কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - তৃতীয় পর্ব :কুমোরটুলি থেকে জোড়াসাঁকো
কলকাতার ঐতিহাসিক গলির গল্পে ফিরে দেখা কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের নিপুণ কারুকাজ এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির স্মৃতি। শহরের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য যাত্রার বর্ণনা এই নিবন্ধে।
তৃতীয় পর্ব · গলির গল্প
পাঁচটি গলি, পাঁচটি জীবন
✦
এবার চলুন হাঁটি। সত্যিকারের হাঁটা। নির্দিষ্ট কিছু গলিতে ঢুকি, তাদের গল্প শুনি।
১ — কুমোরটুলির গলি: যেখানে দেবীর জন্ম হয়
শ্যামবাজারের কাছে একটা মহল্লা আছে — কুমোরটুলি। সেখানে ঢুকলে মনে হয় সময় একটু উলটো দিকে চলছে।
গলিটা সরু। দুইপাশে লম্বা লম্বা আধা-খোলা কারখানার মতো ঘর। ঘরের ভেতরে মাটির গন্ধ। আর সেই মাটির গন্ধের মধ্যে ধীরে ধীরে আকার পায় দেবী দুর্গা।
হ্যাঁ, এটাই কুমোরটুলি। কলকাতার দুর্গামূর্তি তৈরি হয় এখানে। তিনশো বছর ধরে।
একটু থামুন। এই তথ্যটার গভীরতা অনুভব করুন। তিনশো বছর। একই মাটি, একই হাত, একই গলি। প্রতিটা পুজোয় যে দুর্গা আপনার পাড়ার মণ্ডপে আসেন, তিনি এই গলি থেকে যাত্রা শুরু করেন।
কুমোরটুলির কারিগররা — কুমোররা — প্রায় সবাই এক পরিবার থেকে এসেছেন। বাবা শেখান ছেলেকে, ছেলে শেখাবে তার ছেলেকে। দেবীর মুখ গড়ার শিল্প একটা গোপন বিদ্যা, যা রক্তের মধ্যে দিয়ে বহে।
মাঘ মাস থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। প্রথমে আসে খড়ের কাঠামো। তারপর মাটি লাগানো। তারপর সেই বিখ্যাত নীলচে-সবুজ মাটির প্রলেপ — এই রঙের মাটি শুধু গঙ্গার কাছ থেকে আসে। তারপর ধীরে ধীরে আকার নেয় শরীর, হাত, মুখ।
মুখের কাজ করেন সবচেয়ে দক্ষ কারিগর। দেবীর চোখের আকৃতি, ভ্রুর বাঁক, ঠোঁটের কোণ — এগুলো ঠিক করা শুধু হাতের দক্ষতার ব্যাপার নয়, এটা একটা আধ্যাত্মিক সাধনা। কারিগর বলেন, মা যখন চোখ খোলেন, তখন মূর্তিটা আর মাটির থাকে না।

কুমোরটুলির গলি — আধসম্পূর্ণ দেবীদের সারি
কুমোরটুলির গলিতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গেলে অবাক হয়ে যাবেন। গলিজুড়ে সারি সারি আধসম্পূর্ণ মূর্তি। মাথা ছাড়া শরীর। হাত ছাড়া কাণ্ড। শুধু একটা মাথা, হাত ছাড়া। এই অসম্পূর্ণ দেবীরা গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন — এটা এমন একটা দৃশ্য যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল — এই মূর্তিগুলো তৈরি হচ্ছে জানা বুঝেই যে পাঁচদিন পরে এগুলো গঙ্গায় বিসর্জন হবে। এই ক্ষণস্থায়িত্ব জেনেও এত নিখুঁত কারুকাজ — এটাই কুমোরটুলির দর্শন। এটাই কলকাতার দর্শন।
গলির এক কোণে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব হারাধন পাল। তার হাত দিয়ে অসংখ্য দেবী তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন করলাম — মা, প্রতিবার বিসর্জনের সময় কেমন লাগে?
বৃদ্ধ হাসলেন। বললেন, "কাঁদি মাঝে মাঝে। তবে জানি তো — মা আবার আসবেন। পরের বছর।"
এই উত্তরে গোটা কলকাতার আত্মা আছে।
২ — জোড়াসাঁকোর গলি: কবির পাড়া
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির কাছে একটা গলি আছে। এই গলিতে ঢুকলে আপনি সরাসরি একশো বছর পিছিয়ে যাবেন।
ঠাকুরবাড়ি — অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারিবারিক বাড়ি — এখন একটা মিউজিয়াম। কিন্তু সেই মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে যে গলি চলে গেছে, সেটা তখনও যেন মিউজিয়াম হয়নি। সেখানে এখনও মানুষ থাকে। জীবন চলে।
রবীন্দ্রনাথ এই গলিতে বড় হয়েছেন। ছোটবেলায় তিনি এই গলির ইটে-পাথরে হাত বুলিয়েছেন। উঠোনে খেলেছেন। বাড়ির ছাদ থেকে গলির মানুষদের দেখেছেন। এই দেখাটা তার লেখায় বারবার ফিরে আসে।
তার আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন জোড়াসাঁকোর সেই শৈশবের কথা — আবদ্ধ উঠোন, পুরনো বাড়ির গন্ধ, বড়দের আলাপ-আলোচনা, সন্ধেবেলার রেওয়াজ। এই সবকিছু তার মানসগঠনে যে ভূমিকা রেখেছিল, সেটা অসাধারণ।
জোড়াসাঁকোর গলিতে এখনও কিছু পুরনো পরিবার থাকেন। তাদের সাথে কথা বললে আপনি পাবেন স্মৃতির এক অফুরান ভাণ্ডার। কেউ বলবেন তার ঠাকুরদা কবিকে দেখেছিলেন। কেউ বলবেন তাদের বাড়িতে একসময় রবীন্দ্রনাথের গান রেওয়াজ হত নিয়মিত।
এই গল্পগুলো সত্যি কিনা জানার উপায় নেই। কিন্তু এই গল্পগুলো বলা হচ্ছে — এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই গল্পগুলো বলার মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজেকে ইতিহাসের অংশ করে রাখছেন। গলি তাদের সেই সুযোগ দিচ্ছে।
৩ — তিরেত্তি বাজারের গলি: চিনা কলকাতার শেষ ছায়া
কলকাতার একটা গল্প আছে যেটা প্রায় কেউ জানেন না।
উনিশ শতকে, এই শহরে একটা বড় চিনা সম্প্রদায় বাস করতেন। ব্যবসা করতেন, জীবন গড়তেন। তাদের ঘরবাড়ি ছিল তিরেত্তি বাজার এলাকায়। সেই এলাকার গলিগুলো আজও আছে।
কিন্তু সেই মানুষগুলো আর নেই।
রবিবার ভোর পাঁচটায় তিরেত্তি বাজারের গলিতে যান। সেখানে একটা বৌদ্ধ মন্দির আছে। তার পাশে একটা ছোট্ট বেকারি। সেই বেকারিতে ১৯৩০-এর দশক থেকে ডিম দিয়ে তৈরি পেস্ট্রি আর হাতে টানা নুডলস বিক্রি হচ্ছে।
দোকানটা চালান একজন বয়স্ক মহিলা। তার নাম লি হুয়া। বাংলায় কথা বলেন — কিন্তু কথার মধ্যে মাঝে মাঝে হাক্কা ভাষার শব্দ আসে। এই মিশ্রণটাই তিরেত্তি বাজারের গলির পরিচয়।
লি হুয়ার পরিবার এই শহরে এসেছিল আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে। তার পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি একা থেকে গেছেন।
প্রশ্ন করলাম — চলে যাননি কেন?
চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, "এই গলিটা আমার। এটা ছাড়া আমি কোথায় যাব?"
এই উত্তরে একটা পুরো সভ্যতার মৃত্যু আর জীবনীশক্তি একসাথে আছে।
৪ — বাগবাজারের গলি: ভক্তির রাস্তা
বাগবাজার মানে রামকৃষ্ণের কলকাতা।
রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ, সারদামণি — এই নামগুলো বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম। আর এই মানুষগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে বাগবাজারের গলি।
বাগবাজারের গলিতে হাঁটলে একটা অদ্ভুত শান্তি পাবেন। এটা গলির শান্তি নয় — এটা অন্য কিছু। কোথাও একটা কীর্তনের সুর ভেসে আসছে। কোথাও ধূপের গন্ধ। কোথাও একটা মন্দিরের ঘণ্টা।
এই গলিতে বিবেকানন্দ হেঁটেছেন। তরুণ বয়সে, যখন তিনি নরেন্দ্রনাথ — প্রশ্নে ভরা মন, খোঁজে ভরা হৃদয় — এই গলির পাথরে তার পায়ের ছাপ পড়েছে।
সেই ছাপ আর দেখা যায় না। কিন্তু গলিটা মনে রেখেছে।
৫ — চিৎপুরের গলি: নাটকের ঘর
চিৎপুর রোড। এই রাস্তাটার পাশের গলিগুলো না দেখলে বাংলার থিয়েটারের ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না।
বাংলা পেশাদার থিয়েটারের জন্ম হয়েছিল এই এলাকায়। উনিশ শতকের শেষ দিকে, যখন বাংলা রঙ্গমঞ্চ তার সোনালি যুগে — এই চিৎপুরের গলিগুলোতে প্রমথনাথ রায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অমৃতলাল বসুরা ঘুরতেন, আলাপ করতেন, নাটকের পরিকল্পনা করতেন।
একটা পুরনো গলিতে এখনও একটা মহড়ার ঘর আছে। সেই ঘরে রিহার্সাল হয়। ঘরটা ছোট — একটা বড় শোবার ঘরের মতো। কিন্তু সেই ঘর থেকে যত নাটক বেরিয়েছে, যত অভিনেতা তৈরি হয়েছে, যত দর্শক হাসেছে-কেঁদেছে — সেটা হিসাব করা যাবে না।
সেই মহড়ার ঘরের বাইরে রাস্তায় ঝালমুড়ির ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। বিক্রেতার নাম শ্যামল। সে বলল, "এই ঘরটার পাশে আমি তিরিশ বছর ধরে ঝালমুড়ি বেচছি। রিহার্সাল শেষে সবাই আমার কাছে আসেন।"
শিল্পী আর রাস্তার ফেরিওয়ালা — দুটো আলাদা জগৎ। কিন্তু গলি তাদের এক জায়গায় এনে দেয়। এটাই গলির গণতন্ত্র।

চিৎপুরের মহড়াঘর — শিল্প আর সাধারণ জীবনের মিলনস্থল
✦
"কলকাতার গলি মানে শুধু পথ নয় — তা একটা সভ্যতার রক্তনালী।"
✦
তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত · গলির গল্প
