By Ziya Pub Mar 23 Upd Mar 23

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - পঞ্চম পর্ব : আড্ডা থেকে দুর্গাপুজো

কলকাতার গলির আড্ডা আর দুর্গাপুজো কেবল উৎসব নয়, বরং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার মূল ভিত্তি। এই নিবন্ধে উঠে এসেছে কলকাতার অলিগলির সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও প্রাণের স্পন্দন।

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - পঞ্চম পর্ব  : আড্ডা থেকে দুর্গাপুজো

পঞ্চম পর্ব · গলির গল্প

সংস্কৃতির শিকড়

কলকাতা যে সংস্কৃতি পৃথিবীকে দিয়েছে — রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা, জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান, সুভাষচন্দ্রের রাজনীতি — এই সবকিছুর শিকড় কোথায়? সবকিছুর শিকড় গলিতে।

১ — আড্ডা: গলির সর্বোচ্চ শিল্প

"আড্ডা" — এই শব্দটা অনুবাদ করা যায় না। ইংরেজিতে "conversation" বললে পুরোটা বলা হয় না। "Gathering" বললেও না। "Discussion" তো একদমই না।

আড্ডা হল এমন একটা কথোপকথন যার কোনো উদ্দেশ্য নেই, কোনো সময়সীমা নেই, কোনো ফলাফলের প্রয়োজন নেই। কথা বলা হয় কথা বলার আনন্দে। চিন্তা করা হয় চিন্তা করার সুখে।

কলকাতার গলিতে চায়ের দোকানে, মন্দিরের সিঁড়িতে, পাড়ার রোয়াকে যে আড্ডা বসে — সেটাই বাংলার সবচেয়ে পুরনো বুদ্ধিজীবী ঐতিহ্য।

রবীন্দ্রনাথ আড্ডা দিয়েছেন। বিবেকানন্দ আড্ডা দিয়েছেন। সত্যজিৎ রায় আড্ডা দিয়েছেন। এই মানুষগুলো যে চিন্তাগুলো পরে গ্রন্থে লিখেছেন, সিনেমায় দেখিয়েছেন — সেগুলোর প্রথম জন্ম হয়েছে গলির আড্ডায়।

আজকের কলকাতায় আড্ডা কমে যাচ্ছে। মানুষ স্মার্টফোন নিয়ে ব্যস্ত। দোকানে বসে আর কথা না বলে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করেন। এটা ক্ষতি — বড় ক্ষতি। কারণ আড্ডায় যে চিন্তার আদান-প্রদান হয়, সেটা কোনো অ্যাপে হয় না।


গলির চায়ের দোকানে আড্ডা — বাংলার সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্র

২ — দুর্গাপুজো: গলির সর্বোচ্চ উৎসব

কলকাতার দুর্গাপুজো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবের একটি। ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিয়েছে।

কিন্তু এই উৎসবটা আসলে কি — তা বোঝার জন্য বড় রাস্তার থিমড পুজো নয়, গলির পুজো দেখতে হবে।

গলির পুজো মানে পাড়ার পুজো। প্রতিটা গলির নিজস্ব পুজো কমিটি। নিজস্ব মণ্ডপ। নিজস্ব দুর্গা।

পুজোর এক মাস আগে থেকে গলিতে উত্তেজনা শুরু হয়। বাঁশের কাঠামো আসে। রঙিন কাপড় আসে। আলোর তার লাগানো হয়। কমিটির বৈঠক বসে রাতের পর রাত — কোন শিল্পী আসবেন, কে গাইবেন, থিম কী হবে।

মহালয়ার রাতে গলিতে ঘুম নেই। ঘরে ঘরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী বাজছে। ভোর চারটায় রেডিওতে — এই শোনাটা এখনও চলছে। তিন প্রজন্ম ধরে। এটা ভাঙে না।

পুজোর পাঁচদিন গলি হয়ে ওঠে গোটা পাড়ার ঘর। রাত তিনটায় মণ্ডপের সামনে মানুষ। বাচ্চারা ঘুরছে। বৃদ্ধরা বসে আছেন। প্রবাসী ছেলেমেয়ে ফিরে এসেছে — পুজোর জন্য। কারণ পুজো মানে গলি। গলি মানে বাড়ি। বাড়ি মানে আসল পরিচয়।

সিঞ্জুতির বয়স বাইশ। সে লন্ডনে পড়াশোনা করে। প্রতি বছর পুজোয় ফেরে। জিজ্ঞেস করলাম — কেন?

"লন্ডনে সব পাই। কিন্তু এই গলিটা নেই। পাড়াটা নেই। মহালয়ার সকালে যখন আড়মোড়া ভেঙে উঠে মিষ্টির গন্ধ পাই, পাশের বাড়ি থেকে পুজোর ঢাক শুনি — ওটা আর কোথাও পাব না।"

এই উত্তরে গলির সমস্ত মূল্য আছে।


গলির পাড়ার পুজো — পরিচয়ের উৎসব

৩ — সঙ্গীত: গলির প্রথম গান

বাংলার সঙ্গীত — কীর্তন, ভাটিয়ালি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাউল, আধুনিক — সব ধারাই কোথাও না কোথাও গলির সাথে জড়িত।

গলিতে সন্ধেবেলা হাঁটুন। কোনো না কোনো বাড়ি থেকে গান শুনতে পাবেন। রেওয়াজ হচ্ছে। মেয়েটা তানপুরা লাগিয়ে সাধছে। ছেলেটা তবলায় হাত দিচ্ছে। হারমোনিয়ামে কেউ সুর খুঁজছেন।

এই রেওয়াজের শব্দ গলির দেওয়ালে মিশে যাচ্ছে। পাথরের স্মৃতিতে জমছে। পরের প্রজন্ম হয়তো জানবে না, কিন্তু এই গলি জানবে।

পুরনো কলকাতার গলিতে অসংখ্য সংগীতসমিতি ছিল। প্রতিটা পাড়ায়। তারা নিয়মিত বসে গান করতেন। রবীন্দ্রনাথের গান, শ্যামা সঙ্গীত, ভজন। কোনো স্টেজ নেই, কোনো পারিশ্রমিক নেই — শুধু আনন্দে।

এই সমিতিগুলো এখন কমে এসেছে। টেলিভিশন এসেছে, সঙ্গীতের কম্পিটিশন শো এসেছে। গান এখন পারফরমেন্স — আনন্দ নয়।

কিন্তু কোথাও কোথাও এখনও আছে। কোনো এক গলির দুতলায় সন্ধেবেলা একটা জানলা থেকে ভেসে আসছে "আমার সোনার বাংলা" — সেটা শুনলে বুকে কী লাগে, সেটা বলা যায় না।


৪ — সাহিত্য: গলি থেকে মহাকাব্য

কলকাতার গলিতে অসংখ্য লেখকের জন্ম হয়েছে। শুধু বড় নাম নয় — অনেক ছোট ছোট লেখক, যাদের নাম সবাই জানে না, কিন্তু যারা গলির গল্প লিখে গেছেন।

বাংলা সাহিত্যে শহর — বিশেষত কলকাতার পাড়া ও গলি — একটা স্বতন্ত্র বিষয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন উত্তর কলকাতার মানুষদের কথা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন কফি হাউসের আড্ডা, বোহেমিয়ান জীবন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় গলির গন্ধ আছে।

তারাপদ রায়ের লেখায় কলকাতার ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট স্বপ্নের কথা আছে — এই মানুষগুলো গলির মানুষ। তারা বড় মানুষ নন। বড় ঘটনার নায়ক নন। কিন্তু তাদের জীবনে এত গভীরতা, এত কোমলতা — যা পড়লে মন ভরে যায়।

এই সাহিত্যগুলো বেঁচে আছে। কিন্তু যে গলি থেকে এগুলো জন্মেছিল — সেই গলি কি বেঁচে আছে?

"আড্ডায় যে চিন্তার জন্ম হয়, সে চিন্তা কোনো কনফারেন্স রুমে হয় না।"

পঞ্চম পর্ব সমাপ্ত · গলির গল্প

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →