By Ziya Pub Feb 27 Upd Mar 4

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — তৃতীয় পর্ব: বৃষ্টির দুপুর এবং পলুর চোখের জল

জুলাই ১৯৯৭-এর বৃষ্টিতে আম গাছের নিচে পলু কাঁদছিল। অনিমেষ পাশে বসেছিল, কিছু বলেনি। শুধু ছিল। পলু ২০০৩ সালে মারা যায়। কিন্তু সেই বৃষ্টির দুপুর — সেই নীরব পাশে থাকাটা — কোনোদিন মরে না।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — তৃতীয় পর্ব: বৃষ্টির দুপুর এবং পলুর চোখের জল

একটি স্মৃতির উপন্যাস

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর

তৃতীয় পর্ব

“বৃষ্টির দুপুর এবং পলুর চোখের জল”

বৃষ্টি পড়লে দুপুর বদলে যায়।

রোদের দুপুর আর বৃষ্টির দুপুর — এই দুটো জিনিস একই নামে ডাকা হয়, কিন্তু এরা আসলে দুই ভিন্ন সত্তা। রোদের দুপুরে একটা অলসতা আছে, একটা ঘুম ঘুম ভাব আছে। কিন্তু বৃষ্টির দুপুর হলো অন্য রকম — সে জাগিয়ে রাখে। সে বলে, “চুপ করে শোও না, দেখো, শোনো, অনুভব করো।”

আষাঢ়ের সেই দুপুরটার কথা অনিমেষ কোনোদিন ভোলেনি।

সেটা ছিল ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসের কোনো একটা দিন। সকাল থেকেই আকাশ ভারী ছিল। স্কুলে যাওয়ার সময় মা বলেছিলেন, “ছাতা নে।” অনিমেষ নেয়নি। সতেরো বছর বয়সে ছাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া মানে লজ্জার ব্যাপার — অন্তত সেই বয়সে এটাই মনে হতো।

ফেরার পথে বৃষ্টি নামল।

মুষলধারে।

এমন বৃষ্টি যে তিন সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ভিজে যায় মানুষ। রাস্তায় জল জমতে লাগল, নর্দমা উপচে পড়তে লাগল, গাছের পাতা থেকে জলের ধারা নামতে লাগল।

অনিমেষ দৌড়াল না। দৌড়ানোর কোনো মানে ছিল না। ইতিমধ্যেই ভিজে গেছে।

সে হাঁটতে লাগল। ধীরে।

আর সেই হাঁটতে হাঁটতে সেই মোড়ের কাছে এসে দেখল — পলু দাঁড়িয়ে আছে।

একটা বড় আম গাছের নিচে। আধাভেজা। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অদ্ভুত। পলু সবসময় হাসত। সবসময়, যেকোনো পরিস্থিতিতে। এমনকি একবার মাস্টারমশাই বেত মেরেছিলেন — সেই বেত খেয়েও পলুর মুখে একটা হালকা হাসি ছিল।

কিন্তু আজ সেই হাসি নেই।

পলু কাঁদছে।

— ✦ —

প্রথমে অনিমেষ বুঝতে পারেনি। বৃষ্টির জলে মুখ ভেজা থাকলে চোখের জল আলাদা করা যায় না। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় — চোখের কোণ লাল, ঠোঁট কাঁপছে, নাক টানছে।

“পলু?”

পলু মুখ ঘুরিয়ে নিল। “কী হয়েছে?” — “কিছু না।”

সতেরো বছর বয়সে ছেলেরা এই কথাই বলে। কাঁদলেও বলে কাঁদছে না। কারণ কাঁদা মানে দুর্বলতা — এই মিথ্যা সংস্কার তখন মাথায় গেঁথে থাকে।

অনিমেষ পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু বলল না।

দুজনে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি পড়ছে। গাছের পাতায় জলের শব্দ। দূরে বাজ পড়ল একবার।

অনেকক্ষণ পর পলু বলল, “বাবা চলে গেছে।”

— ✦ —

পলুর বাবার কথা অনিমেষ জানত। মানুষটা সংসারে ছিলেন না বললে ঠিক হয়। মাঝে মাঝে থাকতেন, বেশিরভাগ সময় থাকতেন না। মদ খেতেন। রাতে ফিরতেন দেরিতে। পলুর মায়ের সাথে ঝগড়া হতো। পাড়ার লোকে এই কথা জানত। পলু কখনো বলেনি। কারণ পলু হাসত। হাসির আড়ালে এই কথাগুলো লুকিয়ে রাখত।

“কোথায় গেছে?”

