By Ziya Pub Feb 27 Upd Mar 4

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — অষ্টম পর্ব: সব দুপুরের দুপুর

জানুয়ারির নরম রোদে বারান্দায় বসে জামরুল চারার পাশে পুরনো কবিতার খাতায় লিখল অনিমেষ — 'দুপুরের একটা গন্ধ আছে।' থামতে পারল না। কুড়িটা পাতা ভরল। সন্ধ্যায় পরিবারকে পড়ে শোনাল। পরদিন চারায় নতুন একটা পাতা।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — অষ্টম পর্ব: সব দুপুরের দুপুর

একটি স্মৃতির উপন্যাস

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর

অষ্টম ও শেষ পর্ব

“সব দুপুরের দুপুর”

জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে যেটা একটা মুহূর্ত নয়। সেটা হলো সব মুহূর্তের সংকলন। সব আনন্দের, সব দুঃখের, সব হারানোর, সব পাওয়ার — একটা বিন্দুতে এসে মিলে যাওয়া। সেই বিন্দুতে দাঁড়ালে পেছনে তাকানো যায়, সামনেও তাকানো যায়। আর মনে হয় — এই তো। এইখানে এসেই পৌঁছানোর ছিল। সেই মুহূর্ত কখন আসে? জানা থাকে না।

কিন্তু আসে।

 

গোপালনগর থেকে ফেরার তিন সপ্তাহ পর।

জানুয়ারির মাঝামাঝি।

রনির স্কুল শুরু হয়ে গেছে। সুপর্ণার অফিস চলছে। বাবা গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন। জীবন আবার সেই পুরনো ছন্দে।

কিন্তু একটা জিনিস বদলেছে।

বারান্দায় সেই জামরুলের চারা।

প্রতিদিন সকালে উঠে অনিমেষ একবার দেখে। জল দেয়। পাতা ছোঁয়।

রনিও দেখে। স্কুলে যাওয়ার আগে একবার উঁকি দিয়ে যায়।

কোনো কথা হয় না। শুধু দেখা।

কিন্তু সেই দেখাটুকুই একটা যোগাযোগ। মানুষে মানুষে নয় — মানুষে স্মৃতিতে। বর্তমানে অতীতে।

 

— ✦ —

সেই জানুয়ারির এক দুপুরে ঘটল ঘটনাটা।

অনিমেষ বাড়িতে।

কাজ ছিল না সেদিন। অফিস থেকে হাফ ডে নিয়েছিল — কারণ ছিল না তেমন, শুধু মনে হয়েছিল একটু থাকা দরকার।

দুপুরে খাওয়ার পর সুপর্ণা জিজ্ঞেস করল, "শুবে?"

"হয়তো।"

"শো। ভালো লাগবে।"

সুপর্ণা চলে গেল রান্নাঘরে।

অনিমেষ বিছানায় গেল। শুয়ে পড়ল। ছাদের দিকে তাকাল। সেই সাদা ছাদ। আর তখন হলো সেই কাণ্ড।

হঠাৎ করে নয়।

ধীরে ধীরে।

যেভাবে সকালে ঘুম ভাঙে — একটু একটু করে আলো আসে, একটু একটু করে চেতনা ফেরে — সেইভাবে।

ধীরে ধীরে অনিমেষের বুকের মধ্যে একটা জিনিস জমতে লাগল। একটা অনুভব।

কী অনুভব? বলা কঠিন।

আনন্দ নয় পুরোপুরি। দুঃখও নয়। কৃতজ্ঞতার কাছাকাছি, কিন্তু সেটাও ঠিক নয়। পরিপূর্ণতার কাছাকাছি — হ্যাঁ, সেটা।

একটা পরিপূর্ণতার অনুভব।

যেন জীবনের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব টুকরো এই মুহূর্তে এক জায়গায় জড়ো হলো।

সেই গোপালনগরের দুপুর। মায়ের রান্নাঘর। পলুর হাসি। রাজুর গাছে ওঠা। মীনাক্ষীর লাল ফিতে। বাবার "ভয় নেই, ধরে আছি।" বর্ধমানের সেই পার্ক। তিয়াষার চিঠি। দেবাশিসের "তুই কবি হতে পারিস।" পলুর মায়ের হাত। রাজুর জামরুলের চারা।

সব একসাথে। একটা মুহূর্তে।

উঠে পড়ল অনিমেষ।

পুরনো একটা কবিতার খাতা খুঁজে বের করল। বিয়ের আগে লেখা। অনেকদিন হাত দেওয়া হয়নি।

বারান্দায় জামরুল চারার পাশে বসল। জানুয়ারির রোদ মুখে পড়েছে।

কলম নিল। প্রথম লাইনটা লিখল:

দুপুরের একটা গন্ধ আছে।

তারপর থামতে পারল না।

কুড়িটা পাতা ভরে গেল। হাত কাঁপছিল। চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। তবু লেখা থামল না।

সুপর্ণা একবার বারান্দায় এলেন। দেখলেন। কিছু বললেন না। বুঝলেন। ফিরে গেলেন।

এই না-বলাটাই ভালোবাসা।

— ✦ —

বিকেলে রনি ফিরল। “বাবা কী লিখলে?”

“একটা গল্প।”

“কীসের গল্প?”

“দুপুরের গল্প।”

“গোপালনগরের দুপুরের?”

“হ্যাঁ।”

“আমি আছি গল্পে?”

“আছিস।”

“পড়তে পারব?”

“একদিন।” — “কখন?” — “আরেকটু বড় হলে।”

রনি মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “বাবা, আজ আমাকে পড়ে শোনাও।”

অনিমেষ একটু ভাবল।

“ঠিক আছে।”

— ✦ —

সন্ধ্যায় বারান্দায় তিনজন বসল। সুপর্ণা, রনি, অনিমেষ।

খাতা খুলল অনিমেষ।

পড়তে শুরু করল।

পলুর অংশে গিয়ে গলা ভাঙল। “সেটাই যথেষ্ট ছিল” যেখানে — সুপর্ণার চোখ ভিজে গেল।

মায়ের রান্নাঘরের অংশে রনি নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।

শেষ লাইনগুলো পড়ল:

“সেই দুপুর শেষ হয়নি।
শেষ হয়নি কারণ সে আমার মধ্যে আছে।
আমার মধ্যে মানে — রনির মধ্যেও আছে।
রনির মধ্যে মানে — সামনেও থাকবে।

যেটা ছিল। যেটা আছে। যেটা থাকবে।”

বারান্দায় নীরবতা নামল।

সেই নীরবতা যেটা ভরা থাকে। ফাঁকা নয়।

— ✦ —

রাতে বাবাকে ফোন করল অনিমেষ।

“বাবা, আজ লিখলাম। লিখলাম — ‘ভয় নেই, ধরে আছি।’”

ফোনে বাবা কাঁদলেন। চুপ করে।

অনিমেষ কিছু বলল না। শুধু লাইনে থাকল।

পাশে থাকাটাই যথেষ্ট। কথা লাগে না।

— ✦ —

পরদিন সকালে নতুন একটা পাতা গজিয়েছে জামরুল চারায়।

ছোট্ট সবুজ পাতা। কুঁকড়ানো। তাজা।

রনি আর অনিমেষ দুজনে একসাথে ছুঁয়ে দেখল।

রনি বলল, “বাবা, আজ দুপুরে ঘুমাবে?”

“কেন?”

“ভালো ঘুমালে ভালো স্বপ্ন হয়। ভালো স্বপ্ন হলে ভালো গল্প লেখা যায়।”

অনিমেষ হাসল।

ঘুমাবে। স্বপ্ন দেখবে।

সব দুপুরগুলো সেই স্বপ্নে জেগে থাকবে।

উপসংহার ও লেখকের নিবেদন

এই গল্পটা লেখা হয়েছিল এক দুপুরে। কারেন্ট চলে গিয়েছিল।

জানালা দিয়ে একটা গন্ধ এলো। কোনো রান্নার গন্ধ। পাশের বাড়ির। কিন্তু সেই গন্ধে হঠাৎ মনে পড়ল কারো রান্নাঘর। কারো দুপুর। যেটা অনেকদিন আগেকার।

সেই মনে পড়া থেকে এই গল্প।

গল্পে অনিমেষ কাল্পনিক। কিন্তু সেই দুপুর কাল্পনিক নয়। সেই জামরুল গাছ কাল্পনিক নয়। সেই বন্ধু যে বৃষ্টিতে কাঁদছিল — সে কাল্পনিক নয়।

প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটা গোপালনগর থাকে।

একটা পুরনো দুপুর থাকে যেটা কখনো শেষ হয়নি।

এই গল্প তাদের জন্য — যারা সেই দুপুরটা এখনো বুকে নিয়ে বাঁচছেন।

সমাপ্ত

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর  |  পর্ব ৮ — সব দুপুরের দুপুর

 

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →