By Ziya Pub Feb 27 Upd Mar 4

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — দ্বিতীয় পর্ব: মীনাক্ষীর বেণী এবং সময়ের গন্ধ

ক্লাসে মীনাক্ষীর বেণিতে লাল ফিতার সংখ্যা গোনা ছিল অনিমেষের গোপন অভ্যাস। আর বাবার হাত ধরে চূর্ণি নদীর পাড়ে শুনেছিল সেই কথা — "ভয় নেই, ধরে আছি।" সময়ের গন্ধ মানে কারো কথা না ভেবেও সব মনে পড়ে যাওয়া।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — দ্বিতীয় পর্ব: মীনাক্ষীর বেণী এবং সময়ের গন্ধ

একটি স্মৃতির উপন্যাস

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর

দ্বিতীয় পর্ব

“মীনাক্ষীর বেণী এবং সময়ের গন্ধ”

মীনাক্ষীর কথা মনে পড়লে অনিমেষের প্রথমে মুখ মনে পড়ে না।

মনে পড়ে পিঠ।

সেই পিঠ, যেখানে কালো চুলের বেণী ঝুলত। ক্লাসে অনিমেষ বসত তৃতীয় সারিতে, মীনাক্ষী বসত প্রথম সারিতে। তাই মীনাক্ষীর মুখ দেখার সুযোগ ছিল কম, কিন্তু সেই পিঠ, সেই বেণী — প্রতিটা ক্লাসে সামনে থাকত।

বেণীটা একটু বাঁকা থাকত সবসময়। ঠিক মাঝখান বরাবর নয়, একটু বাঁ দিকে হেলানো। আর বেণীর শেষে একটা লাল ফিতে। সেই ফিতেটা কখনো লাল, কখনো নীল, কখনো সবুজ — কিন্তু বেশিরভাগ দিন লাল।

অনিমেষ একদিন গুনেছিল।

টানা বারো দিন লাল ফিতে। তেরোতম দিন নীল। সেই দিন মনটা কেমন খারাপ হয়ে গিয়েছিল, কারণটা তখন বোঝেনি।

এখন বোঝে।

সেটাই ছিল প্রেম — নীল ফিতে দেখে মন খারাপ হওয়া।

— ✦ —

সেই বছরটা ছিল ১৯৯৭।

বাংলায় তখন টেলিভিশনে কলরব উঠছে, ডায়ানার মৃত্যু হয়েছে সেই বছরেই, পৃথিবী কাঁদছে — কিন্তু গোপালনগরের ছোট মফস্বলে সেই বড় পৃথিবীর খবর আসত ধীরে ধীরে, ফিল্টার হয়ে। সেখানে বড় খবর ছিল অন্য।

খবর ছিল — মীনাক্ষী চক্রবর্তী স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে।

এবারও।

প্রতি বছরই প্রথম হতো। অনিমেষ হতো পাঁচ বা ছয়। মাঝে মাঝে চার। একবার তৃতীয় হয়েছিল — সেই বছর বাড়ি ফিরে বাবার কাছে রেজাল্ট দেখাতে গিয়ে বলেছিল, “আর একটু হলে মীনাক্ষীকে টপকে যেতাম।” বাবা হেসেছিলেন। মা বলেছিলেন, “মেয়েটা ভালো পড়াশোনা করে, তাই না?”

ভালো পড়াশোনা করে।

এই কথাটা শুনে বুকের মধ্যে একটা গর্ব হয়েছিল। যেন মীনাক্ষীর প্রশংসা মানে নিজের প্রশংসা।

সেটাও প্রেম।

— ✦ —

কিন্তু দুপুরের সাথে মীনাক্ষীর যোগাযোগ?

সেই গল্পটা আলাদা।

স্কুল ছুটি হতো একটায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেড়টা। পথটা ছিল মিনিট পনেরোর। সেই পনেরো মিনিটের পথে একটা মোড় ছিল, সেই মোড়ে ডানদিকে গেলে অনিমেষের বাড়ি, বাঁ দিকে মীনাক্ষীদের বাড়ি।

প্রতিদিন সেই মোড়ে এসে অনিমেষ একটু থামত।

কারণ ছিল না। মানে কারণ ছিল, কিন্তু বলার মতো কারণ ছিল না। শুধু মনে হতো — আরেকটু হাঁটলে কি হয়? বাঁ দিকে যদি একটু যাওয়া যায়?

কখনো যায়নি।

শুধু দাঁড়িয়ে দেখত — মীনাক্ষী বাঁ দিকে মোড় নিচ্ছে, হাতে ব্যাগ, পিঠে সেই বেণী, লাল ফিতে দুলছে — তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে।

সেই দেখাটুকুই ছিল সম্বল।

— ✦ —

একদিন অবশ্য কথা হয়েছিল।

শুধু একদিন।

সেটা একটা বৃহস্পতিবার ছিল, অনিমেষ নিশ্চিত। কারণ বৃহস্পতিবার বাংলা ক্লাস থাকত শেষ পিরিয়ডে, আর বাংলা স্যার সেদিন অনুপস্থিত ছিলেন। তাই ক্লাস একটু আগে ছুটি হয়ে গিয়েছিল।

মীনাক্ষী একা বেরিয়েছিল সেদিন। সাধারণত তার সাথে দুটো মেয়ে থাকত, রিনা আর সুষমা। কিন্তু সেদিন ওরা কোথাও ছিল না। অনিমেষও একা। রাজু আর পলু অন্য রাস্তায় চলে গিয়েছিল।

সুতরাং — মোড়ের কাছে এসে দুজনেই পাশাপাশি।

মীনাক্ষী হাঁটছিল, হঠাৎ পায়ের স্যান্ডেলের ফিতে ছিঁড়ে গেল। সে থামল। অনিমেষও থামল — অটোমেটিক-ভাবে, কেন থামল সে জানে না।

মীনাক্ষী নিচু হয়ে স্যান্ডেল দেখছে। তারপর মাথা তুলে অনিমেষের দিকে তাকাল।

“তোমার কাছে কি একটু সুতো আছে?”

সুতো।

অনিমেষের কাছে সুতো থাকার কথা নয়। স্কুলব্যাগে বই আছে, খালি টিফিন বাক্স আছে, পেন্সিল কাঁচি আছে। সুতো নেই।

কিন্তু অনিমেষ সাথে সাথে বলল, “আছে।”

মিথ্যা কথা।

ব্যাগ খুলল। হাতড়াল। টিফিন বাক্সের ঢাকনায় একটু সুতো পেঁচিয়ে ছিল — কোত্থেকে এসেছে জানা নেই। বোধহয় ঘরে থেকেই আটকে গিয়েছিল। সেই সুতো বের করে মীনাক্ষীর দিকে এগিয়ে দিল।

মীনাক্ষী সুতোটা নিল। স্যান্ডেলের ফিতে বাঁধল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ধন্যবাদ।”

শুধু এইটুকু।

কিন্তু সেই “ধন্যবাদ” বলার সময় মীনাক্ষী একবার সরাসরি অনিমেষের চোখের দিকে তাকিয়েছিল।

সেই তাকানো।

পঁচিশ বছর পরেও সেই তাকানো মনে আছে। চোখ দুটো ছিল গাঢ় বাদামি রঙের, ভ্রু একটু মোটা, আর সেই চোখের কোণে একটু হাসির আভাস - কিনা,   আজও নিশ্চিত নয় অনিমেষ।

সেই দিন বাড়ি ফিরে দুপুরে ঘুমাতে যেয়ে ঘুম আসেনি। মা পাশে ঘুমিয়ে পড়েছেন, ছাদের দিকে তাকিয়ে শুধু ভেবেছে।

সেই সুতোর কথা। সেই চোখের কথা। সেই “ধন্যবাদ”-এর কথা।

— ✦ —

দুপুরের ভাবনা কখনো সরলরেখায় চলে না।

এটা অনিমেষ বুঝেছে এখন। সেই বয়সে বোঝেনি। দুপুরে শুয়ে থাকলে একটা ভাবনা আরেকটা ভাবনাকে ডাকে, তারপর সেই ভাবনা তৃতীয় আরেকটিকে। এভাবে একটা জাল তৈরি হয়।

সেই মীনাক্ষীর ভাবনা থেকে কীভাবে যেন চলে যেত নদীর কথায়।

গোপালনগরের পাশে একটা ছোট নদী ছিল। নাম ছিল চূর্ণী। এখনো আছে, কিন্তু শুকিয়ে গেছে অনেকটা। তখন ছিল টলটলে, কানায় কানায় ভরা। বিকেলে মাছরাঙা বসত সেই নদীর ধারে।

সেই নদীতে একবার বাবার সাথে স্নান করতে গিয়েছিল অনিমেষ। বাবার কাঁধে হাত রেখে জলে নামা। বাবার শরীরটা তখন শক্ত ছিল, পেশিবহুল — সরকারি চাকরি করতেন, সাইকেলে যেতেন অফিস, শরীরে বাড়তি মেদ ছিল না। সেই কাঁধে হাত রাখলে একটা নিরাপত্তার অনুভূতি হতো।

“ভয় নেই, আমি ধরে আছি।”
— কতবার যে এই কথাটা জীবনে দরকার হয়েছে, অথচ কাউকে বলতে পারেনি, আর কেউ বলেনি।

— ✦ —

দুপুরে একা শুয়ে থাকার আরেকটা বিপদ ছিল।

নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শোনা যেত।

সেই কণ্ঠস্বর সবসময় ভালো কথা বলত না। মাঝে মাঝে বলত — তুই কি পারবি? তুই কি আসলে ভালো ছাত্র? ইকবাল স্যার যেভাবে ক্লাসে বললেন, “অনিমেষ, তুমি আর কত অমনোযোগী হবে?” — সেটা কি সত্যি?

সেই কণ্ঠস্বরের সাথে প্রতিদিন একটা লড়াই হতো। সেই লড়াই কাউকে বলা যেত না। বাবাকে না, মাকে না, দাদাকে তো নয়ই। রাজু একদিন বলেছিল, “তুই বেশি ভাবিস, ভাবলে মাথা গরম হয়।”

হয়তো রাজু ঠিকই বলেছিল। কিন্তু সেই ভাবনাগুলো বন্ধ করা যেত না। সেগুলোই ছিল সেই দুপুরের সঙ্গী। সেই অস্থিরতা, সেই অনিশ্চয়তা, সেই প্রশ্নগুলো — এগুলো ছিল বলেই হয়তো বড় হওয়া সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু তখন বড় হতে চাওয়ার ইচ্ছা ছিল না।

তখন শুধু চাওয়া ছিল — এই দুপুরটা যেন শেষ না হয়।

— ✦ —

সেই দুপুরগুলো কবে শেষ হলো?

হঠাৎ করে নয়। ধীরে ধীরে।

প্রথমে এলো মাধ্যমিকের চাপ। তারপর উচ্চমাধ্যমিক। তারপর কলকাতা। কলকাতায় মেসে থাকলে দুপুরে ঘুমানোর জায়গা নেই। চার জন এক ঘরে, কেউ না কেউ পড়ছে বা কথা বলছে। সেই মফস্বলের নীরবতা কলকাতায় পাওয়া যায় না।

তারপর চাকরি। তারপর বিয়ে।

বিয়ের পর দুপুরগুলো বদলে গেল। স্ত্রী সুপর্ণা ছিলেন উদ্যমী মানুষ। দুপুরে ঘুমানো তাঁর পছন্দ ছিল না। আস্তে আস্তে সেই দুপুর হারিয়ে গেল। যেভাবে অনেক জিনিস হারিয়ে যায় — হইচই না করে, নিঃশব্দে।

— ✦ —

আজ অফিসে মিটিং শেষ হলো সাড়ে তিনটায়।

অনিমেষ আবার চেয়ারে হেলান দিল। সুপর্ণা গেছে মায়ের বাড়ি। ছেলে টিউশন থেকে ফিরবে পাঁচটায়। মেয়ে স্কুলে।

বাড়িতে একা।

এসি বন্ধ করল অনিমেষ। জানালাটা খুলল। বাইরের গরম হাওয়া ভেতরে এলো। সোফায় শুয়ে পড়ল। ছাদের দিকে তাকাল।

ছাদ সাদা। মসৃণ। ফাটল নেই, দাগ নেই। সেই পুরনো বাড়ির ছাদে দাগ ছিল — বৃষ্টির দাগ, হলুদ হয়ে যাওয়া পুরনো চিহ্ন। সেই ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকলে নানা আকৃতি দেখা যেত — মেঘের মতো, পাখির মতো, মাঝে মাঝে মানুষের মুখের মতো।

এই ছাদে কিছু নেই।

কিন্তু অনিমেষ তাকিয়ে রইল। আস্তে আস্তে সেই গোলাপি রঙের জামরুলের গন্ধ নাকে এলো — না, আসলে এলো না, মনে এলো। গন্ধের স্মৃতি। পলুর হাসির কথা মনে পড়ল। মীনাক্ষীর বেণীর কথা। বাবার “ভয় নেই, ধরে আছি।”

চোখ বুজে গেল।

বহুদিন পর দুপুরে ঘুম এলো।

সেই ঘুমের মধ্যে একটা স্বপ্ন এলো। মফস্বলের সেই মোড়। মীনাক্ষী হাঁটছে, লাল ফিতে দুলছে। রাজু গাছে উঠছে, পলু নিচে হাসছে। মা রান্নাঘরে ভাতের মাড় ঢালছেন, সেই গন্ধ বাতাসে ভাসছে। বাবা সাইকেলে চলে যাচ্ছেন অফিসে, পেছন ফিরে একবার হাত নাড়ছেন।

সেই স্বপ্নে কোনো কথা নেই, কোনো ঘটনা নেই।

শুধু আছে সেই দুপুরের আলো — তির্যক, সোনালি, একটু ঘোলাটে — যে আলো আর কখনো পাওয়া যায় না, কিন্তু বন্ধ চোখে এখনো দেখা যায়।

— ✦ —

ঘুম ভাঙল পাঁচটায়।

ছেলে ফিরে এসেছে। দরজার বেল বাজছে।

অনিমেষ উঠে দরজা খুলল। ছেলের নাম রনি, বয়স বারো। ব্যাগ কাঁধে, ঘেমে একশা।

“বাবা, ঘুমাচ্ছিলে নাকি?”

“হ্যাঁ।”

“দুপুরে ঘুমাও নাকি তুমি? মা বলে তুমি নাকি কখনো দুপুরে ঘুমাও না।”

অনিমেষ হাসল। “আজ ঘুমালাম।”

রনি ভেতরে ঢুকে ব্যাগ রাখল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বের করল। এক চুমুকে অর্ধেক শেষ করল।

অনিমেষ দেখল। দেখতে দেখতে মনে হলো — এই ছেলে কি জানে? এই জল খাওয়ার মুহূর্তটা, এই বারো বছর বয়সের এই দুপুরটা — একদিন তার কাছেও স্বপ্নের মতো মনে হবে?

বলবে কি তাকে? না।

বললে সে বুঝবে না। না বুঝলেই ভালো। কারণ যে দুপুর বুঝতে পারে, সে দুপুর হারিয়ে যাওয়া দুপুর। যে দুপুর বোঝে না, সে দুপুর এখনো আছে।

অনিমেষ শুধু বলল, “রনি, আজ বিকেলে বাইরে যাবি? পাড়ায় একটু হাঁটি দুজনে?”

“যাব। কিন্তু কেন?”

“এমনি।”

— ✦ —

বাইরে তখন আলো নামছে।

সেই আলো দুপুরের নয়, বিকেলের। কিন্তু এই আলোর মধ্যেও কোথাও সেই দুপুরের ছায়া আছে।

অনিমেষ হাঁটছে, পাশে রনি। রনির হাত ধরল অনিমেষ।

রনি একটু লাজুক হলো — বারো বছর বয়সে বাবার হাত ধরা একটু অস্বস্তির।

কিন্তু হাত ছাড়াল না।

 

আর অনিমেষের মনের ভেতর, সেই পুরনো দুপুরের নীরবতায়, কে যেন বলল —

“ভয় নেই। ধরে আছি।”

পরের পর্বে

সেই বৃষ্টির দুপুর, যেদিন পলু কেঁদেছিল, আর অনিমেষ প্রথম বুঝেছিল বন্ধুত্ব মানে কী।

মধ্যাহ্নের রোদ্দুর  |  পর্ব ২ — মীনাক্ষীর বেণী এবং সময়ের গন্ধ

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →