বারাসাতের নীল আকাশ - ষষ্ঠ পর্ব: ভালোবাসা আর নতুন জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত
অর্ণবের সামনে পুণেতে বড় সুযোগ, অন্যদিকে তিতলির বাড়িতে বিয়ের কথা। ভালোবাসা আর ভয়ের এই দোলাচলে কোন পথে এগোবে তাদের সম্পর্ক? পড়ুন বারাসাতের নীল আকাশ সিরিজের ষষ্ঠ পর্ব।
Bengali Serial Fiction ✦ ষষ্ঠ পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"ভালোবাসা আর ভয়"
সোমবার সকালে অফিসে বসে অর্ণব যখন কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন মনটা আসলে অন্য কোথাও ছিল।
ইছামতীর পাড়ে।
ঘাসের উপর।
দুটো শব্দের কাছে।
হ্যাঁ। আমিও।
এই দুটো শব্দ গত একদিন ধরে মাথায় ঘুরছে। ঘুমের মধ্যে, জেগে উঠলে, চায়ে চুমুক দিতে দিতে — সর্বত্র।
পাশের সিটে বসা সহকর্মী রাহুল বলল, "কিরে, আজ মুখে হাসি কেন?"
"কিছু না।"
"কিছু না মানে কিছু একটা।" রাহুল সন্দেহের চোখে তাকাল। "মেয়ে?"
"বললাম তো কিছু না।"
রাহুল হাসল। "তোর মুখ দেখে বুঝছি।"
অর্ণব কম্পিউটারের দিকে মুখ ফেরাল। কিছু বলল না।
কিন্তু হাসিটা সরাতে পারল না।
বিকেলে ম্যানেজার ডাকলেন।
মিস্টার ঘোষ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চশমা, গোঁফ, সবসময় কাজের কথা।
"বোসো।"
অর্ণব বসল।
"তোমাকে একটা সুযোগের কথা বলব।"
অর্ণব চুপ করে শুনল।
"আমাদের কোম্পানি পুণেতে একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু করছে। বড় প্রজেক্ট। দুই বছরের। সেখানে একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার দরকার। তোমার নাম উপরে দিয়েছি।"
পুণে।
বারাসাত থেকে পুণে — দেড় হাজার কিলোমিটার। দুই বছর।
মিস্টার ঘোষ আরো কিছু বললেন। অর্ণব শুনল — কিন্তু অর্ধেক কানে।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অর্ণব সরাসরি ছাদে গেল।
মাথাটা ঠান্ডা করতে হবে।
এই শহর।
এই পরিচিত শহর।
দুই বছর এটা ছেড়ে থাকা।
মা, বাবা ছেড়ে থাকা।
শব্দলোক ছেড়ে থাকা।
নিতাইদা ছেড়ে থাকা।
আর—
তিতলি।
মাত্র শুরু হয়েছে। মাত্র দুটো শব্দ বলা হয়েছে। এখনো অনেক কথা বলার আছে, অনেক জায়গা দেখার আছে, অনেক রবিবার বাকি।
এখন পুণে?
রাতে খাবার টেবিলে
বাবার মুখে একটা উজ্জ্বল ভাব এল। "এটা তো ভালো সুযোগ। যাওয়া উচিত।"
"ক্যারিয়ারে এরকম সুযোগ বারবার আসে না।" বাবা বললেন। "দুই বছর। কেটে যাবে।"
মা চুপ করে রইলেন।
মা বললেন, "কী মন বলছে তোর?"
"জানি না।"
"জানিস।" মা সহজভাবে বললেন। "মন সবসময় জানে। মুখ বলতে পারে না।"
বাবা বললেন, "মনের কথা শুনলে চলে না। বাস্তব দেখতে হয়।"
"মন ছাড়া বাস্তব নিষ্প্রাণ।" — মা
স্বামী-স্ত্রীর এই পুরনো তর্ক।
অর্ণব মাঝখানে বসে ভাত খেল। কিছু বলল না।
রাতে — একটা মেসেজ
"ঘুমাননি? — তিতলি"
রাত তখন এগারোটা।
অর্ণব লিখল — "না। আপনি?"
"না। মাথায় অনেক কিছু।"
"কী ব্যাপার?"
একটু চুপ।
তারপর — "ফোন করব?"
"আজকে বাড়িতে একটা কথা হল।" তিতলি বলল। "মা বললেন — একটা ছেলের সাথে কথা হচ্ছে। পরিচিত পরিবার। দেখতে চান।"
অর্ণব চুপ করে গেল।
"মানে," তিতলি বলল, "পাত্র দেখা।"
"কারণ এখনো মাকে সব বলিনি।" একটু থামল। "আমাদের কথা।"
"ভয় লাগছে।" সে বলল।
"কীসের?"
"অনেক কিছুর।" একটু থামল। "এই যে আমরা — এটা এত নতুন। এত ভঙ্গুর মনে হচ্ছে।"
"তিতলি," সে বলল — এই প্রথম শুধু নাম ধরে ডাকল, 'আপনি' ছাড়া।
তিতলি চুপ হয়ে গেল।
"ভয় স্বাভাবিক," অর্ণব বলল। "কিন্তু ভয়ের কারণে এগোনো থামানো ঠিক না। আপনি নিজেই বলেছিলেন — বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ। কাচের আড়াল থেকে দেখতে নয়।"
"মনে রেখেছেন।" — তিতলি
"রাখি।"
"অফিস থেকে একটা সুযোগ এসেছে।"
"পুণে। দুই বছরের প্রজেক্ট।"
"পুণে," তিতলি বলল। কোনো প্রশ্ন নয়। শুধু শব্দটা।
এবারের নীরবতাটা আগেরগুলোর মতো নয়। এটা ভারী।
অর্ণব বলল, "তুমি কিছু বলছ না?"
তুমি।
এই প্রথম।
দুজনেই বুঝল।
তিতলি একটু হাসল — ফোনের ওপারে। অর্ণব শুনতে পেল হাসির আভাস।
"তুমিই এইমাত্র বললে — ভয়ের কারণে এগোনো থামানো ঠিক না।"
"যদি এই সুযোগটা তোমার জন্য ভালো হয়," তিতলি বলল, "তাহলে যাও।"
"আমি বলছি ভয় থেকে না যেও না। যদি যেতে চাও, যাও। যদি না যেতে চাও — তাহলেও ভয় থেকে নয়, নিজের কারণে।"
অর্ণব শুনল। এই মেয়ে — এতটুকু সময়ে — এত বোঝে।
"চাই।"
একটা শব্দ। ছোট্ট। কিন্তু এই শব্দটার ভেতর একটা সমস্ত রাতের ওজন।
বুধবার সন্ধ্যায়
তিতলি বলল, "আজ মাকে বললাম।"
"বললাম — একজন আছে। কথা হচ্ছে।"
"মা বললেন — ছেলে কি ভালো?"
অর্ণব হাসল। "তুমি কী বললে?"
"বললাম — হ্যাঁ।"
সিদ্ধান্ত
গত কয়েকদিন অনেক ভেবেছে। রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে। অফিসে কম্পিউটারের সামনে। বাসে জানালার ধারে।
তিতলিকে হারানোর ভয়ে যদি নিজের সুযোগ না নেয় — তাহলে সে তিতলির যোগ্য হবে কীভাবে?
এই মেয়ে সাহসী। এই মেয়ে সরাসরি। এই মেয়ে বৃষ্টিতে ভেজে।
এই মেয়ের পাশে থাকতে হলে সাহসী হতে হবে।
"সিদ্ধান্ত নিয়েছি।" সে বলল।
"যাব না।"
"কারণ আমি নিজে চাই না।" অর্ণব বলল। "ক্যারিয়ার এখানেও হবে। হয়তো ধীরে। কিন্তু হবে। আর এই শহর, এই মানুষগুলো — এগুলো ছেড়ে দূরে গিয়ে ভালো থাকতে পারব না।"
"এই মানুষগুলো মানে?"