“চলে গেছে মানে চলে গেছে। আর আসবে না।”

পলু এবার সরাসরি বলল। গলায় কান্না আছে, কিন্তু চোখে একটা শক্তও ভাব এলো।

“মা বললেন, আর খোঁজতে যাব না। আমিও বললাম, যাব না।”

অনিমেষ কী বলবে বুঝল না। কী বলার আছে এই পরিস্থিতিতে? সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা ছিল না। সেই বয়সে কেউ শেখায়নি যে কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে কী বলতে হয়।

তাই কিছু বলল না।

শুধু পলুর কাঁধে হাত রাখল।

সেই হাত রাখার মুহূর্তে পলু আর চাপা দিতে পারল না। ভেঙে পড়ল। কাঁধে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। বৃষ্টির মধ্যে, রাস্তার মাঝখানে, দুজন সতেরো বছরের ছেলে — একজন কাঁদছে, একজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

সেই দৃশ্য কেউ দেখেনি হয়তো। কিন্তু অনিমেষ সেটা দেখেছে। নিজের ভেতর থেকে।

আর সেই দেখাটা আজও চোখ বন্ধ করলে সামনে আসে।

— ✦ —

বৃষ্টি থামল আধঘণ্টা পর।

পলু চোখ মুছল। আবার সেই পুরনো হাসি ফিরে এলো মুখে। কিন্তু এই হাসিটা আগের হাসির মতো নয়। এই হাসিতে একটা পরিপক্কতা ছিল, যেটা কষ্টের মধ্যে দিয়ে আসে।

“চল,” বলল পলু। “মা একা আছেন।”

“তুই যা। আমি আসছি একটু পর।”

পলু হাঁটা দিল। কিছুটা গিয়ে একবার পেছন ফিরল।

“অনি।”

“হ্যাঁ।”

“কাউকে বলিস না।”

“বলব না।”

পলু চলে গেল।

অনিমেষ সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু গাছ থেকে জল টপকাচ্ছে এখনো। মাটি ভেজা, বাতাসে মাটির গন্ধ। সেই গন্ধকে বলে পেট্রিকোর — তখন এই শব্দ জানা ছিল না, এখন জানে।

কিন্তু সেই গন্ধ তখনো চিনত।

বৃষ্টির পর মাটির সেই গন্ধ মানে হলো — পৃথিবীটা একটু পরিষ্কার হলো। একটু শুদ্ধ হলো।

— ✦ —

বাড়ি ফিরে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এত ভিজলি কেন? ছাতা ছিল না?”

“ছিল না।”

“বললাম না নিতে?”

“ভুলে গিয়েছিলাম।”

মা তোয়ালে এনে মাথা মুছিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুছিয়ে দেওয়ার সময় মায়ের হাতের উষ্ণতা মাথায় লেগেছিল। সেই উষ্ণতা মনে আছে।

দুপুরে খেতে বসে সেদিন কম কথা বলেছিল অনিমেষ।

মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী হয়েছে, চুপচাপ কেন?”

“কিছু না।”

“পলুর কথা কিছু হয়েছে?”

অনিমেষ চমকে তাকিয়েছিল। মা কীভাবে জানলেন? মা হেসেছিলেন। বলেছিলেন, “মায়েরা জানে।”

এর বেশি কিছু বলেননি। জিজ্ঞেস করেননি। শুধু পাতে একটু বেশি মাছ দিয়েছিলেন।

সেই অতিরিক্ত মাছটুকু ছিল মায়ের ভাষা। সেই ভাষায় কথা ছিল না, কিন্তু অর্থ ছিল — “বুঝতে পেরেছি, কষ্ট পাচ্ছিস, ঠিক হয়ে যাবে।”

মায়েদের এই ভাষা বুঝতে অনেক বছর লাগে।

— ✦ —

সেই বিকেলে ঘুমানো হয়নি। বরং বসে বসে একটা কাজ করেছিল অনিমেষ, যেটা সাধারণত করত না।

ডায়েরি লিখেছিল।

স্কুলের খাতার শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠা ছিল ফাঁকা। সেখানে লিখেছিল — পলুর কথা, বৃষ্টির কথা, সেই কাঁধে হাত রাখার কথা। লেখার হাত ভালো ছিল না তখন, বাংলা বানান ভুল হতো মাঝে মাঝে। কিন্তু লিখেছিল।

সেই খাতাটা এখন নেই। বাড়ি বদলের সময় হারিয়ে গেছে। অনেক কিছুই হারিয়ে যায় বাড়ি বদলের সময় — শুধু জিনিস নয়, স্মৃতির ধারকও হারিয়ে যায়।

কিন্তু সেই লেখার অভ্যাসটা থেকে গিয়েছিল। কলেজে গিয়ে ডায়েরি লিখেছে। চাকরিতে ঢুকে লিখেছে। এখনো লেখে মাঝে মাঝে — রাত বারোটার পর, মোবাইলের নোটস অ্যাপে।

সেই লেখাগুলো কেউ পড়বে না জেনেও লেখে। হয়তো সেই কারণেই লিখতে পারে।

— ✦ —

পলু মারা যাওয়ার খবর পেয়েছিল ২০০৩ সালে।

তখন অনিমেষ কলকাতায়, মেসে থাকে। একটা বেসরকারি কোম্পানিতে সবে চাকরি ধরেছে। সকালবেলা ফোন করেছিল রাজু।

“পলু নেই রে।”

ব্যস। এইটুকু।

পলু মরতে পারে না। পলু যে হাসত — সেই হাসি কীভাবে থামে? পলু যে মাটি থেকে জামরুল কুড়িয়ে খেত, যে গাছে উঠতে পারত না তাই নিচে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিত — সে কীভাবে চলে যায়?

কিন্তু গেছে।

টাইফয়েড হয়েছিল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা হয়নি। পলুর মায়ের টাকা ছিল না। সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল।

দেরি হয়ে গেলে আর কিছু করার থাকে না।

— ✦ —

সেইদিন অফিসে যায়নি অনিমেষ। সারাদিন মেসের ছোট ঘরে বসে ছিল। বলেছিল, “শরীর খারাপ।”

কিন্তু শরীর খারাপ ছিল না। আরও গভীর কিছু একটা হয়েছিল।

মনে হয়েছিল — জীবনটা অনেক বেশি ভঙ্গুর। যে মানুষ হাসত, যে মানুষ বেঁচে থাকার মানে ছিল হাসির মধ্যে — সেও চলে যেতে পারে এত সহজে। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই।

সেই বোধটা তখন থেকে থেকে গেছে। চাপা পড়ে গেছে কাজের নিচে, সংসারের নিচে — কিন্তু চলে যায়নি।

— ✦ —

আজ সন্ধ্যায় রনিকে নিয়ে পাড়ায় হাঁটতে বেরিয়েছিল অনিমেষ। ফেরার পথে একটা ছোট মিষ্টির দোকান পড়ল।

রনি বলল, “বাবা, রসগোল্লা খাব।”

দুটো রসগোল্লা নিল। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে খেল দুজনে।

রনি খেতে খেতে বলল, “বাবা, তোমার ছোটবেলায় কী খেতে?”

অনিমেষ একটু থামল। তারপর বলল, “জামরুল।”

“জামরুল? সেটা কী?”

“একটা ফল। গোলাপি রঙের। খেলে মুখ মিষ্টি হয়ে যায়।”

“এখন পাওয়া যায় না?”

“যায়। কিন্তু এখন যেটা পাওয়া যায়, সেটার স্বাদ আলাদা।”

রনি ভ্রু কুঁচকাল। “স্বাদ আলাদা মানে? ফল তো ফলই।”

অনিমেষ হাসল। “বড় হলে বুঝবি।”

রনি আর কিছু বলল না। রসগোল্লা শেষ করল। হাত মুছল। তারপর বলল, “বাবা, কাল আবার আসব এখানে?”

“কেন?” — “ভালো লাগছে।”

দুজনে হাঁটতে লাগল। রনির হাত এবার নিজেই ধরল অনিমেষের হাত। সেই ধরাটা বুকের মধ্যে গিয়ে লাগল।

— ✦ —

রাতে খাওয়ার পর অনিমেষ মোবাইল নোটস অ্যাপ খুলে লিখল —

“পলু, আজ তোর কথা খুব মনে পড়ল। তুই হাসতিস। সবসময়। সেই হাসির পেছনে কতটা কষ্ট ছিল সেটা জানতাম, কিন্তু বুঝিনি। বুঝলে হয়তো আরেকটু কাছে থাকতাম। কিন্তু সতেরো বছর বয়সে বোঝার ক্ষমতা থাকে না। এখন বোঝার বয়স হয়েছে, তুই নেই। এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় অসুবিধা।”

তারপর আরেকটু লিখল —

“তুই যেখানে আছিস, আশা করি হাসছিস। তোর হাসি ছাড়া সেখানে মানায় না।”

মানুষের বুকের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা থাকে, সেটা প্রেম নয়, উচ্চাশা নয়, স্বপ্ন নয়।

সেটা হলো স্মৃতি।

স্মৃতি হলো মানুষের সবচেয়ে পুরনো বাড়ি। সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়া যায় যেকোনো সময় — চোখ বুজলে, নির্দিষ্ট একটা গন্ধ পেলে, কোনো গান শুনলে, বৃষ্টি নামলে।

সেই বাড়িতে পলু আছে, হাসছে। সেই বাড়িতে মীনাক্ষীর লাল ফিতে দুলছে। সেই বাড়িতে মা ভাতের মাড় ঢালছেন। সেই বাড়িতে বাবা বলছেন — “ভয় নেই, ধরে আছি।”

সেই বাড়িতে ফেরা যায়। সেই বাড়ি ভাঙে না।

রাতে ঘুমানোর আগে অনিমেষ আবার সেই বৃষ্টির দুপুরে ফিরে গেল। পলু মাথা তুলছে, চোখ মুছছে, হাসছে। “চল,” বলছে পলু। “মা একা আছেন।”

সেই হাসি। অন্ধকারেও আলো দেয়।

পরের পর্বে

সেই শেষ দুপুর, যেদিন গোপালনগর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, মা কাঁদেননি কিন্তু রান্নাঘরে বেশিক্ষণ ছিলেন, আর অনিমেষ প্রথমবার বুঝেছিল — ছেড়ে যাওয়া মানে কী।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর  |  পর্ব ৩ — বৃষ্টির দুপুর এবং পলুর চোখের জল

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →