” রাজু বলল। “দুই বছর থেকেছিলাম। পারলাম না। ফিরে এলাম।”
“এখন কী করিস?”
রাজু হাসল। “নার্সারি আছে। গাছের নার্সারি।”
অনিমেষ অবাক হলো না। বরং মনে হলো — এটাই তো হওয়ার ছিল। রাজু গাছের কাছে থেকে গেছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাজু বলল, “সুখী?”
সরাসরি। কোনো ভূমিকা ছাড়া। ঠিক যেমন ছেলেবেলায় জিজ্ঞেস করত।
অনিমেষ হাসল। “মোটামুটি।”
“এটাই জীবন।”
দুজনেই হাসল।
— ✦ —
রাজু বলল, “পলুর মা আছেন। পাড়ার শেষে। একা থাকেন।”
অনিমেষ চুপ।
“যাবি?”
“হ্যাঁ।”
রাজু এগিয়ে গেল। অনিমেষ পেছনে। সেই পুরনো গলির মধ্য দিয়ে। ছেলেবেলায় এই গলিতে কতবার দৌড়েছে।
বাড়িটা ছোট। পুরনো। দরজায় একটা তুলসী গাছ। রাজু ডাকল, “কাকিমা!”
ভেতর থেকে শব্দ। একটু পরে বেরিয়ে এলেন একজন বৃদ্ধা। হাড় বেরিয়ে পড়েছে, চুল সম্পূর্ণ সাদা। কিন্তু চোখদুটো এখনো পরিষ্কার।
রাজু বলল, “কাকিমা, চিনতে পারছেন? অনি। আমার সেই বন্ধু।”
পলুর মা তাকালেন। অনেকক্ষণ তাকালেন।
তারপর বললেন, “অনি? রাজুর সেই বন্ধু?”
“হ্যাঁ।”
পলুর মা বললেন, “আয় ভেতরে।”
— ✦ —
ঘরে ঢুকতেই চোখ গেল দেয়ালে।
পলুর ছবি।
সেই হাসি। বদলায়নি। সেই মুখ যেটা সেই বৃষ্টির দুপুরে কাঁদছিল — সেই একই মুখ এখন ছবিতে হাসছে।
পলুর মা বললেন, “পলু তোর কথা বলত। বলত, ওই বৃষ্টির দিনে তুই পাশে ছিলি। শুধু পাশে বসেছিলি। বলিসনি কিছু।”
একটু থামলেন।
“বলেছিল — সেটাই যথেষ্ট ছিল।”
অনিমেষ কাঁদল। প্রথমবার। খোলামেলাভাবে।
পলুর মা কিছু বললেন না। শুধু হাত রাখলেন অনিমেষের হাতের উপর।
রাজু পেছনে দাঁড়িয়ে।
সেই নীরবতা। যেটা কথা দিয়ে ভরানো যায় না।

— ✦ —
ফেরার পথে রাজুর নার্সারিতে একটু বসল।
সব রকম গাছ। রাজু একে একে দেখাল। নাম বলল।
তারপর বলল, “দাঁড়া।”
ভেতর থেকে নিয়ে এলো একটা ছোট চারা। একটা ছোট টবে লাগানো।
জামরুল চারা।
“বাড়িতে নিয়ে যা। বারান্দায় রাখ।”
অনিমেষ চারাটা হাতে নিল।
“টবে হবে?”
“হবে। মাটিতে না হলেও হবে। জামরুল গাছ জেদি।”
অনিমেষ হাসল।
জামরুল গাছ জেদি। গাছেরাও মনে রাখে।
— ✦ —
ফেরার গাড়িতে রনি ঘুমিয়ে পড়েছে। হাসছে ঘুমের মধ্যে।
সুপর্ণা ফিসফিস করলেন — “স্বপ্ন দেখছে।”
“জামরুলের স্বপ্ন।”
বাবা পেছনে পলুর চারা কোলে নিয়ে বসে আছেন।

রাতে মোবাইলে লিখল অনিমেষ:
“আজ গেলাম। পলুর মা ছিলেন। রাজু ছিল।
পলু ছিল না। কিন্তু পলুর মা বললেন — শুধু পাশে থাকাটাই যথেষ্ট ছিল। এতদিনে বুঝলাম।
আমার কাজ শেষ।”
তারপর আরেকটা লাইন যোগ করল:
“মা, তুমি যেতে চেয়েছিলে। আজ আমি তোমাকে নিয়ে গেলাম। বুকের মধ্যে।”
যে কথা মনে পড়ে, সে হারায় না।
যে মানুষ মনে থাকে, সে মরে না।
পরের পর্বে
বারান্দায় জামরুল চারা, একটি অলস দুপুর, পুরনো কবিতার খাতা — এবং যে গল্প লেখার ছিল সেটা যেদিন লেখা হয়।
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর | পর্ব ৭ — রাজুর সাথে দেখা
