মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — প্রথম পর্ব: যে দুপুর আর ফেরে না
চৈত্রের এক কাঠফাটা দুপুরে কারেন্ট চলে গেলে বিয়াল্লিশ বছরের অনিমেষের স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসে গোপালনগরের সেই নিস্তব্ধ দুপুর। সেই জামরুল গাছ, সেই রাস্তার ধুলো, রাজু আর পলুর হাসি — যা কখনো যায়নি, শুধু চাপা পড়েছিল।
একটি স্মৃতির উপন্যাস
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর
“যে দুপুর আর ফেরে না”
দুপুরবেলার একটা গন্ধ আছে।
সেই গন্ধ শুধু নাকে লাগে না — বুকের ভেতরে কোথাও একটা জায়গায় গিয়ে আঘাত করে, এমন জায়গায় যেখানে স্পর্শ করলে মানুষ কাঁদে কিনা জানে না, কিন্তু চোখ ভিজে যায়। সেই গন্ধ রান্নাঘর থেকে আসা ভাতের মাড়ের গন্ধ নয়, পুকুরের কচুরিপানার গন্ধও নয়। সেই গন্ধ হলো সময়ের নিজের গন্ধ — যে সময় চলে গেছে, যে দুপুর আর কোনোদিন ফিরবে না, তার গায়ের গন্ধ।
অনিমেষ আজ অনেকদিন পর সেই গন্ধটা পেল।

শহরের তিন তলার ফ্ল্যাটে বসে, এসির ঠান্ডায় জমে যাওয়া বিকেলে, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। লোডশেডিং। এই শহরে আজকাল আর লোডশেডিং হয় না বললেই চলে, কিন্তু আজ হলো। এসি বন্ধ হয়ে গেল, ল্যাপটপ ব্যাটারিতে চলছে, আর তখনই — জানালার পর্দাটা একটু সরে গেল, বাইরের গরম হাওয়া ভেতরে এলো, আর সেই হাওয়ার সাথে এলো সেই গন্ধ।
অনিমেষ চুপ করে বসে রইল।
বয়স তার বেয়াল্লিশ। চুলে পাক ধরেছে কানের কাছে। চোখের নিচে কালি আছে, কারণ রাত বারোটার আগে ঘুমানো হয় না। দুই ছেলেমেয়ে, একটা বড় কর্পোরেট চাকরি, একটা ইএমআই চলছে ফ্ল্যাটের, আরেকটা গাড়ির। জীবন ঠিকঠাক আছে, মানে ঠিকঠাকের যে সংজ্ঞা আজকাল মানুষ দেয়, সেই হিসেবে।
কিন্তু সেই হাওয়া এলো, আর অনিমেষ হঠাৎ দেখল সে আর তিন তলার ফ্ল্যাটে নেই।
সে আছে পঁচিশ বছর আগের সেই বাড়িতে। নদীয়া জেলার ছোট একটা মফস্বল শহর, গোপালনগর। বাবার বদলির চাকরি, তাই বাড়িভাড়া। কিন্তু সেই বাড়াভাড়া বাড়িটাই ছিল পুরো পৃথিবী।
— ✦ —
দুপুর ঠিক বারোটা থেকে তিনটে।
এই তিন ঘণ্টা ছিল একটা আলাদা জগৎ। স্কুল থেকে ফেরার পর মা বলত, “হাত-পা ধুয়ে কাপড় ছাড়, খেতে বস।” মায়ের গলায় সেই নির্দেশের ভেতরেও একটা উষ্ণতা ছিল, যেটা বুঝতে তখন পারেনি অনিমেষ, এখন বোঝে। এখন বোঝে মানে — এখন বুকে লাগে।
স্কুলের পোশাক ছেড়ে গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরা হতো। সেই গেঞ্জিটা একটু বড় ছিল, কারণ দাদার কাছ থেকে নামানো। দাদা মানে বড়দা, বয়সে পাঁচ বছরের বড়। তখন তাকে দেখলে মনে হতো, ইনি হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। এখন দাদা ব্যাঙ্গালোরে থাকেন, ফোনে কথা হয় মাঝেমাঝে, বেশিরভাগ সময় “পরে কথা বলব” বলে রেখে দেন।

ভাত খেতে বসলে পাতে পড়ত মায়ের হাতের রান্না। সেই রান্নার কথা লিখতে গেলে আলাদা একটা অধ্যায় লাগবে। শুধু এটুকু বলা যাক — মুগ ডাল, আলু ভাজা, আর মাছের ঝোল। এই তিনটে জিনিস দিয়ে যে পরিমাণ সুখ পাওয়া যেত, এখন পাঁচতারা হোটেলের মেনু দেখলেও সেই অনুভূতি হয় না।
ভাত খেতে খেতে মা পাশে বসে থাকতেন। জিজ্ঞেস করতেন স্কুলের কথা। কী পড়ালেন স্যার, কোনো বন্ধু কিছু বলেছে কিনা, টিফিন খেয়েছিস কিনা। অনিমেষ বেশিরভাগ সময় এক কথায় উত্তর দিত। এখন মনে হয়, সেই সময়টুকু আরেকটু কথা বললে হতো। মা-র সাথে আরেকটু বেশি গল্প করলে হতো।
মা এখন আর নেই।
তিন বছর আগে চলে গেছেন। হঠাৎ করে। সেই ধাক্কা এখনো সামলানো হয়নি, সামলানো যায় না। মাঝরাতে কখনো কখনো মনে হয় উঠে মাকে ফোন করবে, তারপর মনে পড়ে।
— ✦ —
খাওয়া শেষ হলে মায়ের নির্দেশ ছিল — ঘুমাতে হবে।
বিছানা পাতা হতো। সেই বিছানা মানে খাটিয়া, পাটের দড়ি বোনা। তার উপর একটা পাতলা তোশক। গরমকালে একটা সুতির চাদর। সেই বিছানায় শুলে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকত অনিমেষ।
ঘুম আসত না।
ঘুম আসার কথাও ছিল না। বয়স তখন সতেরো। সতেরো বছর বয়সে দুপুরে ঘুমানোর কথা না, এই সত্য তখন অনিমেষ জানত, মাও জানতেন। কিন্তু মা বলতেন ঘুমাতে, কারণ ওই সময়টুকু ছিল মায়ের নিজের একটু বিশ্রামের সময়। সংসারের কাজ করতে করতে মা-ও ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, কিন্তু নিজে থেকে বিশ্রাম নিতেন না। বলতেন ছেলেকে ঘুমাতে, আর নিজেও শুয়ে পড়তেন পাশে।
মায়ের শ্বাসের শব্দ শোনা যেত। একটু একটু করে সেই শ্বাসের তাল পরিবর্তন হতো, বোঝা যেত মা ঘুমিয়ে পড়েছেন।
আর তখনই শুরু হতো আসল দুপুর।
— ✦ —
সেই দুপুর কেমন ছিল?
বাইরে রোদ আগুনের মতো। পিচ রাস্তা গলে যেত, হয়তো বা যেত না কিন্তু মনে হতো গলে যাচ্ছে। গাছের পাতাও নড়ত না। দূরে কোথাও একটা কাক ডাকত, সেই ডাকও যেন ক্লান্ত। মাঝে মাঝে সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ, ফেরিওয়ালার ডাক — “বরফ আছে, বরফ” — সেই ডাক শুনলে গলার কাছে কেমন করে উঠত।
সেই সময়ে অনিমেষ কী করত?
বই পড়ত।
মায়ের চোখ এড়িয়ে, বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখা বই। সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, শংকরের গল্প। একবার একটা বই এনেছিল বন্ধু তারকেশ্বরের কাছ থেকে, সেটার নাম বলা যাবে না, কারণ সেটা ছিল সেই বয়সের নিষিদ্ধ জ্ঞানের বই। সেটা পড়তে পড়তে কানটা গরম হয়ে গিয়েছিল, লজ্জায় নয় — উত্তেজনায়।
কিন্তু বই পড়া ছাড়াও আরেকটা কাজ করত।
শুধু শুয়ে ভাবত।
এই ভাবার একটা আলাদা স্বাদ ছিল। কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো সমস্যা সমাধান নেই, কোনো দায়িত্ব নেই। শুধু ভাবনা। যেমন — পৃথিবীটা আসলে গোলাকার, কিন্তু তাহলে অস্ট্রেলিয়ার লোকেরা কীভাবে নিচে থেকে পড়ে না? মহাকাশে কি সত্যিই কেউ আছে? মীনাক্ষী, ক্লাসে যে মেয়েটা সামনের সারিতে বসে, তার চুলের বেণী বাঁধার ধরনটা এত সুন্দর কেন?
