কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ পর্ব : পুরনো বাড়ির ধ্বংস আর সংস্কৃতির টিকে থাকার লড়াই
কলকাতার পুরনো গলিগুলো আজ ধ্বংসের মুখে। আধুনিক ফ্ল্যাট সংস্কৃতির চাপে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ও পাড়ার সংস্কৃতি, তবুও কিছু মানুষ আজও আগলে রেখেছেন তাদের শিকড় ও স্মৃতি।
ষষ্ঠ পর্ব · গলির গল্প
আজকের গলি: মুছে যাওয়া আর টিকে থাকা
✦
এবার কঠিন কথা বলার সময়।
কলকাতার গলি বিপদে আছে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
১ — ধ্বংসের পথে
উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়িগুলো ভেঙে পড়ছে। প্রতি বছর বর্ষায় কিছু বাড়ি ধসে যায়। মানুষ মরে। তখন খবর হয়।
কিন্তু তার বাইরে যে ধ্বংস চলছে — সেটা খবর হয় না।
একটা রাজবাড়ি আর টেকানো যাচ্ছে না। উত্তরাধিকারীরা বিদেশে থাকেন, সংস্কারের টাকা নেই, রেন্ট কন্ট্রোলের কারণে ভাড়াটেও সরানো যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায় একটা ডেভেলপারের কাছে। তিন মাসের মধ্যে বুলডোজার আসে। পাঁচতলা কংক্রিটের ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে যায়।
নতুন বাড়িতে থাকেন মধ্যবিত্ত পরিবার। আধুনিক ফ্ল্যাট। লিফট আছে। কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। গলির মানুষদের চেনেন না। গলির ইতিহাস জানেন না।
এইভাবে একটা একটা করে গলির স্মৃতি মুছে যাচ্ছে।

ভেঙে পড়া রাজবাড়ি — স্মৃতির শেষ দেওয়াল
২ — সংস্কৃতির মৃত্যু
ভৌত ধ্বংসের চেয়ে আরও বড় ক্ষতি হচ্ছে সাংস্কৃতিক।
গলির বাচ্চারা এখন বাইরে খেলে না। স্কুলের পর কোচিং, তারপর ফোন। গলির ক্রিকেট উঠে গেছে।
চায়ের দোকানের আড্ডা কমে এসেছে। সবাই ফোনে।
পাড়ার পুজোর উৎসাহ কমছে। নতুন প্রজন্ম পুজোয় যায়, কিন্তু দায়িত্ব নিতে রাজি নয়।
মুদিখানার দোকান বন্ধ হচ্ছে। কারণ অনলাইনে সস্তায় পাওয়া যায়।
এই পরিবর্তনগুলো একা একা ছোট মনে হয়। কিন্তু সব মিলিয়ে — গলির প্রাণটা বেরিয়ে যাচ্ছে।
৩ — তবুও বেঁচে আছে
কিন্তু একটা কথা বলি।
গলি মরেনি।
কলকাতার কিছু কিছু গলি এখনও সজীব। এখনও সেখানে চায়ের দোকানে আড্ডা হয়। এখনও সন্ধেবেলা বাচ্চারা খেলে। এখনও ঠাকুমা জানলায় বসে থাকেন।
এবং একটা নতুন প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
দক্ষিণ কলকাতার গলিতে তরুণ শিল্পী, লেখক, গবেষকরা আসছেন। পুরনো বাড়িকে ভালোবাসছেন। হেরিটেজ ওয়াক করাচ্ছেন। ফটোগ্রাফি করছেন। ইনস্টাগ্রামে তুলছেন।
এটা নিখুঁত নয়। এতে জেন্ট্রিফিকেশনের ঝুঁকি আছে — মানে পুরনো বাসিন্দারা সরে গিয়ে নতুন "ট্রেন্ডি" মানুষরা আসেন। কিন্তু এই নতুন আগ্রহটুকুই গলির প্রতি ভালোবাসার লক্ষণ।
৪ — যারা থেকে গেছেন
এই শহরে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা থেকে যাওয়াটাকে বেছে নিয়েছেন।
নিলুফার খাতুন। বয়স পঁচাত্তর। উত্তর কলকাতার একটা গলির তিনতলা বাড়িতে একা থাকেন। তার ছেলে মুম্বাইতে, মেয়ে আমেরিকায়। তারা বলেছেন চলে আসতে।
কিন্তু নিলুফার যাননি।
"এই গলিতে আমার ষাট বছর। এখানকার প্রতিটা ইট আমি চিনি। এখান থেকে গেলে মরে যাব।"
তিনি ঠিকই বলেছেন। গলি আর মানুষের মধ্যে এই সম্পর্কটা শুধু বাসস্থানের সম্পর্ক নয়। এটা পরিচয়ের সম্পর্ক। গলিটা তার পরিচয়ের অংশ। গলি ছাড়লে পরিচয় যাবে।
অপূর্ব ঘোষ। বয়স পঞ্চাশ। পাথুরিয়াঘাটার একটা গলিতে পাঁচতলা পুরনো বাড়ির দুটো ঘরে থাকেন। বাড়িটা তার পূর্বপুরুষের। ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে। দেওয়াল ভেঙে পড়ছে।
কিন্তু বিক্রি করবেন না।
"এই বাড়িতে আমার ঠাকুরদা মারা গেছেন। বাবা মারা গেছেন। আমিও এখানে মারা যাব। এটাই আমার বাড়ি।"
এই মানুষগুলো গলির শেষ রক্ষক।

