মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — ষষ্ঠ পর্ব: ফেরা
ডিসেম্বরের কুয়াশায় সেই পুরনো বাড়িতে ফিরল অনিমেষ। দেয়ালের রঙ বদলে গেছে, উচ্চতার দাগগুলো ঢাকা পড়েছে। কিন্তু সেই জামরুল গাছটা আছে — আরও বড়। বেয়াল্লিশ বছর বয়সে গাছে চড়ে একটা জামরুল পেড়ে দিল ছেলেকে। রনি বলল, 'বাবা, সত্যিই অন্যরকম!'
একটি স্মৃতির উপন্যাস
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর
“ফেরা”
ফেরা মানে শুধু ফিরে যাওয়া নয়।
ফেরা মানে হলো — যা ছিলে তার কাছে যাওয়া। যা হারিয়েছ তার সামনে দাঁড়ানো। যা ভুলে গেছ মনে করে ভুলিয়ে রেখেছিলে, তার চোখের দিকে তাকানো।
ফেরা সহজ নয়।
কারণ ফিরলে হিসাব দিতে হয়। নিজেকে। সেই পুরনো রাস্তাকে, সেই পুরনো গাছকে — হিসাব দিতে হয় যে তুমি কী নিয়ে গিয়েছিলে, আর কী হয়ে ফিরলে। সেই হিসাব সবসময় মেলে না।
— ✦ —
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে যাওয়ার পরিকল্পনা হলো।
রনির স্কুল বন্ধ। সুপর্ণার অফিসে ছুটি। অনিমেষ দুইদিনের ছুটি নিল। বাবা আসবেন গ্রামের বাড়ি থেকে।
যাওয়ার আগের রাতে ঘুম হলো না অনিমেষের।
নতুন জায়গায় যাওয়ার আগে ঘুম হয় না, পুরনো জায়গায় ফেরার আগেও হয় না। কারণ দুটো ক্ষেত্রেই অজানা একটা কিছু অপেক্ষা করছে।
নতুন জায়গায় অজানা মানে — কী আছে সেখানে?
পুরনো জায়গায় অজানা মানে — আর কী নেই সেখানে?
সেই দ্বিতীয় অজানাটা বেশি ভারী।

বাবা এসেছিলেন রাত দশটায়। বয়স তাঁর বাহাত্তর। চুল সাদা, পিঠ একটু বাঁকা, হাঁটুতে ব্যথা। কিন্তু চোখ দুটো এখনো তেমনই — তীক্ষ্ণ, উজ্জ্বল।
রনি দরজা খুলে দিয়েছিল। “দাদু!”
বাবার মুখে হাসি এলো। বাবা রনিকে জড়িয়ে ধরলেন। “কত বড় হয়ে গেছিস রে।”
“দাদু, আমরা কাল গোপালনগর যাচ্ছি?”
"হ্যাঁ।"
"ওখানে জামরুল গাছ আছে?"
বাবা একটু অবাক হলেন। তারপর অনিমেষের দিকে তাকালেন।
অনিমেষ হাসল।
"ওকে বলেছি।"
বাবা রনির মাথায় হাত রাখলেন।
“হ্যাঁ। আছে কিনা জানি না। দেখতে যাচ্ছি তো।”
— ✦ —
পরদিন সকাল সাতটায় বেরোনো হলো।
গাড়িতে। অনিমেষ চালাচ্ছে। পাশে সুপর্ণা। পেছনে বাবা আর রনি।
রাস্তায় কুয়াশা ছিল। ডিসেম্বরের সকাল — ঠান্ডা, ধূসর, একটু ভেজা ভেজা। হাইওয়েতে উঠলে কুয়াশার মধ্যে গাড়ি চলতে লাগল।
বাবা পেছনে বসে চুপ।
রনি মোবাইলে গান শুনছিল।
সুপর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়ে।
অনিমেষ চালাচ্ছে। সামনের রাস্তায় চোখ। কিন্তু মাথার মধ্যে অন্য রাস্তা — সেই পুরনো রাস্তা যেটা স্কুল থেকে বাড়ি যেত।
এক ঘণ্টা পর বাবা বললেন, "এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা না। বাঁ দিকে মোড় নিলে ভালো হতো।"
"জানি বাবা। ওই রাস্তায় কাজ চলছে। এটাই ভালো।"
বাবা চুপ করে গেলেন।
তারপর বললেন, “তোর মা একবার বলেছিলেন, গোপালনগর যেতে চান। আমি বলেছিলাম, হবে হবে। হয়নি।”
গাড়িতে একটু নীরবতা নামল। সুপর্ণা পেছনে তাকালো। বাবার দিকে। বলল, “বাবা, এবার আপনি যাচ্ছেন। মাও মনে মনে যাবেন।”
বাবা কিছু বললেন না। কিন্তু জানালার বাইরে তাকালেন। কুয়াশার মধ্যে।
— ✦ —
গোপালনগর পৌঁছাল সাড়ে নটায়।
শহরে ঢোকার মুখে অনিমেষের বুকটা কেমন করে উঠল।
সেই রাস্তা। বদলেছে। অনেকটাই বদলেছে। দুই পাশে নতুন দোকান উঠেছে, পুরনো কিছু ভেঙে পড়েছে।
কিন্তু সেই গাছগুলো।
রাস্তার দুপাশে যে পুরনো আমগাছগুলো ছিল — সেগুলো এখনো আছে। আরও বড় হয়েছে। ডালপালা ছড়িয়েছে।
গাছ বদলায় না। গাছ থাকে।
অনিমেষের চোখ ভিজে এলো। সামলাল। কারণ গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু পেছন থেকে রনির গলা শোনা গেল।
"বাবা, এই গাছগুলো তোমার চেনা?"
"হ্যাঁ।"
"কত পুরনো?"
"তুই জন্মানোর আগের।"
রনি জানালা দিয়ে গাছগুলো দেখল।
"বাহ।"
সেই বাড়ির সামনে গাড়ি থামল। বাড়িটা আছে। কিন্তু বদলে গেছে। সেই মাটির দেয়াল নেই, এখন পাকা। রং করা হয়েছে হলুদ রঙে। দরজা বদলেছে।
কিন্তু সেই জানালাটা। সেই জানালাটা এখনো সেই জায়গায়। একটু পুরনো হয়েছে, রং উঠে গেছে। কিন্তু সেই জানালা — যেটা দিয়ে দুপুরের রোদ ঢুকত, যেটার ধারে বসে বই পড়া হতো — সেটা আছে।
অনিমেষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবা পাশে এসে দাঁড়ালেন। দুজনে তাকিয়ে আছেন বাড়িটার দিকে। কোনো কথা নেই।
পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট।
তারপর বাবা বললেন, “তোর মায়ের রান্নাঘর ওই দিকে ছিল।”
“জানি বাবা।”
"এখন কারা থাকে জানিস?"
"না।"
— ✦ —
দরজায় কড়া নাড়া হলো। একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন।
অনিমেষ বলল, “আমরা আগে এই বাড়িতে থাকতাম। অনেক বছর আগে। একটু দেখতে পারি?”
মহিলা একটু অবাক হলেন। তারপর হাসলেন। “আসুন।”
ভেতরে ঢুকে অনিমেষ প্রথমে থমকে গেল। সব বদলে গেছে — মেঝেতে টাইলস, দেয়ালে নতুন রং। কিন্তু সেই ঘরের আকৃতি। সেই ছাদের উচ্চতা। এগুলো বদলায় না।
অনিমেষ সেই ঘরে ঢুকল যেটায় ঘুমাত। দেয়ালের দিকে তাকাল। সেই উচ্চতা মাপার দাগগুলো নেই। নতুন রঙে ঢেকে গেছে। কিন্তু অনিমেষ জানে — সেই রঙের নিচে দাগগুলো আছে।
ঢাকা পড়েছে, মুছে যায়নি। ঠিক যেমন স্মৃতি — অনেক কিছুর নিচে চাপা পড়ে, কিন্তু মুছে যায় না।
রান্নাঘরে গেল মা। মানে অনিমেষ গেল। মায়ের মতো করে দাঁড়াল সেই রান্নাঘরে।
নতুন উনুন, গ্যাসের চুলা এখন। সেই মাটির উনুন নেই। কিন্তু সেই জানালা — যেটা দিয়ে সকালের আলো আসত — সেটা আছে।
সেই জানালা দিয়ে এখনো আলো আসছে।
অনিমেষ চোখ বুজল। মনে করার চেষ্টা করল — সেই ভাতের মাড়ের গন্ধ, সেই হলুদের গন্ধ, সেই সরষে তেলের গন্ধ।
পুরোপুরি পেল না। কিন্তু একটু পেল। একটুই যথেষ্ট।
— ✦ —
উঠোনে বেরিয়ে এলো সবাই।
রনি জিজ্ঞেস করল, “দাদু, তুলসী গাছ কোথায় ছিল?” বাবা সেই কোণটা দেখালেন। এখন সেখানে সিমেন্ট।
রনি গেল সেখানে। হাঁটু গেড়ে বসল। সিমেন্টের উপর হাত রাখল। “এখানে ছিল?” — “হ্যাঁ।”
রনি উঠে দাঁড়াল। বলল না কিছু। কিন্তু তার চোখে একটা বোঝার ভাব এলো — যে বোঝাটা কথায় বলা যায় না।
— ✦ —
সেখান থেকে গেল সেই জামরুল গাছের কাছে।
গাছটা আছে।
আরও বড় হয়েছে, ডালপালা আরও ছড়িয়েছে। গাছের গোড়া মোটা হয়েছে।
রনি দৌড়ে গেল। “বাবা, এটা সেই গাছ?” — “হ্যাঁ।” রনি গাছের গায়ে হাত দিল। উপরে তাকাল। “বাবা, ওই দেখো, একটা আছে!”
সত্যিই। একটা একা জামরুল ঝুলছে উপরে। গোলাপি রঙের। শীতের মধ্যেও।
রনি লাফ দিয়ে নাগাল পেল না।
অনিমেষ এগিয়ে গেল। গাছের গায়ে হাত রাখল। তারপর ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করল।
সুপর্ণা বললেন, “কী করছ?”
রনি বলল, “বাবা গাছে উঠছে!”
বাবা হাসলেন।
অনিমেষ উঠল। বেয়াল্লিশ বছর বয়সে গাছে ওঠা সহজ নয়। হাঁটু ব্যথা করছে, হাতের চামড়া ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে উঠল।
জামরুলটা ধরল। পাড়ল। নিচে নামল।
রনির হাতে দিল। রনি মুখে দিল। চোখ বড় হয়ে গেল।
“বাবা, সত্যিই অন্যরকম!”

অনিমেষ হাসল। সেই হাসির মধ্যে পলু ছিল। রাজু ছিল। মীনাক্ষী ছিল। মা ছিলেন।
সবাই ছিল।
— ✦ —
সেদিন তারা মফস্বলের একটা হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। হোটেলে ফেরার সময় সুপর্ণা ফিসফিস করে বলল, “ভয় ছিল। গিয়ে দেখব সব বদলে গেছে, স্মৃতিটাও ভেঙে যাবে।”
“ভেঙেছে?”
“না।”
“কেন না?”
“কারণ সেই জামরুল গাছটা ছিল। সেই জানালাটা ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা — রনি সেই জামরুল খেল। আর বলল, অন্যরকম স্বাদ।”
বাবা বললেন, “অনি।”
“হ্যাঁ বাবা।”
“ধন্যবাদ। নিয়ে এলি।”
অনিমেষ গলায় কিছু আটকে গেল। বলল না কিছু।
শুধু গাড়ি চালাল।
রাস্তায় আলো জ্বলছে। শীতের রাত নামছে। দূরে শহরের আলো দেখা যাচ্ছে। পেছনে রনি ঘুমাচ্ছে। তার মুখে একটু হাসি আছে। ঘুমের মধ্যে হাসি।
সেই হাসির কারণ কি সে জানে? জানে না। কিন্তু হয়তো ঘুমের মধ্যে কোথাও একটা জামরুলের স্বাদ পাচ্ছে।
গোলাপি রঙের। একটু মিষ্টি, একটু কষা। অন্যরকম।
হোটেলে ফেরার পর রাতে অনিমেষ বসল একা। মোবাইল খুলল। লিখল —
"আজ গেলাম। গাছটা ছিল। জানালাটা ছিল। মোড়টা ছিল। মা ছিলেন না, কিন্তু তাঁর রান্নাঘরের জানালা দিয়ে সেই একই আলো আসছিল। পলু ছিল না, কিন্তু সেই উঠোনে দাঁড়িয়ে তাকে মনে পড়ল এত স্পষ্ট যে মনে হলো পাশেই আছে। রাজুকে খুঁজলাম — পেলাম না। কিন্তু তার হাতে তৈরি সেই বাঁশের কথা মনে পড়ল।
রনি জামরুল খেল। বলল অন্যরকম স্বাদ।"
অনিমেষ আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে শুয়ে রইল। অন্ধকারে সেই পুরনো দুপুরগুলো ভেসে আসছে। একটার পর একটা।
সেই দুপুর যা আর ফেরে না — আজ বোঝা গেল, ফেরে। অন্যভাবে ফেরে। রনির চোখ দিয়ে ফেরে।
পরের পর্বে
রাজুর সাথে হঠাৎ দেখা হওয়ার গল্প — সময় পাল্টায়, মানুষ পাল্টায়, কিন্তু কিছু একটা থেকে যায় যেটার কোনো নাম নেই।
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর | পর্ব ৬ — ফেরা
