বারাসাতের নীল আকাশ - তৃতীয় পর্ব : বৃষ্টিভেজা সকালে তিতলি আর অর্ণবের নতুন গল্প
বারাসাতের নীল আকাশ উপন্যাসের তৃতীয় পর্বে বৃষ্টিভেজা এক রবিবারে শব্দলোকে অর্ণব আর তিতলির দেখা হয়। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তিতলির আগমনে এক নতুন অনুভূতির ছোঁয়া লাগে অর্ণবের মনে।
Bengali Serial Fiction ✦ তৃতীয় পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"বৃষ্টি, তুমি কি জানতে?"
রবিবার সকালে উঠে অর্ণব প্রথমে আকাশ দেখল।
মেঘ।
পুরো আকাশ জুড়ে ধূসর মেঘ — যেন কেউ একটা বিশাল কম্বল টেনে দিয়েছে পৃথিবীর উপর। বাতাসে একটা ভেজা ভেজা গন্ধ। শীতের শেষে এরকম মেঘ আসে মাঝে মাঝে — না শীত, না গরম, একটা অদ্ভুত মাঝামাঝি অবস্থা।
"অর্ণব, জলখাবার খেয়ে নে।"
"পরে খাব মা।"
"পরে মানে? ঠান্ডা হয়ে যাবে।"
মায়ের সাথে এই কথোপকথন প্রতিদিনের। অর্ণব উঠল। মুখ ধুল। টেবিলে বসল।
মুড়ি আর চা। বারাসাতের রবিবারের সকাল মানেই এই। পৃথিবীর কোনো ব্র্যাঞ্চ এই স্বাদ দিতে পারবে না।
কিন্তু আজ মুড়িতে মন নেই।
মনটা আছে শব্দলোকে।
তিতলি কি আসবে?
এই প্রশ্নটা গত সাত দিন ধরে মাথায় ঘুরছে। কখনো নিশ্চিত মনে হয়েছে — আসবে, সে নিজেই বলেছে। কখনো মনে হয়েছে — হয়তো ভুলে গেছে, হয়তো মনে নেই, হয়তো সেটা শুধু সৌজন্যের কথা ছিল।
সাতাশ বছর বয়সে মানুষ এরকম ভাবে। নিজেকে নিজেই সন্দেহ করে।
শব্দলোকে পৌঁছাল সাড়ে দশটায়।
নিতাইদা ছিলেন। চা ছিল। বইয়ের গন্ধ ছিল।
তিতলি ছিল না।
অর্ণব ভেতরে গেল। বইয়ের তাক ঘুরল। একটা বই নিল। বসল। পড়তে চাইল। পড়া হল না।
বারবার দরজার দিকে চোখ যাচ্ছে।
এগারোটা বাজল। তিতলি এল না।
সাড়ে এগারোটা। তিতলি এল না।
নিতাইদা একবার উঁকি মারলেন ভেতরে। অর্ণবকে দেখলেন। কিছু বললেন না। কিন্তু তাঁর চোখে একটা বোঝার ভাব ছিল — যেটা দেখে অর্ণব একটু লজ্জা পেল।
বারোটার কাছাকাছি সে উঠল। মনটা কেমন ভার হয়ে আছে। রাগ নয়, দুঃখও নয় ঠিক — একটা অদ্ভুত ফাঁকা অনুভূতি।
বাইরে বেরোতেই টের পেল — বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
হঠাৎ বৃষ্টি। ঝেঁপে নয়, ঝিরঝির করে। যেন আকাশটাও নিশ্চিত নয় কতটা কাঁদবে।
অর্ণবের কাছে ছাতা ছিল না। সে দাঁড়িয়ে রইল শব্দলোকের দরজায়। ছাদের কার্নিশ একটু আশ্রয় দিচ্ছে। বৃষ্টিটা দেখল।
চাঁপাতলার পুরনো গলিতে বৃষ্টি পড়ছে — রাস্তায় ছোট ছোট ঢেউ উঠছে, পাঁচিলের গায়ে জমা শ্যাওলা আরো সবুজ হয়ে উঠছে, একটা বেড়াল ছুটে গেল কোথাও।
বৃষ্টিতে বারাসাতকে অন্যরকম সুন্দর লাগে।
"এই যে!"
পেছন থেকে ডাক। অর্ণব ঘুরল।
তিতলি।
ভেজা। পুরোপুরি ভেজা। চুল থেকে জল পড়ছে। হাতে একটা ব্যাগ — সেটাও ভেজা। মুখে একটা অদ্ভুত হাসি — লজ্জা আর মজা মিলিয়ে।
"দেরি হয়ে গেল," সে বলল। হাঁফাচ্ছে একটু। "অটো পেলাম না, তারপর বৃষ্টি—"
"আপনি পুরো ভিজে গেছেন," অর্ণব বলল।
"দেখতেই পাচ্ছি।" তিতলি হাসল। জল টপটপ করছে নাকের ডগা থেকে। "আসতে পারব না মনে করেছিলাম। তারপর মনে হল—" সে থামল।
"কী মনে হল?"
তিতলি একটু অন্যদিকে তাকাল।
"মনে হল যাই।"
সহজ কথা। কিন্তু সহজ কথার ভেতর অনেক সময় অনেককিছু থাকে।
নিতাইদা ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছেন। "আরে, ভিজে একাকার হয়ে গেছ!" তিনি তিতলিকে দেখে বললেন। "ভেতরে আয়, ভেতরে আয়।" পেছনের ছোট্ট ঘর থেকে একটা পুরনো তোয়ালে বের করলেন।
তিতলি মুছল। চুল এলোমেলো হয়ে গেল আরো।
তিতলি চুল মুছতে মুছতে তাকাল। "কী দেখছেন?"
"কিছু না।"
"মিথ্যে বলছেন।"
অর্ণব হাসল। "একটু দেখছি।"
তিতলি আর কিছু বলল না। কিন্তু কান দুটো একটু লাল হয়ে গেল — ঠান্ডায়, না অন্য কারণে, বলা মুশকিল।
চা এল। এবার দুকাপ।
"আজ দুকাপ।"
অর্ণব হাসল। "কাল এককাপ দিয়েছিলেন।"
"কাল আলাদা ছিল। আজ মেয়েটা ভিজে এসেছে, আজ দুকাপ লাগবে।"
— নিতাইদা বলে চলে গেলেন।
তিতলি চায়ের কাপ দুহাতে ধরল। একটু উষ্ণতার জন্য।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
ভেতরে চায়ের ধোঁয়া উঠছে।
"আসতে পারবেন না মনে করছিলেন কেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
তিতলি চায়ে চুমুক দিল। "মায়ের শরীর একটু খারাপ ছিল সকাল থেকে। থাকতে চেয়েছিলাম। তারপর মা নিজেই বললেন যেতে।"
"মা জানেন আসছেন?"
"জানেন যে বই পড়তে যাচ্ছি।" একটু থামল। "বাকিটা জানেন না।"
বাকিটা। অর্ণব ভাবল — বাকিটা মানে কী? মানে এই দেখা হওয়া? মানে এই অপেক্ষা করা?
তিতলি বলল, "আপনি কতক্ষণ ছিলেন?"
"সাড়ে দশটা থেকে।"
"মানে দুই ঘণ্টা।" তিতলি একটু অবাক হল। তারপর আস্তে বলল, "অপেক্ষা করছিলেন?"
সরাসরি প্রশ্ন। আবার। এই মেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে। ঘোরাপথে যায় না।
অর্ণব একটু ভাবল। মিথ্যে বলা যায়। বলা যায় — না, এমনিই ছিলাম, বই পড়ছিলাম।
কিন্তু মিথ্যে বলতে ইচ্ছে করল না।
"হ্যাঁ।"
তিতলি চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইল একটু। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখল। তারপর বলল, "আমিও তাড়াতাড়ি আসতে চেয়েছিলাম।"
বাইরে বৃষ্টি বাড়ল।
ঝিরঝির থেকে ঝমঝম।
চাঁপাতলার গলিতে জল জমছে। একটা ছেলে সাইকেল নিয়ে যাচ্ছে, পা ভিজছে। দুটো কাক একটা পুরনো ছাদের কার্নিশে বসে আছে।
"বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে আপনার?"
"হ্যাঁ। তবে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে না।"
তিতলি হাসল। "আমার উলটো। বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে। দেখতে একটু একঘেয়ে লাগে।"
"একঘেয়ে?" অর্ণব একটু অবাক হল। "কেন?"
"কারণ বৃষ্টি দেখা মানে দূর থেকে দেখা। কাচের ওপাশ থেকে। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজা মানে অনুভব করা। আমি অনুভব করতে পছন্দ করি।"
অর্ণব চুপ করে রইল। এই কথাটা তার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগল।
"তাহলে আপনি অনেক সাহসী," সে বলল।
"কেন?"
"কারণ অনুভব করা মানে কষ্টও পাওয়া। আনন্দ শুধু নয়।"
"কষ্ট না পেলে আনন্দের মূল্য কী?"
কথায় কথায় বেরিয়ে এল —
তিতলির ছোটবেলা। কদমতলার কাছের সেই পুকুর — যেটা এখন প্রায় ভরাট হয়ে গেছে — সেখানে সে বৃষ্টির দিনে পাথর ছুঁড়ত। ঢেউ দেখত।
"পুকুরটা মিস করেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"প্রচণ্ড। ওই পুকুরের পাশে একটা কাঁঠালগাছ ছিল। গরমে কাঁঠাল পড়ত। পাড়ার সবাই কুড়িয়ে নিত। সেই গন্ধটা এখনো মনে আছে।"
"শহর বদলে যাচ্ছে।"
"হ্যাঁ। বারাসাত বদলে যাচ্ছে। নতুন বাড়ি, নতুন দোকান। ভালোই হয়তো। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, উন্নতির জন্য কেন স্মৃতি বিসর্জন দিতে হয়?"
অর্ণব মাথা নাড়ল। "এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয় না।"
"আপনার মনে কী হয়?"
"মনে হয় স্থানগুলো বদলালেও স্মৃতি বদলায় না। পুকুরটা নেই, কিন্তু কাঁঠালের গন্ধটা আপনার মনে আছে। সেটাই আসল পুকুর।"
তিতলি তাকাল। দীর্ঘ তাকানো।
"এই কথাটা আমার অনেক ভালো লাগল।"
বেলা গড়াল। বৃষ্টি কমে এল। নিতাইদা এসে বললেন, "দুপুর হয়ে গেছে। আজ যদি আরো থাকতে চাও, আমি রুটি বানাতে পারি।" দুজনেই হাসল।
"না নিতাইদা," তিতলি বলল, "বাড়ি যেতে হবে। মা একা।"
"আচ্ছা।" নিতাইদা চলে যেতে যেতে বললেন, "পরের সপ্তাহেও আসবি। বৃষ্টি না থাকলেও আসবি।"
বেরোনোর সময় বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তায় জল। ভেজা মাটির গন্ধ। আকাশ একটু পরিষ্কার হয়েছে — মেঘের ফাঁক দিয়ে একটু রোদ।
এই রোদটা বৃষ্টির পরের রোদ — অন্যরকম। নরম, সোনালি, যেন একটু ক্লান্ত।
দুজন হাঁটছে। আজ কথা কম। কিন্তু পাশাপাশি হাঁটাটা স্বাভাবিক লাগছে।
ভেজা রাস্তায় পাশাপাশি, বৃষ্টির পরের সোনালি রোদে
কদমতলার মোড়ে আসতে আসতে তিতলি বলল, "আপনি কি কবিতা লেখেন?"
অর্ণব চমকে গেল। "কেন বললেন?"
"কারণ আপনি কথা বলেন কবিতার মতো। মানে, মনে হয় কথাগুলো আগে থেকে ভেবে রাখা।"
"ভেবে রাখি না।" অর্ণব বলল। "হয়তো বেশি পড়ার ফলে কথায় একটু রঙ আসে।"
তিতলি হাসল। "লেখালেখির ইচ্ছে আছে?"
"ছিল। এখনো আছে হয়তো। কিন্তু সাহস নেই।"
"কীসের সাহস?"