গলির শেষ রক্ষক — থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত
উপসংহার
গলি আছে, থাকবে
✦
শেষ করার আগে একটা দৃশ্য।
রাত এগারোটা। কলকাতার উত্তরের একটা গলি। অষ্টমীর রাত। পুজোর আলো।
গলির মুখে একটা মণ্ডপ। দেবী দুর্গা। তার সামনে ঢাক বাজছে। ধূপের ধোঁয়া। মেয়েরা উলুধ্বনি দিচ্ছেন। বাচ্চারা ছুটছে। বৃদ্ধরা বসে আছেন মণ্ডপের পাশের চেয়ারে।
গলির সব বাড়ির সব মানুষ এখন এখানে। একটা পরিবার।
একজন প্রবাসী ছেলে এসেছে টরন্টো থেকে। সে দাঁড়িয়ে আছে মণ্ডপের পাশে। তার চোখে জল।
কেন?
কারণ এই মুহূর্তটা তার পরিচয়। এই মণ্ডপ, এই গলি, এই মানুষগুলো — এগুলো ছাড়া সে কে? একটা নাম। একটা পাসপোর্ট নম্বর।
কিন্তু এই গলিতে সে অমুক বাড়ির ছেলে। এই গলির সে চোখের মণি। এই গলি তাকে চেনে। মনে রেখেছে।
এটাই গলি দেয়। এটা আর কেউ দিতে পারে না।
কলকাতার গলি মরছে না। পাল্টাচ্ছে। কিছু গলি সত্যিই মারা যাচ্ছে। কিন্তু কিছু গলি বাঁচছে — এবং এমন মানুষ আছেন যারা বাঁচাতে চাইছেন।
আপনিও সেই মানুষদের মধ্যে একজন হতে পারেন। শুধু একটাই করতে হবে।
গলিতে ঢুকুন।
আজই। এই মুহূর্তে।
বাইরে একটা গলি আছে। সে অপেক্ষা করছে। বহুকাল ধরে অপেক্ষা করছে।
তার গল্প আছে। আপনাকে বলতে চায়।
শুধু একটু সময় দিন।

অষ্টমীর রাত — পরিচয়ের মুহূর্ত
✦
গলির গল্প শেষ হয় না।
পাথরে লেখা থাকে।
ধুলোয় মিশে থাকে।
হাওয়ায় ভেসে থাকে।
শুধু একটু কান পাতলেই শোনা যায়।
✦
গলির গল্প শেষ হয় না।
পাথরে লেখা থাকে। ধুলোয় মিশে থাকে। হাওয়ায় ভেসে থাকে।
✦
ষষ্ঠ পর্ব ও উপসংহার সমাপ্ত · গলির গল্প
