By Ziya Pub Mar 23 Upd Mar 23

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - চতুর্থ পর্ব : দোকানদার থেকে পাড়ার দাদা

কলকাতার গলির প্রাণ লুকিয়ে থাকে তার মানুষের মধ্যে। দোকানদার, জানলার ঠাকুমা আর পাড়ার দাদার গল্পের মাধ্যমে উঠে এসেছে এক হারানো বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কথা।

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - চতুর্থ পর্ব  : দোকানদার থেকে পাড়ার দাদা

চতুর্থ পর্ব · গলির গল্প

গলির মানুষ - দোকানদার থেকে পাড়ার দাদা

একটা গলি বোঝা মানে তার বাড়িগুলো বোঝা নয়। গলি বোঝা মানে সেখানকার মানুষগুলোকে বোঝা।

কলকাতার প্রতিটা গলিতে কিছু চরিত্র থাকে — যাদের ছাড়া গলি সম্পূর্ণ হয় না। এই চরিত্রগুলো বংশপরম্পরায় আসে। বাবার জায়গায় ছেলে, ছেলের জায়গায় নাতি। পোশাক পাল্টে, নাম পাল্টে — কিন্তু ভূমিকা একই থাকে।

১ — দোকানদার: গলির নাড়ি-বৈদ্য

গলির মুখে একটা দোকান থাকে। এতটাই ছোট যে দোকানদার ভেতরে দাঁড়ালে আর ক্রেতা ঢোকার জায়গা নেই। জানালার মতো একটা ফাঁকের ওপার থেকে দোকানদার আপনাকে জিনিস দেন।

এই দোকানদার হলেন গলির নাড়ি-বৈদ্য। তার কাছে গলির সব খবর।

কে আজ কাঁদছে। কার ছেলে চাকরি পেয়েছে। কার মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। কার বাবার শরীর ভালো নেই। কার বাড়িতে ঝগড়া হয়েছে।

এই দোকানদার ক্রেডিট দেন — জিজ্ঞেস না করেই। মাস শেষে পাওনা না মিটলে বলেন না। কারণ তিনি জানেন পরের মাসে মিটবে। কারণ তিনি জানেন এই পরিবার সম্পর্কে — তাদের ইতিহাস, তাদের চরিত্র, তাদের বিশ্বস্ততা।

এই বিশ্বাসটা একটা অ্যাপ দিয়ে তৈরি হয় না। তিরিশ বছরের পরিচয় দিয়ে তৈরি হয়।

কলকাতার পুরনো গলির দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিগ বাজার এসেছে, অ্যামাজন এসেছে। দোকানদারের ছেলে অন্য কাজ করতে চায়।

কিন্তু যেদিন শেষ গলির দোকান বন্ধ হবে, সেদিন শুধু একটা দোকান বন্ধ হবে না — একটা সম্পর্কের ব্যবস্থা বন্ধ হবে। একটা বিশ্বাসের অর্থনীতি শেষ হবে।


গলির মুদিখানা — বিশ্বাসের দোকান

২ — জানলার ঠাকুমা: গলির ইতিহাসবিদ

প্রতিটা গলিতে একজন বা দুইজন বৃদ্ধা আছেন, যারা জানলার ধারে বসে থাকেন। সকাল থেকে সন্ধে।

প্রথম দেখায় মনে হবে তারা শুধু সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু আসলে তারা গলির ইতিহাস সংরক্ষণ করছেন।

এই ঠাকুমারা দেখেছেন গলিটা কীভাবে পাল্টেছে। কোন বাড়িটা ভেঙে নতুন হয়েছে। কোন পরিবার চলে গেছে। কোন পরিবার এসেছে। কোন মেয়ের বিয়ে হয়েছে কোন ছেলের সাথে। কোন শিশু বড় হয়ে ডাক্তার হয়েছে। কোন ছেলে পথ হারিয়েছে।

গলির ঠাকুমার কাছে গিয়ে বসুন। চা বানিয়ে দিন। তারপর জিজ্ঞেস করুন — "এই গলি আগে কেমন ছিল?"
তারপর শুধু শুনুন।
যা শুনবেন, তা কোনো বইয়ে লেখা নেই।


