By Ziya Pub Feb 27 Upd Mar 4

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — পঞ্চম পর্ব: নতুন শহর, পুরনো বুক

বর্ধমানে এসেও আকাশটা একই ছিল। দেবাশিস প্রথম জিজ্ঞেস করেছিল পুরনো শহরের কথা। তিয়াশা চলে যাওয়ার আগে একটা চিঠি দিয়েছিল। আর রনি একদিন জিজ্ঞেস করল — "নস্টালজিয়া মানে কী?" উত্তরের জন্য অনিমেষকে Google Maps খুলতে হলো না।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — পঞ্চম পর্ব: নতুন শহর, পুরনো বুক

একটি স্মৃতির উপন্যাস

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর

পঞ্চম পর্ব

“নতুন শহর, পুরনো বুক”

নতুন জায়গায় গেলে মানুষ দুটো কাজ করে।

হয় সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে, নতুনকে আঁকড়ে ধরে — নতুন বন্ধু, নতুন পথ, নতুন অভ্যাস। অথবা পুরনোকে বুকে জড়িয়ে রাখে, নতুনকে দূরে সরিয়ে রাখে — মনে মনে বলে, “এটা আমার জায়গা নয়।”

অনিমেষ করেছিল দুটোই।

বর্ধমানে এসে প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে নতুন স্কুলে গিয়েছিল চুপচাপ। কারো সাথে কথা বলেনি বেশি। টিফিনে একা বসে থেকেছে।

মা একদিন বললেন, “এভাবে কতদিন থাকবি?”

“গোপালনগরের মতো না।”

“না, গোপালনগরের মতো না। গোপালনগর আলাদা। কিন্তু এটাও আলাদা — এর নিজের ভালো আছে।”

সেই বছরটা ছিল একটা দীর্ঘ দুপুরের মতো। গোপালনগরের দুপুর ছিল উজ্জ্বল, চেনা। বর্ধমানের প্রথম দুপুরগুলো ছিল অন্যরকম — একটু ধূসর, একটু অপরিচিত।

শুধু আকাশটা ছিল চেনা।

আকাশ বদলায় না। যেখানেই যাও, আকাশটা সেই একই।

সেই প্রথম কয়েক সপ্তাহ অনিমেষ অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। কারণ আকাশ দেখলে মনে হতো — সে আসলে তেমন দূরে সরে যায়নি। সেই একই আকাশের নিচে রাজু আছে, পলু আছে, মীনাক্ষী আছে।

— ✦ —

বর্ধমানের স্কুলে প্রথম বন্ধুত্ব হয়েছিল দেবাশিসের সাথে।

দেবাশিস ছেলেটা ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। কথা কম বলত, কিন্তু যখন বলত তখন মনে হতো প্রতিটা কথা আগে ভেবে বলছে। তার একটা বিশেষ গুণ ছিল — সে মনোযোগ দিয়ে শুনত।

অনিমেষ একদিন টিফিনে বসে গোপালনগরের কথা বলছিল — মানে নিজের মনে। কিন্তু পাশ থেকে দেবাশিস বলল, “তোর আগের শহরটার কথা বলছিস?”

“হ্যাঁ।”

“কেমন ছিল?”

সেই প্রশ্নটা। কেউ জিজ্ঞেস করেনি এর আগে — শুধু “কেমন ছিল?”

অনিমেষ বলতে শুরু করল। সেই জামরুল গাছের কথা। রাজু আর পলুর কথা। সেই নদীর কথা। দেবাশিস পুরোটা শুনল। শেষে বলল, “তোর জায়গাটা সুন্দর ছিল।”

শুধু এইটুকু। কিন্তু এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। কেউ বুঝেছে — এটাই দরকার ছিল।

সেইদিন থেকে দেবাশিসের সাথে বন্ধুত্ব হলো।

— ✦ —

বর্ধমানের সেই স্কুলে একটা মেয়ে ছিল। নাম ছিল তিয়াষা।

তিয়াষার সাথে পরিচয় হয়েছিল বার্ষিক অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে অনিমেষ আবৃত্তি করেছিল — জীবনানন্দ দাশের “বনলতা সেন।” মা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। মঞ্চে উঠে হাঁটু কাঁপছিল। কিন্তু কবিতার মধ্যে ঢুকে গেলে বাইরের সব ভুলে যাওয়া যায়।

অনুষ্ঠান শেষে একটা মেয়ে এসে বলল, “তুমি কবিতাটা খুব ভালো বললে।”

তিয়াষা।

মীনাক্ষীর মতো নয় মোটেই। মীনাক্ষী ছিল শান্ত, গম্ভীর। তিয়াষা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত — সরাসরি, স্পষ্ট, হাসিখুশি। কথা বলত বেশি, চোখে চোখ রেখে বলত।

তিয়াষার কথা বলার ভঙ্গি অদ্ভুত ছিল। সে যখন বলত, মনে হতো সে একটা ছবি আঁকছে। প্রতিটা কথায় একটা রং আছে, একটা গন্ধ আছে।

মীনাক্ষীর কথা কি তখনো মনে ছিল? হ্যাঁ। কিন্তু তিয়াষার সাথে কথা বলতে বলতে একটু একটু করে মীনাক্ষীর ছবিটা ধূসর হতে শুরু করল।

এটা বিশ্বাসঘাতকতা কিনা — সেই প্রশ্ন মাথায় এসেছিল। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা হয় যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল। মীনাক্ষীর সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। একটা সুতো, একটা “ধন্যবাদ”, একটা তাকানো — এটা প্রতিশ্রুতি নয়।

এটা ছিল শুধু অনুভব। আর অনুভব কখনো মরে না, শুধু বদলে যায়।

তিয়াষার সাথে বন্ধুত্ব ছিল দুই বছর। তারপর তিয়াষার পরিবার কলকাতায় চলে গেল। যাওয়ার আগে একটা চিঠি দিয়েছিল। শেষ লাইনটা মনে আছে —

“তোমার কবিতা বলার গলাটা মনে থাকবে। যেন মনে হচ্ছিল কবিতাটা তুমি নিজেই লিখেছ।”

সেই চিঠিটা এখনো আছে। বাবার ঘরে একটা পুরনো বাক্সে।

— ✦ —

বর্ধমানে বাড়ির কাছে একটা পার্ক ছিল। দুপুরে সেই পার্কে মানুষ থাকত না। দেবাশিসের সাথে মাঝে মাঝে সেখানে যেত অনিমেষ।

দুজনে বেঞ্চে বসে থাকত। কথা হতো। কথা না-ও হতো।

সেই চুপ করে বসে থাকাটা ছিল গোপালনগরের সেই দুপুরের একটু ছায়া। একটু অন্যরকম, কিন্তু সেই একই অনুভব — সময় এখানে ধীরে চলে, কেউ কিছু চাইছে না, কোনো তাড়া নেই।

একদিন দুপুরে সেই পার্কে বসে দেবাশিস হঠাৎ বলল, “তুই কবি হতে পারিস।”

“আমি? কবিতা লিখি না।”

“লিখবি। তোর মধ্যে যেভাবে কথা আছে — সেই কথা একদিন বেরোবে।”

অনিমেষ গুরুত্ব দেয়নি তখন। কিন্তু দেবাশিস ভুল বলেনি। সেই কথাগুলো বেরিয়েছিল — ডায়েরিতে, চিঠিতে, আর পরে রাত বারোটার পর মোবাইলের নোটস অ্যাপে।

সেই কথাগুলো এখনো বের হচ্ছে।

— ✦ —

আজ সন্ধ্যায় ছেলে রনি একটা প্রশ্ন করেছিল।

পড়ার টেবিলে বসে। ইতিহাস বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে। “বাবা, নস্টালজিয়া মানে কী?”

“দুটো শব্দ মিলিয়ে। নস্টোস মানে ফিরে যাওয়া, আলগস মানে ব্যথা।”

“ফিরে যাওয়ার ব্যথা?”

“হ্যাঁ।”

রনি একটু ভাবল। “কিন্তু ফিরে যেতে পারলে তো ব্যথা থাকত না। ব্যথা হয় কারণ ফিরে যাওয়া যায় না, তাই না?”

অনিমেষ থমকে গেল। বারো বছরের ছেলে এই কথা বলছে।

“হ্যাঁ,” বলল সে। “ঠিক ধরেছিস।”

রনি: “তোমার কি এরকম ব্যথা আছে?”

“আছে।” — “কীসের?”

“তোর বয়সের সময়টার। গোপালনগরের সেই দুপুরগুলোর।”

“গোপালনগর? একদিন নিয়ে যাবে?”

অনিমেষ একটু থামল। ভয় ছিল — গেলে যদি দেখি সব বদলে গেছে? তাহলে কি স্মৃতিটাও বদলে যাবে?

“হয়তো একদিন।”

— ✦ —

সেই রাতে ঘুমানোর আগে অনিমেষ মোবাইলে গুগল ম্যাপস খুলল।

লিখল — গোপালনগর, নদীয়া। ম্যাপ এলো। সেই রাস্তা, সেই মোড়, সেই এলাকা। স্যাটেলাইট ভিউতে গেল। ছোট ছোট বাড়ি দেখা যাচ্ছে, গাছ দেখা যাচ্ছে।

সেই জামরুল গাছটা কি এখনো আছে? দেখা যাচ্ছে না। এত ছোট জিনিস স্যাটেলাইটে ধরা পড়ে না। কিন্তু সেই পাড়াটা আছে। বাড়িগুলো আছে। রাস্তাটা আছে।

মানুষ বদলে গেছে, কিন্তু জায়গা আছে। আর জায়গা থাকলে স্মৃতিও থাকে।

ম্যাপ বন্ধ করল। চোখ বুজল।

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন এলো। এবার একটু অন্যরকম। গোপালনগরের সেই জামরুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে বেয়াল্লিশ বছরের অনিমেষ। পাশে রনি।

“বাবা, এই গাছের জামরুল কি সত্যিই অন্যরকম স্বাদের?”

“খেয়ে দেখ।”

রাজু উপর থেকে একটা জামরুল ছুঁড়ে দিল। রনি হাত বাড়িয়ে ধরল। মুখে দিল। তারপর হাসল — সেই হাসি যে হাসি পলুর মতো, সরল, খাঁটি।

“বাবা, সত্যিই অন্যরকম!”

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল। অনিমেষ উঠে বসল। বাবার নম্বরে মেসেজ লিখল —

“বাবা, এই শীতে একবার গোপালনগর যাব। তুমি আসবে? রনিকেও নিয়ে যেতে চাই।”

কয়েক মিনিট পর ভয়েস মেসেজ এলো। বাবার গলা —

“হ্যাঁ রে, যাব। তোর মাও যেতে চাইতেন। একবার বলেছিলেন, ‘ওই বাড়িটা একবার দেখে আসব।’ হয়নি। তুই নিয়ে যাবি? যাব।”

বাবার গলায় একটা কাঁপুনি ছিল। অনিমেষ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ভোরের আলো সবে আসছে।

সে গোপালনগরে যেতে চাইছে নিজের জন্য নয়।

রনির জন্য। যাতে রনিও একদিন, বেয়াল্লিশ বছর বয়সে, কোনো একটা বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের বিকেলে জানালার হাওয়ায় একটা গন্ধ পায় — আর সেই গন্ধে ফিরে যেতে পারে। সেই দুপুরে।

পরের পর্বে

গোপালনগরে ফেরা, সেই পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়ানো, রাজুর সাথে দেখা, আর সেই জামরুল গাছ এখনো আছে কিনা।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর  |  পর্ব ৫ — নতুন শহর, পুরনো বুক

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →