বারাসাতের নীল আকাশ - অষ্টম পর্ব : তিতলির বাবার আগমন ও অর্ণবের নতুন গল্প
বারাসাতের নীল আকাশ সিরিজের অষ্টম পর্বে অর্ণব তার নতুন গল্প লেখা শুরু করে। এদিকে তিতলির বাবার হঠাৎ আগমনে তাদের সম্পর্কের এক নতুন মোড় তৈরি হয়।
Bengali Serial Fiction ✦ অষ্টম পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"বাবার সামনে"
বসন্ত এলে বারাসাতের বাতাস বদলে যায়।
শীতের সেই জড়ানো ভাব কেটে যায়। বাতাসে একটা উষ্ণতা আসে — কিন্তু গরমের দাহ নয়, এটা অন্যরকম। যেন পৃথিবীটা সবে ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙছে।
রাস্তার ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল ফুল ফুটতে শুরু করেছে।
পুরনো বাড়ির উঠোনে বেলি ফুলের গন্ধ ভাসছে সকালে।
স্কুলের মাঠে বাচ্চারা টিফিনের ছুটিতে দৌড়াচ্ছে।
বারাসাত জেগে উঠছে।
অর্ণব জেগে উঠছে। অন্যভাবে।
গত কয়েক সপ্তাহে একটা কাজ করছে সে — যেটা এতদিন করত না। রাতে ঘুমের আগে ডায়েরি খোলে। লেখে।
প্রথম প্রথম ছিল দু-একটা লাইন। তারপর একটু বেশি। তারপর এক রাতে দেখল — চার পাতা হয়ে গেছে।
সেটা পড়ল।
গল্পের মতো।
একটা মানুষের গল্প — যে বারাসাতের স্টেশনে বসে চা খাচ্ছে, আর হঠাৎ তার পাশে কেউ এসে বসে হলুদ মলাটের বই পড়তে শুরু করে।
গল্পটা শেষ হয়নি। কিন্তু শুরুটা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে তিতলির সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল।
তিতলি"কী করছিলে?" অর্ণব"লিখছিলাম।"
একটু চুপ।
তিতলি"সত্যি?" অর্ণব"হ্যাঁ।"
তিতলি"কী লিখছিলে?" অর্ণব"একটা গল্প।"
তিতলি"কীসের গল্প?" অর্ণব"পরে বলব।"
তিতলি"পরে মানে?" অর্ণব"মানে, যখন একটু সম্পূর্ণ হবে। এখন অসম্পূর্ণ।"
তিতলি"পড়তে দেবে?" অর্ণব"ভাবছি।"
তিতলি"ভাবছ মানে?" অর্ণব"মানে সাহস করতে হবে।"
"তুমি আমাকে বলেছিলে — স্বপ্ন ভেজা হাতে ধরতে। নিজে কেন ধরছ না?"
তিতলি"লেখাটা আমাকে পড়াও।" অর্ণব"যদি ভালো না লাগে?"
তিতলি"তাহলে বলব।" অর্ণব"সত্যি বলবে?"
তিতলি"আমি সবসময় সত্যি বলি। জানো তো।" অর্ণব"জানি। সেটাই ভয়।"
তিতলি"সৎ সমালোচক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।" অর্ণব"আমার ভাগ্য ভালো তাহলে।" তিতলি"হ্যাঁ।"
শনিবার — সকালে উঠে তিতলির মেসেজ
"আজ বাবা এসেছেন। হঠাৎ। দিল্লি থেকে সারপ্রাইজ।"
"ভালো তো। খুশি হলে?" "অনেক। কিন্তু একটু ভয়ও লাগছে।"
"কেন?"
"মা বাবাকে সব বলেন। হয়তো তোমার কথা বলেছেন।"
"বাবা কি কিছু জিজ্ঞেস করেছেন?"
"এখনো না। কিন্তু জিজ্ঞেস করবেন।"
"ভয় নেই।"
"আজ বেরোতে পারব না। বাবার সাথে থাকব।"
"অবশ্যই। বাবার সাথে থাকো।"
"মনখারাপ?"
"না। বরং ভালো লাগছে।"
"কেন?"
"কারণ তুমি বাবার সাথে থাকবে। এটা তোমার জন্য ভালো। সেটাই আমার ভালো।"
"তুমি মাঝে মাঝে অনেক ভালো কথা বলো।" "মাঝে মাঝে?" "বেশিরভাগ সময়।"
সেদিন অর্ণব একা রইল। শব্দলোকে গেল।
নিতাইদা ছিলেন।
নিতাইদা"একা?" অর্ণব"আজ একা।" নিতাইদা"আচ্ছা।"
কোনো প্রশ্ন নেই।
ভেতরে গেল। বসল। বই নিল।
পড়ল।
কিন্তু বইয়ের চেয়ে বেশি ভাবল।
তিতলির বাবা কী জিজ্ঞেস করবেন?
তিতলি কী বলবে?
এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরছে।
নিতাইদা এক কাপ চা এনে রাখলেন।
নিতাইদা"ভাবছিস?" অর্ণব"হ্যাঁ।" নিতাইদা"কী নিয়ে?"
অর্ণব"নিতাইদা, তুমি কি কখনো কারো বাবার সামনে পড়েছিলে? মানে — যাকে ভালোবাসতে তার বাবার সামনে?"
নিতাইদা একটু হাসলেন। বসলেন।
নিতাইদা"অনেকবার।" অর্ণব"কেমন লেগেছিল?"
"প্রথমবার মনে হয়েছিল পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে। তারপর বুঝলাম — বাবারাও মানুষ। তাদেরও ভয় আছে। তারাও চান মেয়ে ভালো থাকুক।"
অর্ণব"কীভাবে বুঝলেন যে ভালো থাকবে?"
"বুঝলাম না। আমি শুধু সত্যনিষ্ঠ ছিলাম। বাবা দেখলেন। সময় নিলেন। তারপর বললেন — আচ্ছা।"
"এতটুকুই যথেষ্ট।"
অর্ণব"এতটুকু?"
নিতাইদা(উঠতে উঠতে) "বাবার 'আচ্ছা' মানে অনেক কিছু।"
সন্ধ্যায় তিতলির ফোন
তিতলির গলায় একটু উত্তেজনা।
তিতলি"বাবা জিজ্ঞেস করলেন।" অর্ণব"কী জিজ্ঞেস করলেন?"
তিতলি"বললেন — মা বলেছে একজনের সাথে কথা হচ্ছে। কে ছেলেটা?"
অর্ণব"তুমি কী বললে?" তিতলি"বললাম — নাম অর্ণব। বারাসাতের। ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে।"
অর্ণব"তারপর?" তিতলি"বাবা চুপ করে রইলেন একটু। তারপর বললেন — বারাসাতের ছেলে?"
তিতলি"তারপর বাবা বললেন — ভালো। এখানকার মানুষ হলে ভালো।"
অর্ণব"এইটুকু?" তিতলি"না। আরো আছে।" অর্ণব"কী?"
তিতলি"বললেন — একদিন আসুক।"
অর্ণব থামল।
অর্ণব"মানে?"
"মানে, বাবা দেখতে চান। তোমাকে।"
নীরবতা।
অর্ণব শুয়ে ছিল।
সিলিং দেখছিল।
অর্ণব"কবে?" তিতলি"তুমি রাজি?"
অর্ণব"রাজি না হওয়ার কিছু নেই। তোমার বাবা দেখতে চাইছেন — এটা স্বাভাবিক।"
তিতলি"কিন্তু ভয় লাগছে না?" অর্ণব"লাগছে।" তিতলি"তাহলে?"
"ভয় লাগলেও করতে হয়। এটা তো তুমি শিখিয়েছ।"
তিতলি"তুমি সত্যিই অনেক বদলেছ।" অর্ণব"কীভাবে?"
তিতলি"আগে ভাবতে তুমি সাহসী নও।" অর্ণব"এখনো নই।" তিতলি"কিন্তু করছ।"
"সেটাই সাহস। ভয় না থাকলে সাহসের দরকার হয় না।"
তিতলি"আচ্ছা। কাল বিকেলে আসো। চারটায়।" অর্ণব"ঠিক আছে।"
তিতলি"ঘাবড়িও না।" অর্ণব"চেষ্টা করব।"
সেই রাতে ঘুম হল না ভালো।
কী বলবে?
কীভাবে বসবে?
কী পরবে?
ছোট ছোট প্রশ্ন। বড় ভয়।
মাঝরাতে উঠে জল খেল।
ছাদে গেল।
বারাসাতের রাত।
তারা আছে। চাঁদ আছে। বাতাস আছে।
অর্ণব ভাবল — এই শহরে বড় হয়েছি। এই শহরেই তিতলি বড় হয়েছে। একই আকাশ দেখেছি। একই বৃষ্টিতে ভিজেছি।
তিতলির বাবা এই শহরকে ভালোবাসেন। নইলে মেয়েকে এখানে রাখতেন না।
শহরটা যদি মিলে যায় — তাহলে হয়তো বাকিটাও মিলবে।
একটু শান্তি পেল।
রবিবার বিকেল।
অর্ণব তৈরি হল।
সাদা পাঞ্জাবি। এবার পরিষ্কার — দোলের রং কাচা হয়ে গেছে।
মা"কোথায় যাচ্ছিস?" অর্ণব"একটা বাড়িতে।"
মা"কার বাড়ি?" অর্ণব"পরিচিত।"
মা আর জিজ্ঞেস করলেন না। কিন্তু বললেন —
মা"একটু মিষ্টি নিয়ে যা। খালি হাতে যাস না।"
অর্ণব থামল। মা জানেন। মায়েরা সব জানেন।
মিষ্টির দোকান থেকে এক বাক্স সন্দেশ নিল।
তিতলিদের বাড়ি। কদমতলার পাশের গলিতে।
পুরনো দোতলা বাড়ি। সামনে একটু বাগান — গাঁদাফুল ফুটেছে। একটা তুলসীগাছ।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অর্ণব একটু থামল। বুকের ভেতর একটা টান।
ফোন করল তিতলিকে। "এসেছি।" — "দেখছি। আসো।"
দরজা খুলল তিতলি।
আজকের পোশাক — হালকা নীল শাড়ি। চুল বাঁধা। কানে সোনার ছোট্ট দুল।
এই প্রথম শাড়িতে দেখল।
অর্ণব কথা বলতে পারল না এক মুহূর্ত।
তিতলি বুঝল। একটু হাসল — ছোট্ট।
"ভেতরে আসো।"
বসার ঘর।
পরিষ্কার, গোছানো। দেওয়ালে কয়েকটা ছবি — তিতলির ছোটবেলার, পরিবারের।
একটা সোফায় বসে আছেন একজন মানুষ।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চুলে সামান্য পাক। চোখে চশমা। মুখে একটা শান্ত ভাব।
এটাই তিতলির বাবা।
সুরেশ মজুমদার।
উঠে দাঁড়ালেন। "আসো।"
অর্ণব"প্রণাম।" সুরেশবাবু"থাক থাক। বসো।"
মিষ্টির বাক্সটা এগিয়ে দিল। সুরেশবাবু তিতলির মাকে ডাকলেন — "দেখো, ছেলে মিষ্টি এনেছে।"
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন তিতলির মা। মধ্যবয়সী, মুখে হাসি, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
মা"আসো বাবা।" অর্ণব"প্রণাম।" মা"ভালো থাকো। বসো।"
তিতলি পাশে বসল। একটু দূরে।
প্রথম কয়েক মিনিট একটু আড়ষ্ট।
ভেতরে তিতলির মা চা নিয়ে এলেন — চা খেতে খেতে কথা হল।
সুরেশবাবু"কোথায় পড়েছ?" অর্ণব"ইঞ্জিনিয়ারিং। যাদবপুর থেকে।"
সুরেশবাবু"ভালো কলেজ। এখন কী করো?"
অর্ণব"একটা সফটওয়্যার কোম্পানিতে। অফিস সল্টলেকে। তবে বাড়ি বারাসাতে।"
সুরেশবাবু"বারাসাত ভালো জায়গা। আমিও এখানে বড় হয়েছি। এখন দিল্লিতে থাকতে হচ্ছে চাকরির জন্য।"
অর্ণব"জানি। তিতলি বলেছে।"
সুরেশবাবু"তিতলি কী কী বলেছে?" অর্ণব"ভালো কথাই বলেছে। বলেছে আপনারা অনেক মিস করেন।"
সুরেশবাবু একটু চুপ করলেন। তারপর বললেন, "হ্যাঁ। মিস করি।"
পরিবার
সুরেশবাবু"পরিবার কেমন?" অর্ণব"বাবা-মা আছেন। বাবা অবসর নিয়েছেন। মা গৃহিণী।"
সুরেশবাবু"বাবা কী করতেন?" অর্ণব"স্কুলে পড়াতেন।"
সুরেশবাবু একটু উজ্জ্বল হলেন। "শিক্ষক পরিবার। ভালো।"
অর্ণব"আপনি?" সুরেশবাবু"সরকারি চাকরি। দিল্লিতে মন্ত্রণালয়ে। আর অল্প কিছু বছর আছে মাত্র। তারপর ফিরে আসব।"
অর্ণব"বারাসাতে?" সুরেশবাবু"হ্যাঁ। এই শহর ছাড়া থাকতে পারি না।" অর্ণব"আমিও।"
সুরেশবাবু"মানে?" অর্ণব"মানে আমিও এই শহর ছাড়তে পারি না। অফিস থেকে একবার দূরে যাওয়ার সুযোগ এসেছিল। যাইনি।"
সুরেশবাবু"কেন?"
"কারণ এই শহরে যা আছে তা অন্য কোথাও পাব না।"
সুরেশবাবু বুঝলেন। পরিষ্কার বললেন না অর্ণব। কিন্তু ঘুরিয়েও বলেনি। বাবারা বোঝেন।
তিতলি আর মা মুড়ি-তেলেভাজা আনতে উঠলেন — অর্ণব আর সুরেশবাবু একটু একা।
সুরেশবাবু"তিতলি কেমন মেয়ে — জানো?"
অর্ণব"জানি।" সুরেশবাবু"কতটুকু জানো?"
অর্ণব"অনেকটাই। কিন্তু এখনো সব জানি না। জানতে চাই।"
সুরেশবাবু"তিতলি সহজ মেয়ে নয়।" অর্ণব"জানি।"
সুরেশবাবু"মানে সহজলভ্য নয়। সহজ মানুষ। কিন্তু ভেতরে অনেক গভীর। সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে।"
অর্ণব"লাগুক।" সুরেশবাবু"তাড়া নেই?" অর্ণব"না।" সুরেশবাবু"কেন?"
"কারণ ভালো জিনিসের জন্য সময় দেওয়া যায়।"
সুরেশবাবু চুপ করে রইলেন। তারপর একটু হাসলেন।
এটাই প্রথম হাসি।
মুড়ি তেলেভাজা — সবাই মিলে বসল।
তিতলির মা"বাবা-মা জানেন তিতলির কথা?"
অর্ণব"মা একটু জানেন। মানে, বুঝেছেন। বিস্তারিত এখনো বলিনি।"
তিতলির মা"কেন?" অর্ণব"কারণ আগে নিজেরা বুঝতে চেয়েছিলাম।"
তিতলির মা"ঠিক আছে।"
তিতলি চুপচাপ মুড়ি খাচ্ছে। অর্ণব একবার দেখল। তিতলি চোখের কোণ দিয়ে দেখল — আর মুখ নামাল।
সন্ধ্যা হয়ে এল। উঠে দাঁড়াল অর্ণব।
অর্ণব"আসি।" সুরেশবাবু"আবার আসবে।" অর্ণব"আসব।"
মা"বাবাকে নিয়ে এসো একদিন।" অর্ণব"আচ্ছা।"
তিতলি দরজা পর্যন্ত এল। বাইরে বেরিয়ে অর্ণব ঘুরল।
তিতলি দরজায় দাঁড়িয়ে। মুখে একটা ভাব। কিছু বলল না। অর্ণবও বলল না।
চোখে চোখ। এক মুহূর্ত। তারপর অর্ণব হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তায় বেরিয়ে ফোন এল।
তিতলি"কেমন লাগল?" অর্ণব"ভালো।" তিতলি"সত্যি?" অর্ণব"সত্যি। বাবা ভালো মানুষ।"
তিতলি"বাবা কী বললেন?" অর্ণব"বললেন তিতলি সহজ মেয়ে নয়।"
তিতলি"আর তুমি?" অর্ণব"বললাম — লাগুক সময়।"
তিতলি"বাবা কিছু বললেন?" অর্ণব"হাসলেন।"
তিতলি"বাবা খুব কম হাসেন।" অর্ণব"জানি।" তিতলি"কীভাবে জানো?"
অর্ণব"কারণ তুমি বলেছ — বাবা চুপ থাকেন। চুপ থাকা মানুষেরা সহজে হাসেন না।"
তিতলি"তুমি মনে রাখো সব।" অর্ণব"তোমার কথা রাখি।"
তিতলি"অর্ণব।" অর্ণব"হুম।"
তিতলি"আজ তুমি যখন বাবার সাথে কথা বলছিলে — আমি শুনছিলাম।" অর্ণব"জানি।"
তিতলি"তুমি একটা কথা বললে — ভালো জিনিসের জন্য সময় দেওয়া যায়।"
তিতলি"বাবা হাসলেন।" অর্ণব"জানি।" তিতলি"আমিও হাসলাম।" অর্ণব"দেখেছি।"
তিতলি"দেখেছ? চোখ ছিল আমার দিকে?" অর্ণব"একটু।" তিতলি"তুমি মিথ্যে বলছ।" অর্ণব"একটু।"
দুজনেই হাসল।
রাতে অর্ণব বাড়ি ফিরল।
মা জিজ্ঞেস করলেন, "কার বাড়ি গিয়েছিলি?"
অর্ণব একটু ভাবল।
এবার বলার সময়।
অর্ণব"মা, বসো।"
মা একটু অবাক হলেন। বসলেন।
অর্ণব বলল। সব। স্টেশনের প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজকের বিকেল পর্যন্ত।
মা চুপ করে শুনলেন। মাঝখানে একবারও থামালেন না।
মা"নামটা কী বললি?" অর্ণব"তিতলি।"
"তিতলি।" মা নামটা উচ্চারণ করলেন। যেন মুখে রাখলেন একটু।
মা"কোন পাড়ার?" অর্ণব"কদমতলার পাশে।"
মা"মজুমদার পরিবার?" অর্ণব"চেনেন?"
মা"এই শহরে সব চেনা। ভালো পরিবার।"
অর্ণব"তাহলে?" মা"তাহলে কী?" অর্ণব"মানে — আপনি কী বলছেন?"
মা উঠে দাঁড়ালেন। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন —
"বলছি — রাতে ভাত খা। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
অর্ণব(হাসল) "এইটুকুই?"
মা রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন —
"তিতলি কে একদিন বাড়িতে আনবি।"
সেই রাতে অর্ণব ডায়েরি খুলল।
লিখল সেই অসম্পূর্ণ গল্পটায় নতুন একটা অনুচ্ছেদ।
গল্পের নতুন অনুচ্ছেদ
গল্পের মানুষটা এখন একটা বাড়িতে গেছে।
একটা বাগানে গাঁদাফুল।
একটা তুলসীগাছ।
একজন বাবা যিনি কম হাসেন।
একজন মা যিনি সব বোঝেন।
আর একটা মেয়ে — নীল শাড়িতে — দরজায় দাঁড়িয়ে।
গল্পটা লিখতে লিখতে অর্ণব বুঝল —
এটা আর শুধু গল্প নয়।
এটা জীবন। তার জীবন।
এবং এই জীবনটা লেখার মতো।
কলম রাখল।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
বারাসাতের রাত।
কদমতলার দিকে।
ওইদিকে একটা বাড়িতে — তিতলি হয়তো এখন ঘুমাচ্ছে। বা হয়তো জেগে আছে। হয়তো ভাবছে।
ঠিক তখন মেসেজ এল।
"ঘুমাওনি?" "না। তুমি?" "না।"
"বাবা শুতে যাওয়ার আগে বললেন একটা কথা।" "কী বললেন?"
"ছেলেটার চোখ সৎ।"
অর্ণব পড়ল। আবার পড়ল।
চোখ সৎ।
এর চেয়ে বড় প্রশংসা আর কী হতে পারে?
"বাবাকে প্রণাম জানিও।" "নিজে এসে জানাও।" "আসব।"
"কথা কিন্তু।" "কথা।"
"অর্ণব, আজকে একটা ভয় কমল।" "কোন ভয়?"
"এতদিন ভাবতাম — বাবা কী ভাববেন। আজ দেখলাম বাবা দেখলেন। বুঝলেন।"
"বাবারা বোঝেন।" "হ্যাঁ।" "তুমিও একদিন বুঝবে।"
"কী বুঝব?" "বাবা হলে বুঝবে।"
এই কথাটা — ভবিষ্যতের কথা — এত স্বাভাবিকভাবে বলল। যেন ধরেই নিয়েছে।
"শুভরাত্রি।" "শুভরাত্রি।"
"আর একটা কথা।" "কী?"
"গল্পটা কবে পড়াবে?" "পরের রবিবার।" "কথা কিন্তু।" "কথা।"
বাইরে বারাসাতের রাত গভীর হল।
কদমতলার মোড়ে আলো নিভল।
একটা কুকুর ডাকছে দূরে।
বসন্তের বাতাস আসছে জানালা দিয়ে। ফুলের গন্ধ।
অর্ণব শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করল।
মাথায় ঘুরছে একটা কথা —
চোখ সৎ।
এই কথাটা রাখতে হবে। সারাজীবন।
✦ অষ্টম পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
পরের রবিবার এল। অর্ণব তার লেখা গল্পটা তিতলিকে পড়াল। তিতলি পড়ল — একা, শব্দলোকের সেই ছোট্ট ঘরে। পড়তে পড়তে তার চোখ ভিজে গেল। কারণ গল্পটা তার চেনা। প্রতিটা চরিত্র তার চেনা। এবং গল্পের শেষ লাইনটা — সেটা পড়ে সে অর্ণবের দিকে তাকাল। আর অর্ণব বুঝল — এবার আর গল্প নয়, এবার সত্যি বলার সময়।
অপেক্ষায় থাকুন — নবম পর্ব: "গল্পের শেষ লাইন"
বাবার সামনে পড়া — এটা শুধু একটা সাক্ষাৎ নয়। এটা একটা পরীক্ষা। কিন্তু এই পরীক্ষায় পাস-ফেল নেই। আছে শুধু সততা। অর্ণব আজ সৎ ছিল। সৎ চোখে, সৎ কথায়। সুরেশবাবু দেখলেন। বললেন — চোখ সৎ। এইটুকুই যথেষ্ট। কারণ সৎ চোখ কখনো মিথ্যে আলো দেখায় না।