মীনাক্ষী।
সেই নামটা মনে আসতেই অনিমেষের বুকে একটা পুরনো ব্যথা নাড়া দিল। পঁচিশ বছর আগের ব্যথা, কিন্তু আজও সতেজ। প্রেম হয়েছিল কিনা জানা নেই, কারণ সেই বয়সে প্রেম কী তা বোঝার আগেই সেই অনুভূতিটা বুকের মধ্যে থিতু হয়ে গিয়েছিল।
— ✦ —
সেই দুপুরের আরেকটা স্মৃতি আছে।
বাড়ির পাশে একটা বড় জামরুল গাছ ছিল। গরমকালে সেই গাছে জামরুল ধরত — গোলাপি রঙের, মিষ্টি গন্ধের। মায়ের নিষেধ ছিল দুপুরে গাছে চড়ার। কিন্তু নিষেধ মানা হতো না।
মা ঘুমিয়ে পড়লে, পা টিপে টিপে উঠে, পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাওয়া। সূর্যের আলো সরাসরি মাথায় পড়ত, মাথা ঘুরত একটু। কিন্তু সেই গাছতলায় গেলে একটু ছায়া পাওয়া যেত।
আর সেখানে থাকত পাড়ার আরও দুটো ছেলে।
রাজু আর পলু।
রাজু ছিল মুচি পাড়ার ছেলে, কিন্তু তখন সেটা মাথায় আসেনি কখনো। রাজু ছিল সবচেয়ে দুঃসাহসী — এমন কোনো গাছ ছিল না যেটায় সে উঠতে পারত না। পলু ছিল মোটাসোটা, সবসময় হাসিখুশি, যেকোনো পরিস্থিতিতে হাসত, তাই তাকে দেখলে মনটা ভালো হয়ে যেত।

এই তিনজন মিলে সেই দুপুরে জামরুল পাড়ত।
গাছে ওঠার দরকার হতো না সবসময়। একটা লম্বা বাঁশ ছিল, তার ডগায় একটা কাঁটাওয়ালা লোহার হুক বেঁধে দিয়েছিল রাজু। সেই হুক দিয়ে ডাল ধরে টান দিলে জামরুল ঝরে পড়ত। সেই পাড়া জামরুল মাটি থেকে কুড়িয়ে খাওয়া — একটু মাটি লেগে থাকলেও পরোয়া ছিল না।
সেই জামরুলের স্বাদ।
আজও মুখে আসে।
এখন জামরুল কিনতে পাওয়া যায়, সুপারশপে সুন্দর করে প্যাকেটে ভরা। কিন্তু সেই স্বাদ নেই। হয়তো জামরুলের দোষ নয়, হয়তো সেই স্বাদটা ছিল সেই রোদের মধ্যে, সেই তিনজনের মধ্যে, সেই নিষিদ্ধ আনন্দের মধ্যে।
— ✦ —
রাজুর সাথে আর যোগাযোগ নেই।
শুনেছে সে এখন ঢাকায় কোনো গার্মেন্টসে কাজ করে। পলু মারা গেছে। অনেক আগে — বাইশ-তেইশ বছর বয়সে, জ্বরে। সেই খবর পেয়ে অনিমেষ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। কাঁদেনি। কাঁদার মতো বয়স তখনো হয়নি হয়তো। কিন্তু বুকের ভেতর একটা জিনিস ভেঙে গিয়েছিল, সেটা বোঝা গিয়েছিল।
এখন পলুর কথা মনে হলে কাঁদতে পারে।
বয়স বাড়লে মানুষ কাঁদতে পারে বেশি। এটা দুর্বলতা নয়, বরং পরিপক্কতা। যে জিনিসের মূল্য বোঝা যায়, তার জন্য কাঁদা যায়। তখন বোঝা যায়নি, এখন বোঝা যায়।
— ✦ —
সেই দুপুরে সবচেয়ে অদ্ভুত যে জিনিসটা মনে আছে অনিমেষের, সেটা হলো শব্দ।
দুপুরের শব্দ।
শহরে থাকলে বোঝা যায় না, কিন্তু সেই মফস্বলে দুপুরে একটা অদ্ভুত নীরবতা নামত। সেই নীরবতা কানের পর্দায় চাপ দিত। আর সেই নীরবতার ভেতর দিয়ে ভেসে আসত ছোট ছোট শব্দ।
দূরের মসজিদ থেকে আজানের শেষ অংশ।
কোথাও রেডিওতে বাংলা গান — সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “আমার মনের মাধুরী মিশায়ে” — মনে হতো সেই গান বাতাসে ভেসে আসছে দূর থেকে, অনেক দূর থেকে।
বাড়ির কাছে রাস্তায় কেউ হাঁটছে, তার জুতার শব্দ — খট খট — তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে।
একটা পাখি ডাকছে, কোন পাখি জানা নেই, কিন্তু সেই ডাক একবার ডেকে থামছে, যেন সেও জানে দুপুরে বেশি শোরগোল করতে নেই।
আর সবচেয়ে স্পষ্ট যে শব্দটা মনে আছে — পাশের ঘর থেকে বাবার নাক ডাকার শব্দ।
বাবা দুপুরে ঘুমাতেন। তাঁর ঘুম ছিল গভীর, নাক ডাকা ছিল জোরালো। কিন্তু সেই শব্দ অস্বস্তির ছিল না। বরং সেই শব্দটাই ছিল নিরাপত্তার প্রমাণ। মানে বাবা আছেন। বাড়িতে আছেন। সবকিছু ঠিক আছে।
বাবা এখন আছেন। কিন্তু বুড়ো হয়ে গেছেন। গ্রামের বাড়িতে থাকেন, একা। অনিমেষ মাসে একবার যাওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কাজের চাপে মাঝেমাঝে দুই মাস হয়ে যায়। বাবা কিছু বলেন না। শুধু বলেন, “ভালো আছিস তো?”
“ভালো আছিস তো?”
— এই প্রশ্নের মধ্যে কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, সেটা বোঝার জন্য বেয়াল্লিশ বছর লেগে গেছে।
— ✦ —
লোডশেডিং শেষ হয়ে এলো।
এসি ফের চালু হলো। ঠান্ডা বাতাস ঘরে ভরে গেল। সেই জানালার হাওয়া আর নেই, সেই গন্ধও নেই।
অনিমেষ ল্যাপটপের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে ইমেইল খোলা — একটা মিটিংয়ের রিমাইন্ডার। তিনটায় কনফারেন্স কল।
ঘড়িতে তখন দুটো পঞ্চান্ন।
পাঁচ মিনিট।
অনিমেষ চেয়ার ছেড়ে উঠল না। উঠল না মানে উঠতে পারল না। বুকের ভেতর কেমন একটা ভার জমে আছে। সেই ভার চেনা, কিন্তু এই মুহূর্তে যেন আরও ভারী লাগছে।
সে মোবাইল তুলল।
বাবার নম্বর খুঁজল।
বেজে গেল তিনবার। তারপর —
“হ্যাঁ রে, অনি? কী হলো? ভালো আছিস তো?”
সেই গলা। সেই প্রশ্ন।
অনিমেষের গলায় কথা আটকে গেল। কী বলবে সে? বলবে যে হঠাৎ তোমার নাক ডাকার কথা মনে পড়ল? বলবে যে সেই দুপুরের কথা মনে পড়ছে যখন তুমি পাশের ঘরে ঘুমাতে আর আমি নিশ্চিন্তে জামরুল চুরি করতে যেতাম?
বলল না।
বলল, “হ্যাঁ বাবা, ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”
“ভালো, ভালো। দুপুরে কী খেলি?”
“খেয়েছি।”
“ভাত খেলি তো? এই শহরে তোরা ঠিকমতো ভাত খাস না, জানি।”
অনিমেষ একটু হাসল। চোখ ভিজে গেছে। কিন্তু হাসল।
“খেয়েছি বাবা। ভাত খেয়েছি।”
“ঠিক আছে। কাজ করছিস? তাহলে থাক, পরে কথা হবে।”
“না, না, বাবা। কাজ নেই। একটু কথা বলি?”
একটু চুপ।
তারপর বাবার গলায় যেন একটা উষ্ণতা নামল। বললেন, “হ্যাঁ রে, বল।”
আর অনিমেষ বলতে লাগল। কী বলল সে নিজেও জানে না। শুধু কথা বলল। সেই মফস্বলের কথা, সেই গাছের কথা, সেই দুপুরের কথা না বলে, অন্য কথা। যেকোনো কথা। কারণ কথা বলাটাই দরকার ছিল।
বাইরে রোদ ততক্ষণে একটু হেলে পড়েছে। বিকেল আসছে।
কিন্তু সেই দুপুর — সেই মধ্যাহ্নের রোদ্দুর — বুকের মধ্যে জ্বলছে। জ্বলছে মানে পুড়ছে না। জ্বলছে মানে আলো দিচ্ছে।
আর আলো মানে স্মৃতি।
আর স্মৃতি মানে — আমরা এখনো বেঁচে আছি।
পরের পর্বে
মীনাক্ষীর কথা, সেই স্কুলের মাঠ, আর যে দুপুরে প্রথম বুঝেছিল ভালোবাসা কী জিনিস।
মধ্যাহ্নের রোদ্দুর | পর্ব ১ — যে দুপুর আর ফেরে না