অর্ণব হাসল। "তুমিও।"
"কারণ কিছু জিনিস আছে যেটা ক্যারিয়ারের প্যাকেজে কেনা যায় না।"
তিতলি চুপ। তারপর বলল, "তুমি আবার কবিতার মতো কথা বললে।"
অর্ণব হাসল।
শুক্রবার। অফিসে মিস্টার ঘোষকে জানাল।
"পুণে যাব না।"
মিস্টার ঘোষ একটু অবাক হলেন। "কেন? ভালো সুযোগ।"
"জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে এখানে থাকাটা দরকার।"
মিস্টার ঘোষ একটু দেখলেন। তারপর বললেন, "ঠিক আছে। তোমার সিদ্ধান্ত।"
অফিস থেকে বেরিয়ে অর্ণব একটু হালকা অনুভব করল।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে সবসময় একটা হালকা লাগে। ভালো সিদ্ধান্ত হোক বা খারাপ — ঝুলে থাকার চেয়ে নামিয়ে রাখা ভালো।
কিন্তু এই "আচ্ছা"-র ভেতর অনেক কিছু ছিল।
রবিবার — শব্দলোকে
নিতাইদা দেখলেন। হাসলেন। "অনেক দিন পর।"
তিতলি ব্যাগ থেকে একটা জিনিস বের করল।
ছোট্ট একটা খাতা।
নীল রঙের মলাট। একটু পুরনো।
প্রথম পাতায় — কদমতলার মোড়ের ছবি। পেন্সিলে আঁকা।
দ্বিতীয় পাতায় — শিমুলগাছ।
তৃতীয় পাতায় — ইছামতী।
চতুর্থ পাতায়— অর্ণব থামল।
একটা মানুষের ছবি। পেছন থেকে দেখা। বেঞ্চে বসে আছে, হাতে চায়ের ভাঁড়। স্টেশনের পরিবেশ।
অর্ণব বুঝল। এটা সে নিজে। স্টেশনের বেঞ্চে। প্রথম দিন।
"বাড়ি ফিরে এঁকেছিলাম। মনে ছিল।"
অর্ণব ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
পেছন থেকে দেখা মানুষটা। কিন্তু তিতলি এঁকেছে — মানে সে দেখেছিল। মনে রেখেছিল। প্রথম দিন থেকেই।
"দেখলাম।" অর্ণব বলল। "অনেক কিছু দেখলাম।"
তিতলি জিজ্ঞেস করল না কী দেখল। বুঝেছিল।
বৃষ্টিতে শব্দলোক
বৃষ্টি এল। ঝমঝম।
শব্দলোকের ছোট্ট ঘরে, হলুদ আলোয়, বৃষ্টির শব্দের মধ্যে — দুজন পাশাপাশি বসে বই পড়ছে।
অর্ণব পড়ছে বিভূতিভূষণ। তিতলি পড়ছে সুনীল।
মাঝে মাঝে কথা। মাঝে মাঝে চুপ। মাঝে মাঝে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
এই মুহূর্তটা — অর্ণব মনে মনে ভাবল — এই মুহূর্তটা মনে রাখব।
সারাজীবন।
বেরোনোর সময় নিতাইদা বললেন, "অর্ণব।"
"মেয়েটা ভালো।"
"যা ভালো সেটা ধরে রাখতে হয়। ছেড়ে দিলে হয় না।"
এই মানুষটা কম কথা বলেন। কিন্তু যখন বলেন — সঠিক সময়ে বলেন।
"রাখব।" সে বলল।
নিতাইদা হাসলেন।
কদমতলার মোড়ে। ভেজা রাস্তা। বৃষ্টির পরের গন্ধ।
"কারণ কিছু জিনিস আছে যেটার কোনো বিকল্প নেই। পুণেতে আরেকটা প্রজেক্ট হবে। আরেকটা সুযোগ আসবে।"
"কিন্তু শব্দলোকে বৃষ্টির মধ্যে পাশাপাশি বসে বই পড়া — এটা আর হবে না। এই মুহূর্তটা আর ফিরবে না।"
তিতলি চুপ করে রইল। চোখে একটা ভাব। কথা বলল না। কিন্তু একটু হাসল।
সেই হাসি — ঠোঁটের কোণের সামান্য বাঁক — যেটা প্রথম দিন স্টেশনে দেখেছিল। এখনো একই। এখনো একইরকম সুন্দর।
রাতে ঘুমের আগে অর্ণব ডায়েরি খুলল
আজ তিতলির ডায়েরি দেখলাম।
সেখানে আমি আছি।
প্রথম দিন থেকে।
মানুষ কখনো জানে না সে কার মনে আছে।
আমি জানতাম না।
আজ জানলাম।
এইটুকু জানাই কতটা বড় — বলা যাবে না।
শুধু বুকের ভেতর একটা উষ্ণতা আছে।
সেটাই যথেষ্ট।
কলম রাখল।
বাইরে বারাসাতের রাত। বৃষ্টির পরের নীরবতা। একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।
চাঁদ নেই আজ — মেঘ।
কিন্তু মেঘের আড়ালেও চাঁদ থাকে।
আলো দেখা না গেলেও আলো থাকে।
✦ ষষ্ঠ পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
শীত শেষ হচ্ছে। বসন্ত আসছে। বারাসাতে দোল উৎসব। রঙের মেলায় দুজন। প্রথমবার একসাথে উৎসবে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই একটা অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত — যেটা দুজনকে আরো কাছে আনবে, আরো স্পষ্ট করবে।
অপেক্ষায় থাকুন — সপ্তম পর্ব: "রঙের মাঝে তুমি"
ভালোবাসায় ভয় থাকে। ভয় না থাকলে সেটা ভালোবাসা নয় — সেটা অভ্যাস। অর্ণব আর তিতলি আজ তাদের ভয়গুলো দেখল। একে অপরের সামনে। এবং দেখল — ভয়গুলো একা নয়, দুজনের। একসাথে ভয় পেলে ভয়টা অর্ধেক হয়ে যায়। বাকি অর্ধেকটা — সাহস।