"নিজের কথা বলার সাহস। লেখা মানে তো নিজেকে খুলে দেওয়া। সেটা কঠিন।"
তিতলি চুপ করে রইল একটু। "আমার একটা ডায়েরি আছে," সে বলল, "যেটায় আমি ছবি আঁকি। মানুষ, জায়গা, যা মনে আসে। সেটাও এক ধরনের লেখা কিনা?"
"অবশ্যই।" অর্ণব বলল। "হয়তো আরো সৎ।"
"সৎ মানে?"
"ছবিতে মিথ্যে বলা কঠিন। কথায় অনেক সময় সাজিয়ে বলা যায়। কিন্তু আঁকা মানে সরাসরি মনের ভাষা।"
তিতলি একটু থামল।
"আপনাকে একদিন দেখাব।"
ডায়েরি দেখানো মানে নিজের অন্তরের একটা অংশ দেখানো। এটা সহজ নয়। অর্ণব বুঝল।
কদমতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে। তিতলির গলি বাম দিকে। অর্ণবের গলি ডান দিকে। আজ বিদায় নেওয়ার সময় দুজনেই একটু বেশি দাঁড়াল।
"পরের রবিবার?" অর্ণব বলল।
"হ্যাঁ।" তিতলি বলল। "এবার আগে আসব। বৃষ্টিতে ভিজে নয়।"
হাসল দুজনে।
তিতলি যেতে যেতে একবার ঘুরল।
"অর্ণবদা—" থামল।
অর্ণব অবাক হল। দা?
"মানে," তিতলি একটু লজ্জা পেল, "আমি আপনার চেয়ে ছোট মনে হয়। বয়স কত?"
"সাতাশ।"
"আমি পঁচিশ।" একটু হাসল। "তাহলে ঠিকই আছে।"
বলে চলে গেল।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবছিল — কখন থেকে দা হয়ে গেল?
কিন্তু কেন জানি, এই "দা" ডাকটায় একটা উষ্ণতা ছিল। দূরত্ব নয়, বরং কাছের একটা অনুভূতি।
রাতে অর্ণব ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টির পর রাতের আকাশ অনেক পরিষ্কার। তারা দেখা যাচ্ছে।
বারাসাতে তারা দেখা যায় — কলকাতার মতো আলোর দূষণ নেই এখানে। এই একটা জায়গায় এই শহর এখনো পুরনো আছে।
তিতলি বলেছে কাচের ওপাশ থেকে দেখা নয়, ভিজে অনুভব করা পছন্দ।
এই মেয়ে জীবনকে ভেজা হাতে ধরতে চায়।
সে নিজে কী চায়? এতদিন জানত না। এখন একটু একটু মনে হচ্ছে — সে-ও হয়তো ভিজতে চায়। শুধু সাহস লাগছিল।
বৃষ্টি কি জানত আজ কী হবে?
সে তিতলিকে ভিজিয়ে পাঠিয়েছিল। তিতলি ভিজে এসেছিল। আর সেই ভেজা চুল, সেই ভেজা হাসি, সেই দুহাতে চায়ের কাপ ধরা —
এসব কি বৃষ্টির পরিকল্পনা ছিল?
বোকার মতো চিন্তা।
কিন্তু প্রেমের শুরুতে মানুষ একটু বোকা হয়। এটা স্বাভাবিক। এটা সুন্দর।
✦ তৃতীয় পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
চার নম্বর রবিবার এল। এবার শব্দলোকে নয়। এবার দুজন বেরোল বারাসাতের পুরনো গলিতে — কদমতলা, চাঁপাতলা, পুরনো মাঠ। তিতলি দেখাল তার শহর — তার চোখ দিয়ে। আর অর্ণব বুঝল, একই শহরে থেকেও কতটা আলাদাভাবে দেখা যায়।
অপেক্ষায় থাকুন — চতুর্থ পর্ব: "একই শহর, দুটো চোখ"
বৃষ্টি শুধু মাটি ভেজায় না — মাঝে মাঝে দুটো মনের মাঝের শুকনো মাটিও ভিজিয়ে দেয়। অর্ণব আর তিতলির মাঝের শুকনো জমিতে আজ একটু জল পড়ল। বীজ রোপণের সময় হয়তো এখনো আসেনি। কিন্তু মাটি তৈরি হচ্ছে।
