By Ziya Pub Mar 23 Upd Mar 23

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - দ্বিতীয় পর্ব :ইন্দ্রিয়ের উৎসব

কলকাতার গলির প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে হাজারো শব্দ আর গন্ধ। ভোরের শাঁখের আওয়াজ থেকে দুপুরের রান্নার সুবাস—এই নিবন্ধে ধরা পড়েছে তিলোত্তমার গলির এক মায়াবী রূপ।

কলকাতার অলিগলির অজানা ইতিহাস ও সংস্কৃতি - দ্বিতীয় পর্ব  :ইন্দ্রিয়ের উৎসব

দ্বিতীয় পর্ব · গলির গল্প

ইন্দ্রিয়ের উৎসব

গলিতে পা দেওয়ার আগে একটু থামুন।

চোখ বন্ধ করুন।

শুনুন।

একটা গলির শব্দ কখনো একটা নয়। সে শব্দের স্তর আছে — যেমন পুরনো মাটিতে মাটির স্তর থাকে। একেবারে নিচে আছে শহরের হাম — দূরের ট্রাফিক, দূরের ট্রেন, দূরের নির্মাণকাজের ঠকঠক। তার উপরে পাড়ার শব্দ — কারো বাড়ি থেকে টেলিভিশনের আওয়াজ, কারো বাড়ি থেকে রান্নার শব্দ। তার উপরে গলির নিজের শব্দ — কারো পায়ের আওয়াজ, কারো গলার আওয়াজ, কোথাও একটা বাচ্চার হাসি।

এবার চোখ খুলুন।

যা দেখলেন — সেটা বলুন।

দুইপাশে বাড়ি। কিন্তু বাড়িগুলো শুধু বাড়ি নয়। তাদের গায়ে লতানো গাছ, তাদের ব্যালকনিতে লাল শাড়ি মেলা, তাদের জানলা দিয়ে একটু আলো বেরিয়ে আসছে। উপরের দিকে তাকান — দুইপাশের বাড়ির মাথা প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে মনে হয়। তার মধ্যে দিয়ে একটুকরো আকাশ। সেই আকাশে কোথাও একটা ঘুড়ি।


গলির উপরে একটুকরো আকাশ

১ — সকালের গলি

কলকাতার গলি সবচেয়ে সুন্দর হয় ভোরবেলা। শুনেছেন? ভোর পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটায় গলির মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি থাকে।

এই শান্তিটা রাতের শান্তি থেকে আলাদা। রাতের শান্তি হল অন্ধকার। ভোরের শান্তি হল আলোর অপেক্ষা।

ভোরবেলা গলিতে প্রথম আওয়াজ আসে মন্দির থেকে। শাঁখের শব্দ। তারপর ঘণ্টার শব্দ। কেউ পুজো দিচ্ছেন। সেই পুজোর ধূপের গন্ধ গলির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে — কখনও ভুরভুরে চন্দন, কখনও ঝাঁঝালো ধূপকাঠি।

তারপর আসে জলের শব্দ। কলতলায় জল পড়ার শব্দ। কেউ বাসন মাজছেন, কেউ স্নান করছেন। এই জলের শব্দের একটা ছন্দ আছে — কলকাতার গলির নিজস্ব ছন্দ, যেটা শহরের কোনো বড় রাস্তায় পাওয়া যায় না।

আস্তে আস্তে গলি জাগে। কারো লোহার গেট খোলার ক্যাঁচ শব্দ। খবরের কাগজ ছুঁড়ে দেওয়ার ধপ শব্দ। প্রথম হকারের ডাক — "আলু-আছে! আলু!" কিংবা "মাছ নেবেন মাছ, তাজা ইলিশ!" এই ডাকগুলো গলির শিলালিপি — প্রতি সকালে নতুন করে লেখা হয়।

ভোরের গলিতে চায়ের দোকান খোলে। চুলা জ্বলে। চা বসানো হয়। তার গন্ধ — এলাচ, আদা, দুধ সহ চায়ের সেই বিশেষ গন্ধ — পুরো গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। এটাই গলির প্রথম সুগন্ধ। এটাই জাগার সঙ্কেত।

২ — দুপুরের গলি

দুপুরবেলা গলি একটু চুপ হয়ে যায়। গরমে এবং ক্লান্তিতে শহর একটু শ্বাস নেয়।

কিন্তু চুপ মানেই নিঃশব্দ নয়।

দুপুরের গলিতে রান্নার গন্ধ সবচেয়ে তীব্র। কোথাও পোস্ত বাটা দিয়ে আলু ভাজা হচ্ছে, কোথাও ইলিশ মাছ সরষে দিয়ে। কোথাও মুরগির ঝোল টগবগ করছে। কোথাও ডাল ফোড়নের ঘ্রাণ। এই গন্ধগুলো আলাদা আলাদা থাকে না — মিলেমিশে একটা সামগ্রিক গন্ধ তৈরি হয় যেটা কলকাতার বাইরে কোথাও পাওয়া যায় না।

দুপুরে বাচ্চারা থাকে না বাইরে। স্কুল গেছে, অথবা ঘুমাচ্ছে। বড়রাও ঘরে। গলি খালি খালি লাগে।

কিন্তু গলির কোনো এক কোণে — উঁচু জানলার পাশে — একজন বৃদ্ধা বসে আছেন। তিনি দেখছেন। বহুকাল ধরে দেখছেন। তার চোখে গলির পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস।


দুপুরের জানলা — গলির নীরব সাক্ষী

৩ — সন্ধেবেলার গলি

গলি সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয় সন্ধেবেলায়।

সন্ধে ছটার পর থেকে গলিতে একটা নতুন জীবন শুরু হয়। অফিস থেকে ফেরা মানুষ, স্কুল থেকে ফেরা বাচ্চা, বাজার করে ফেরা গৃহিণী — সবাই ফিরে আসেন গলিতে। তখন গলি হয়ে ওঠে একটা বড় পারিবারিক মিলনক্ষেত্র।

চায়ের দোকানে আড্ডা বসে। পাড়ার দাদারা জড়ো হয়। রাজনীতি থেকে ক্রিকেট, সিনেমা থেকে পাড়ার কলহ — সব বিষয়ে মত বিনিময় হয়। এই আড্ডাটাই বাংলার সবচেয়ে পুরনো গণতন্ত্র।

সন্ধেবেলায় মন্দিরে আলো জ্বলে। সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজে। প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ নেন। কে আজ রান্না করেননি, তার জন্য পাশের বাড়ি থেকে খাবার আসে। কার বাচ্চা জ্বরে পড়েছে, পাড়ার সবাই উদ্বিগ্ন।

এই যে পরস্পরের খোঁজ রাখার সংস্কৃতি — এটাই গলির সবচেয়ে বড় সম্পদ। এটা কোনো ফ্ল্যাটবাড়িতে পাওয়া যায় না। কোনো গেটেড কমিউনিটিতে পাওয়া যায় না। এটা শুধু পাওয়া যায় গলিতে।

৪ — রাতের গলি

রাত বাড়লে গলি একটু একটু করে ঘুমোয়।

প্রথমে বন্ধ হয় চায়ের দোকান। তারপর মুদির দোকান। একে একে জানলার আলো নেভে। গলি শান্ত হয়ে আসে।

কিন্তু পুরোপুরি ঘুমায় না।

রাত বারোটার পরেও কোথাও একটা টিউশনি হচ্ছে। কোথাও কেউ রাত জেগে পড়ছেন। কোথাও নবজাতক শিশু কাঁদছে। কোথাও দুটো মানুষ ফিসফিস করে কথা বলছেন।

রাতের গলির নিস্তব্ধতার মধ্যে এই শব্দগুলো আশ্চর্য স্পষ্ট শোনা যায়। দিনের কোলাহল সরে গেলে গলির আসল শ্বাস শোনা যায়।

কখনো মাঝরাতে একা গলিতে হেঁটেছেন? যদি না হেঁটে থাকেন, তাহলে একবার হাঁটুন। দেওয়ালে হাত রাখুন। সেই পাথর ঠান্ডা হয়ে আছে। তার মধ্যে দিনের গরম লুকিয়ে আছে। রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে মনে হবে দেওয়ালটা শ্বাস নিচ্ছে।


মাঝরাতের গলি — শ্বাস নেওয়া পাথর

এটাই গলির সত্যিকারের পরিচয়। এটাই তার আসল রহস্য।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত · গলির গল্প

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →