মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — চতুর্থ পর্ব: শেষ দুপুর, শেষ রান্নাঘর
বর্ধমানে চলে যাওয়ার আগের দিন মা চুপ করে তিনটি রান্না করেছিলেন — মুগ ডাল, আলু পোস্ত, ইলিশ ঝোল। রাজু দিয়েছিল একটা ব্যাগ ভরা জামরুল। দেয়ালের উচ্চতা মাপার দাগগুলো রেখে চলে গিয়েছিল অনিমেষ। কিছু ফেলে যাওয়া হয় না আসলে।
একটি স্মৃতির উপন্যাস
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর
“শেষ দুপুর, শেষ রান্নাঘর”
কিছু কিছু দিন আসে যেদিন সবকিছু শেষবারের মতো হয়।
কিন্তু সেই দিনটা আসার আগে বোঝা যায় না যে এটাই শেষবার। বোঝা যায় অনেক পরে — যখন আর ফেরার উপায় নেই, যখন সেই জায়গাটা স্মৃতির ভেতর চলে গেছে, যখন চাইলেও হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে না।
তখন মনে হয় — জানলে কি একটু বেশিক্ষণ থাকতাম? একটু বেশি দেখতাম? একটু বেশি মনে রাখতাম?
হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না।
কারণ মানুষ জেনে বুঝেও অনেক সময় মনে রাখে না। বর্তমান মুহূর্ত সবসময় খুব সাধারণ লাগে। অসাধারণ লাগে তখনই — যখন সেটা অতীত হয়ে যায়।
গোপালনগর ছেড়ে যাওয়ার দিনটাও তেমনই ছিল।
— ✦ —
সেটা ছিল ১৯৯৮ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে। বাবার বদলি হয়েছে। নতুন জায়গা বর্ধমান।
সরকারি চাকরিতে বদলি মানেই হলো — সব গুটিয়ে নতুন জায়গায় যাও। নতুন বাড়ি, নতুন পাড়া, নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু। কিন্তু পুরনো জিনিসগুলো কী হয়? সেগুলো থেকে যায়। জায়গায় জায়গায়, মানুষে মানুষে, গাছে গাছে।
যাওয়ার আগের দিন অনিমেষ সারাটা দিন ছুটে বেড়িয়েছিল। প্রতিটা জায়গা একবার করে দেখতে চেয়েছিল। সেই জামরুল গাছ, সেই মোড়, সেই স্কুলের গেট, সেই নদীর ধার, সেই মাঠ।
কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি কোথাও। কারণ মনে হচ্ছিল — যদি বেশিক্ষণ থাকি, তাহলে যাওয়াটা আরও কঠিন হবে।
তাই দেখল, কিন্তু মন ভরে দেখল না। আর এখন, পঁচিশ বছর পরে, সেই অপূর্ণ দেখার জন্য আফসোস হয়।
— ✦ —
যাওয়ার দিন সকালে উঠে দেখল মা রান্নাঘরে।
অনেক সকালে। তখনো ভালো আলো হয়নি, উঠোনে একটু কুয়াশা আছে, শীতের সকাল।
মা রান্না করছেন।
কিন্তু সেদিন রান্না করার কথা ছিল না। সেদিন সকালেই বেরিয়ে যাওয়ার কথা। ট্রাক এসে মালপত্র নিয়ে যাবে, তারপর বাস ধরতে হবে।
“মা, রান্না করছ কেন?”
মা পেছন ফিরলেন না।
“তোদের প্রিয় রান্নাগুলো একবার করে দিই। এই রান্নাঘরে।”
এই রান্নাঘরে।
সেই কথাটার মধ্যে একটা সমুদ্র ছিল। অনিমেষ তখন সেটা পুরোপুরি বোঝেনি। এখন বোঝে। মা বলেছিলেন “এই রান্নাঘরে” — মানে অন্য কোনো রান্নাঘরে হবে না। এই উনুন, এই দেয়াল, এই জানালা দিয়ে সকালের আলো — এই সব আর হবে না।

একটা রান্নাঘর কেবল রান্নাঘর নয়। একটা রান্নাঘর হলো একটা পরিবারের হৃৎপিণ্ড।
মা সেদিন রান্না করেছিলেন তিনটে পদ।
মুগ ডাল ভাজা — বাদামি করে ভেজে, হিং আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে। সেই ডালের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাড়িতে।
আলু পোস্ত — অনিমেষের সবচেয়ে প্রিয়। পোস্তর পেস্ট আর আলু একসাথে কষানো, উপরে সামান্য সরষের তেলের ছিটে।
আর ইলিশ মাছের ঝোল।
ইলিশ মাছ শীতকালে পাওয়া কঠিন ছিল তখন। কিন্তু মা পেয়েছিলেন। কীভাবে পেয়েছিলেন জানা নেই। হয়তো আগের দিনই কিনে রেখেছিলেন।
সেই ইলিশের ঝোল খাওয়ার সময় অনিমেষ মাকে বলেছিল, “মা, তুমি এত ভালো রান্না করো কেন?”
মা হেসেছিলেন।
“তোরা ভালো করে খাস বলে।”
— এই সরল উত্তরের মধ্যে কতটা গভীর ভালোবাসা ছিল, তখন মাপা যায়নি, এখনো মাপা যায় না।
— ✦ —
খাওয়া শেষ হওয়ার পর মা রান্নাঘর পরিষ্কার করলেন। সবকিছু গুছিয়ে রাখলেন। থালাবাসন প্যাক করা হয়ে গিয়েছিল আগেই, তাই রান্নাঘর প্রায় খালি। শুধু উনুনটা ছিল — মাটির উনুন, সেটা নেওয়া যাবে না।
মা উনুনটার সামনে একটু দাঁড়ালেন।
শুধু একটু।
তারপর চলে এলেন।
অনিমেষ দেখেছিল। মা কাঁদেননি। মায়ের চোখ ভেজেনি। কিন্তু সেই একটু দাঁড়ানোর মধ্যে যা ছিল — সেটা কান্নার চেয়ে গভীর।
সেটা ছিল বিদায়।
— ✦ —
ট্রাক এলো দুপুরের আগে। মালপত্র উঠতে লাগল। বাড়িটা যতই খালি হতে লাগল, ততই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হতে লাগল।
বাড়ি খালি হলে দেখা যায় — দেয়ালে দাগ আছে, মেঝেতে ছোট ছোট আঁচড় আছে। এই দাগগুলো, এই আঁচড়গুলো — এগুলোই আসলে সেই বাড়িতে থাকার প্রমাণ। বলে দেয়, এখানে মানুষ ছিল, এখানে জীবন ছিল।
অনিমেষ একটা ঘরে দাঁড়িয়ে সেই খালি দেয়ালের দিকে তাকাল। সেই দেয়ালে একটা দাগ ছিল, উচ্চতা মাপার দাগ। প্রতি বছর মা মাপতেন — কতটা বাড়ল। সেই দাগগুলো পেন্সিলে, তার পাশে সাল লেখা। ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৭।
সেই দাগগুলো থেকে যাবে।
নতুন কেউ এই বাড়িতে আসবে, হয়তো রং করবে, দাগগুলো মুছে যাবে। কিন্তু যতক্ষণ আছে — এই দেয়ালে লেখা আছে একটা ছেলের বড় হওয়ার গল্প।
অনিমেষ আঙুল দিয়ে একবার ছুঁয়ে দিল সেই দাগগুলো। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
— ✦ —
রাজু এসেছিল বিদায় দিতে। পলুও এসেছিল।
দুজনে দাঁড়িয়ে ছিল গেটের বাইরে। রাজুর হাতে একটা প্যাকেট।
“কী এটা?”
“জামরুল। গাছ থেকে পেড়েছি সকালে।”
অনিমেষ প্যাকেটটা নিল। খুলল। ভেতরে বিশ-পঁচিশটা জামরুল। গোলাপি, তাজা, কিছুটা শিশির ভেজা। একটা মুখে দিল।
সেই স্বাদ। সেই মিষ্টি, একটু কষা, একটু জলময় স্বাদ — সেটা মুখে পড়তেই বুঝল যে এই স্বাদ আর পাবে না। ঠিক এই স্বাদ না। কারণ স্বাদ শুধু জিভের ব্যাপার নয়, স্বাদ হলো পরিবেশের, সম্পর্কের, মুহূর্তের।
পলু বলল, “ভুলে যাবি না তো?” — “না।” — “চিঠি লিখবি?” — “লিখব। আমিও লিখব।”
রাজু কিছু বলল না। শুধু কাঁধে একটা ঘুসি মারল — সেটাই ছিল তার ভাষা। সেই ঘুসি মানে হলো — “ভালো থাকিস, মনে রাখিস, আর কী বলব।”
ট্রাক ছাড়ার সময় হলো। অনিমেষ ট্রাকে জানালার ধারে বসল। ট্রাক চলতে লাগল।
রাজু আর পলু দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে।
ট্রাক একটু এগিয়ে গেল, তারপর মোড় ঘুরল, আর ওরা দুজন আর দেখা গেল না।
সেই মোড় ঘোরার মুহূর্তটা — সেটাই ছিল শৈশবের শেষ দৃশ্য।
— ✦ —
সেই রাতে বর্ধমানের নতুন বাড়িতে প্রথম রাত।
সব অচেনা। ঘরের গন্ধ অচেনা, দেয়ালের রং অচেনা, বাইরের শব্দ অচেনা।
মা বিছানা পেতে দিলেন।
“নতুন জায়গায় প্রথম রাতে ঘুম আসে না। কাল থেকে আসবে।”
“গোপালনগর মনে পড়ছে।”
মা চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন —
“মনে পড়া ভালো। যে মনে পড়ে, সে হারায় না।”
সেই কথাটা। মায়ের এই কথাটা সারাজীবন বহন করে চলেছে অনিমেষ।
— ✦ —
এখন রাত বারোটা।
অনিমেষ রান্নাঘরে গেল। গ্যাসের উনুন জ্বালাল। চা বানাবে।
কিন্তু চা বানানো শুরু করার আগে একটু দাঁড়াল। এই রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সেই পুরনো রান্নাঘরটার কথা মনে পড়ল। মায়ের হাতের সেই উনুন। তুলসী গাছ। মায়ের আঁচল দিয়ে মুখ মোছা।

চা বানানো বন্ধ হয়ে গেল। গ্যাস নিভিয়ে দিল অনিমেষ।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছাদের দিকে তাকাল। মা কি কোথাও আছেন?
জানা নেই। কিন্তু মনে পড়ে। প্রতিদিন মনে পড়ে।
আর মায়ের কথা অনুযায়ী — যে মনে পড়ে, সে হারায় না।
তাহলে মা হারাননি। গোপালনগর হারায়নি। পলু হারায়নি।
সব আছে। বুকের মধ্যে। বুকের সবচেয়ে গভীর কোণে — যেখানে সময় পৌঁছায় না।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো অনিমেষ। ঘরে ফিরল। সুপর্ণার পাশে শুয়ে পড়ল।
ঘুমানোর আগের সেই মুহূর্তে — একটা ছবি এলো।
গোপালনগরের সেই বাড়ি। দুপুর। জানালা দিয়ে রোদ আসছে, মেঝেতে আলোর আয়তক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, সেই আয়তক্ষেত্রের মধ্যে একটা ছেলে শুয়ে আছে — চোখ খোলা, ছাদের দিকে তাকিয়ে, ভাবছে।
সেই গন্ধই হলো বাড়ি। সেই গন্ধই হলো শৈশব। সেই গন্ধই হলো — সব হারানোর পরেও যা থাকে।
পরের পর্বে
বর্ধমানের নতুন জীবন, নতুন বন্ধু, আর সেই মেয়েটার কথা যে একদিন মীনাক্ষীর কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল — কিন্তু পারেনি।
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর | পর্ব ৪ — শেষ দুপুর, শেষ রান্নাঘর