৩ — পাড়ার দাদা: গলির রাজনীতিবিদ

প্রতিটা গলিতে একজন "পাড়ার দাদা" থাকেন। তিনি কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। কোনো পদ নেই। কিন্তু গলির সবাই তার কথায় চলে।

কারো বাড়িতে সমস্যা হলে তার কাছে যায়। কারো বিবাদ মেটাতে হলে তার কাছে যায়। পাড়ার পুজো কমিটিতে তার মত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এই পাড়ার দাদা হয়তো কলেজে পড়েননি। হয়তো বড় চাকরি করেন না। কিন্তু তার কাছে গলির সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা আছে — বিশ্বাস।

এই বিশ্বাস অর্জন করতে দশ বছর লাগে। বিশ বছর লাগে। এটা বিনামূল্যে পাওয়া যায় না।

আধুনিক কলকাতায় এই চরিত্রটা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পাড়ার দাদার জায়গায় এসেছে দলীয় রাজনীতির ক্যাডার। সেই কাডার বিশ্বাস অর্জন করে ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নয়।

পার্থক্যটা ছোট মনে হলেও — আসলে পার্থক্যটা বিশাল।


৪ — গলির শিশু: উত্তরাধিকারের প্রশ্ন

গলির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটাই প্রশ্নের উত্তরে — গলিতে বড় হওয়া বাচ্চারা কি মনে করে গলিটা তাদের?

গলিতে বড় হওয়া শিশুর একটা বিশেষ সুবিধা আছে। তারা পঞ্চাশজন প্রতিবেশী চেনে নাম ধরে। তারা জানে প্রতিটা দোকানদারের গল্প। তারা জানে গলির কোথায় সন্ধেবেলা আলো থাকে না। তারা জানে কোন ঠাকুমা একা থাকেন আর কার একটু সাহায্য দরকার।

এই জানাটা — মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকার এই অনুভূতি — এটা কোনো স্কুলে শেখানো যায় না। এটা শুধু গলি শেখাতে পারে।

গলির বাচ্চারা রাবার বল দিয়ে ক্রিকেট খেলে — দেওয়ালে চক দিয়ে উইকেট এঁকে। সেই খেলায় কোনো মাঠ নেই, কোনো রেফারি নেই — শুধু নিজেদের মধ্যে সমঝোতা। এই সমঝোতার শিক্ষাটা পরে বড় হয়ে কাজে আসে — অফিসে, পরিবারে, সমাজে।


গলির ক্রিকেট — সমঝোতার প্রথম পাঠ

৫ — ফেরিওয়ালা: গলির সকাল আনে যে

কলকাতার গলির সকাল হাঁকে ফেরিওয়ালার ডাক।

"আলু-আছে! আলু!"

"মাছ-মাছ-মাছ! তাজা ইলিশ!"

"সব্জিওয়ালা! পালং, বেগুন, টম্যাটো!"

প্রতিটা ফেরিওয়ালার নিজস্ব সুর আছে। নিজস্ব ছন্দ। নিজস্ব গলার স্বর। এই স্বরগুলো চেনা — গলির মানুষ ঘুমের মধ্যেও বুঝতে পারেন কে আসছে।

মাছওয়ালা রহিম ভাই। তিরিশ বছর ধরে একই গলিতে আসেন। এখানকার বাড়িগুলোর কোন বাড়িতে কোন মাছ পছন্দ, সব মুখস্থ। শান্তিদির বাড়িতে ছোট ইলিশ লাগবে। মিত্র বাবুর বাড়িতে পাবদা ছাড়া চলে না। ডাক্তারবাবুর বউ চিংড়ি ছাড়া রান্না করেন না।

এই মনে রাখার ক্ষমতাটা কোনো CRM সফটওয়ার নয়। এটা তিরিশ বছরের ভালোবাসা।

চতুর্থ পর্ব সমাপ্ত · গলির গল্প

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →