By Ziya Pub Mar 23 Upd Mar 23

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - প্রথম পর্ব : শহরের আত্মার সন্ধানে

কলকাতার আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে তার সরু অলিগলিতে। এই প্রবন্ধে কলকাতার তিনশো বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অলিগলির বিবর্তনের এক অনন্য কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - প্রথম পর্ব : শহরের আত্মার সন্ধানে

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি

কলকাতার অলিগলির ইতিহাস, মানুষ, সংস্কৃতি ও আত্মার সন্ধানে

ভূমিকা

শহরটা যে পথে শ্বাস নেয়

প্রতিটা বড় শহরের একটা মুখ থাকে। কিন্তু কলকাতার — এই অদ্ভুত, অপূর্ব, মাথা-ঘোরানো শহরটার — হাজার হাজার মুখ আছে, আর তার মধ্যে বেশিরভাগ মুখই বড় রাস্তা থেকে দেখা যায় না।

সারাজীবন কলকাতায় থেকেও মানুষ শুধু তার বাইরের চেহারাটাই চেনে। পার্ক স্ট্রিটের ঝলমলানি, ময়দানের ঘাস, ট্রামের ক্যাঁচকোঁচ, হাওড়া ব্রিজের লোহার শরীর — এইসব দেখে মনে হয় কলকাতাকে চিনে ফেললাম। কিন্তু আসলে চেনা হয়নি। একদমই হয়নি।

কারণ কলকাতাকে সত্যিকার অর্থে চিনতে হলে বড় রাস্তা ছেড়ে বাঁক নিতে হবে। হাঁটা ধীর করতে হবে। দুইপাশ থেকে বাড়িগুলো যখন কাছে সরে আসবে, যখন রাস্তাটা সরু হতে হতে একটা গলির রূপ নেবে — তখন বুঝতে পারবেন কলকাতা আসলে কোথায় থাকে।

গলি। শুধু একটা শব্দ। কিন্তু এই শব্দের ভেতরে গোটা একটা পৃথিবী লুকানো। কলকাতার গলি মানে শুধু দুটো রাস্তার মাঝখানের সরু পথ নয়। কলকাতার গলি মানে একটা জীবন্ত ইতিহাসের বই — যার পাতায় লেখা আছে তিনশো বছরের হাসি, কান্না, প্রেম, রাজনীতি, উৎসব, মৃত্যু, পুনর্জন্ম।

এই রচনাটা সেই গলির গল্প।

কলকাতার অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন এই গলিগুলোর পাশ দিয়ে যায়, কিন্তু ঢোকে না। ঢোকার সময় নেই, অথবা কারণ নেই, অথবা সাহস নেই। কিন্তু যারা ঢোকে — যারা একবার সেই সরু মুখের মধ্যে দিয়ে পা বাড়িয়েছে — তারা জানে যে ওখানে যা আছে, তা বাইরে থেকে আন্দাজ করার উপায় নেই।

এই লেখা তাদের জন্য যারা কলকাতায় থেকেও কলকাতাকে চেনেননি। যারা মনে করেন শহরটাকে চিনে ফেলেছেন, অথবা যারা জানেন যে চেনা হয়নি এবং চিনতে চান। এই লেখা সেই গলিগুলোর হয়ে কথা বলার একটা ছোট্ট চেষ্টা — যারা নিজেরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু যাদের দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা আছে অসংখ্য গল্প।

চলুন। হাঁটা শুরু করি।


কলকাতার গলির মুখ — সন্ধ্যার আলোয়

প্রথম পর্ব

ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে

কলকাতা শহরটা পরিকল্পনা করে তৈরি হয়নি। হয়েছিল এমনভাবে, যেভাবে বড় ব্যাপারগুলো হয় — এলোমেলোভাবে, তাড়াহুড়ো করে, কোনো জ্যামিতির ধার না ধেরে।

১৬৯০ সালে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জব চার্নক হুগলির এই কাদামাটির বাঁকে তার বাণিজ্যঘাঁটি পাতলেন, তখন এখানে তিনটে গ্রাম ছিল — সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কালীকাটা। তিনটে গ্রামেরই নিজস্ব ভেতরের গড়ন ছিল, নিজস্ব পাড়া ছিল, নিজস্ব গলি ছিল। সেই গলিগুলো কোনো ইউরোপীয় নগরপরিকল্পনার ছাঁচে তৈরি ছিল না — ছিল একটা জীবন্ত জীবের শিরা-উপশিরার মতো, যার মধ্যে দিয়ে শহরের রক্ত চলাচল করত।

ব্রিটিশরা তাদের "হোয়াইট টাউন" বানাল দক্ষিণে — সোজা রাস্তা, বড় বাড়ি, ইউরোপীয় কায়দার নগরবিন্যাস। আর সেই কোলাহল থেকে একটু সরে উত্তর কলকাতায় বাঙালি বণিক, জমিদার আর বুদ্ধিজীবীরা তাদের নিজস্ব শহর গড়ে তুললেন। সেই শহরের মেরুদণ্ড ছিল গলি।

শ্যামবাজার, পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো, বাগবাজার — এই এলাকাগুলোতে যে বিশাল বিশাল রাজবাড়ি আর ঠাকুরবাড়ি উঠল, তাদের চারপাশে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল অসংখ্য গলি। প্রতিটা গলি নিজেই একটা সম্পূর্ণ সমাজ। দোকান, মন্দির, পুকুর, কলতলা — সব কিছু নিয়ে একটা ছোট্ট জগৎ।

কিন্তু গলির ইতিহাস শুধু বাড়ির ইতিহাস নয়। মানুষের ইতিহাস।

উনিশ শতকের শেষ দিকে, যখন বাংলার নবজাগরণ তার সর্বোচ্চ শিখরে, তখন সেই জাগরণের আসল কেন্দ্রভূমি ছিল উত্তর কলকাতার গলিগুলো। জোড়াসাঁকোর গলিতে জন্ম নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিৎপুরের গলিতে বাংলা থিয়েটারের পথচলা শুরু। বটতলার গলিতে ছাপা হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম পপুলার বই। কুমোরটুলির গলিতে হাজার হাজার মাটির দেবী জন্ম নিয়েছিলেন প্রতি বছর।

এই গলিগুলো শুধু পথ ছিল না। এই গলিগুলো ছিল একটা সভ্যতার কারখানা।

বিপ্লবের ইতিহাসও আছে এই গলিতে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা হয়েছে কলকাতার নানা গলির পিছনের ঘরে। স্বদেশী আন্দোলনের গোপন বৈঠক বসেছে গলির মুদির দোকানের আড়ালে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিপ্লবীরা পালিয়েছে এক গলি থেকে আরেক গলিতে — এই শহরের অলিগলি তাদের আশ্রয় দিয়েছে, লুকিয়ে রেখেছে।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ কলকাতার গলির চেহারা আমূল বদলে দিল। পূর্ববঙ্গ থেকে লাখো মানুষ এসে ঢুকলেন এই শহরে — কেউ শিয়ালদহ ইস্টেশনে নেমে গলির মধ্যে বস্তি বানালেন, কেউ উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়িগুলোয় জায়গা নিলেন। তাদের সাথে এল নতুন রান্না, নতুন উচ্চারণ, নতুন উৎসব, নতুন গান। গলির সংস্কৃতি হয়ে উঠল আরও জটিল, আরও বৈচিত্র্যময়।

পঞ্চাশ-ষাটের দশক ছিল কলকাতার গলির সোনালি যুগ। সেই সময়ের গলিতে যে জীবন ছিল — সেই আড্ডা, সেই পাড়ার পুজো, সেই গলির মাঠে ক্রিকেট, সেই সন্ধেবেলার রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেওয়াজ — তা আর কোনোদিন ফিরবে না হয়তো।

কিন্তু গলি আছে। এখনও আছে।

ভেঙে পড়ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে — তবু আছে। আর সেই থাকার মধ্যে কোথাও গেঁথে আছে তিনশো বছরের স্মৃতি। শুধু শুনতে পারলেই হয়।

১ — সুতানুটি থেকে মহানগর

১৬৯০ সালের আগে এই জায়গাটা কী ছিল, সেটা কল্পনা করতে গেলে একটু মাথা খাটাতে হয়। হুগলি নদীর পূর্ব পাড়ে বনজঙ্গলে ঢাকা একটা জলাভূমি। কিছু কিছু জায়গায় মানুষের বসবাস। ছোট ছোট পথ, কাঁচা মাটির রাস্তা, ঝোপের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সরু সরু পথ।

সেই পথগুলোই পরে হয়ে উঠল কলকাতার গলি।

প্রথম দিকের গলিগুলো তৈরি হয়েছিল প্রয়োজনে। কোথায় মানুষ থাকবে, কোথায় বাজার বসবে, কোথায় মন্দির হবে, কোথায় জল পাওয়া যাবে — এইসব প্রয়োজনের ভেতর দিয়ে জন্ম নিয়েছিল গলিগুলো। কোনো মাস্টার প্ল্যান নেই। কোনো পুরসভার নির্দেশ নেই। শুধু মানুষের চলাফেরার দাগ।

সুতানুটিতে সুতোর ব্যবসা হত — তাই সেখানকার গলিগুলো বাণিজ্যিক, সরগরম। কালীকাটায় কালী মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ধর্মীয় গলি — পুরোহিত পাড়া, ফুলের দোকান, প্রসাদের হাট।

ব্রিটিশ আসার পর এই গলিগুলোর চরিত্র বদলাতে লাগল। ব্রিটিশ কোম্পানির সাথে ব্যবসা করে যে বাঙালি বণিক আর দালালরা ধনী হলেন, তারা বিশাল বিশাল বাড়ি বানালেন উত্তর কলকাতায়। সেই বাড়িগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠল পরিচারক পাড়া, কারিগর পাড়া, দোকান পাড়া। আর এই সবকিছুকে জুড়ে দিল গলির জাল।

২ — রাজবাড়ির গলি

উত্তর কলকাতার বড় বড় পরিবারগুলোর বাড়িকে ঘিরে যে গলি — সেই গলির একটা আলাদা ধরনের সৌন্দর্য আছে। সেটা বৈভবের সৌন্দর্য নয়। সেটা ক্ষয়ের সৌন্দর্য।

পাথুরিয়াঘাটার একটা গলিতে ঢুকলে আপনি দেখবেন — দুইপাশে তিনতলা, চারতলা বাড়ি। দেওয়ালের রং উঠে গেছে, তার নিচে আরেকটা রং, তার নিচে আরেকটা। হলুদের নিচে লাল, লালের নিচে সবুজ। প্রতিটা রঙের স্তর একটা দশক। এই দেওয়ালগুলো দেখলে মনে হয় সময়কে চোখে দেখা যাচ্ছে।

বাড়িগুলোর লোহার গেট — কারুকাজ করা, মরিচা ধরা। কলকাতার কারিগররা উনিশ শতকে যে লোহার কাজ করেছিলেন, তার নমুনা এখনও দেখা যায় এই গেটগুলোতে। একটু থেমে দেখুন — ফুলের নকশা, পাখির আকৃতি, সিংহের মাথা। এগুলো শুধু গেট নয়, শিল্পকর্ম।

সেই বাড়িগুলোতে এখন কে থাকে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, আসল পরিবারের কেউ কেউ — হয়তো একটা পরিবার যেখানে ছিল চল্লিশটা ঘর, এখন তারা থাকে দুটো ঘরে। বাকি ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া। ভাড়াটেরা এসেছিলেন হয়তো পঞ্চাশের দশকে, এখন তাদের তৃতীয় প্রজন্ম থাকছে। মাসিক ভাড়া তিনশো টাকা — সত্তর বছর আগে যা ঠিক হয়েছিল, তার থেকে এক পয়সাও বাড়েনি।


পাথুরিয়াঘাটার রাজবাড়ির ভেতরের উঠোন

এই বাড়িগুলোর উঠোনে দাঁড়ালে মাথার উপর একটুকরো আকাশ দেখা যায়। চারপাশে তিনতলা দেওয়াল। কোথাও একটা তুলসীতলা, কোথাও পুরনো একটা কলতলা যেটা হয়তো আর ব্যবহার হয় না। পায়রারা বাসা বেঁধেছে কার্নিশে। বর্ষার জল জমে সেখানে সবুজ শ্যাওলা।

এই উঠোনগুলো একদিন কীসের সাক্ষী ছিল জানেন? বিয়ের গান, যজ্ঞের ধোঁয়া, সংগীতের রেওয়াজ, রাজনৈতিক বিতর্ক, পূজার আলো, মৃত্যুর কান্না। সুখ আর দুঃখের এত স্তর জমে গেছে এই পাথরে, এই ইটে, এই মাটিতে — যে কখনও কখনও মনে হয় দেওয়ালগুলো একটু শুনলেই কথা বলবে।

৩ — ভাগ্যের রেখা বদলানো সন্ধি

১৯৪৭ — এই সালটা কলকাতার গলির ইতিহাসে একটা কালো দাগ। দেশভাগ। বাংলা দুইটুকরো হয়ে গেল। পূর্ববঙ্গ হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান।

লাখো মানুষ পথে নামলেন। ছেড়ে আসলেন চিরচেনা গ্রাম, চিরচেনা নদী, চিরচেনা আকাশ। পৌঁছালেন কলকাতায় — অচেনা শহর, অচেনা গলি।

শিয়ালদহ স্টেশনের আশেপাশের গলিগুলো হয়ে উঠল মানুষের ঢল। মানকতলার গলি, নারকেলডাঙার গলি, বেলেঘাটার গলি — সব ভরে গেল উদ্বাস্তু মানুষে। যেখানে একটা পরিবার থাকত, সেখানে পাঁচটা পরিবার।

কিন্তু এই মানুষগুলো শুধু ভার নিয়ে আসেননি — সাথে এনেছিলেন নিজেদের সংস্কৃতি। পূর্ববঙ্গের রান্না, পূর্ববঙ্গের উৎসব, পূর্ববঙ্গের ঘরানার গান — সব এসে মিশে গেল কলকাতার গলির রক্তে।

ঢাকাই রান্নার গন্ধ মিশে গেল কলকাতার মাছের তরকারির গন্ধে। বরিশালের ভাটিয়ালির সুর মিশে গেল কলকাতার কীর্তনের সুরে। বাউলের একতারা বাজতে লাগল উত্তর কলকাতার গলিতে।

এই মিশ্রণটা কলকাতার গলিকে যা করল — সেটা অসাধারণ। একটা নতুন কলকাতা তৈরি হল। আগের কলকাতার থেকে আলাদা, কিন্তু আরও সমৃদ্ধ।

আজও যখন কোনো পুরনো উদ্বাস্তু পরিবারের বাড়িতে যাই, দেখি সেই পূর্ববঙ্গের ছাপ কতটা গভীরভাবে গলির গায়ে লেগে আছে। উঠোনে তুলসী গাছ, দাওয়ায় আলপনা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সরষে বাটার গন্ধ — সব মিলিয়ে একটা সংস্কৃতি যেটা আর শুধু পূর্ববঙ্গের নয়, আর শুধু পশ্চিমবঙ্গেরও নয় — এটা কলকাতার।

প্রথম পর্ব সমাপ্ত · গলির গল্প

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →