বারাসাতের নীল আকাশ - দ্বিতীয় পর্ব : শব্দলোকের পুরনো বই আর এক টুকরো মিষ্টি ভালোবাসা
অর্ণব আর তিতলির আবার দেখা হলো পুরনো বইয়ের দোকান শব্দলোকে। বইয়ের গন্ধে ঘেরা এই গল্পে ফুটে উঠেছে এক অদ্ভুত ভালো লাগা আর বন্ধুত্বের এক নতুন অধ্যায়।
Bengali Serial Fiction ✦ দ্বিতীয় পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"বইয়ের গন্ধে ভালোবাসা"

শব্দলোক — যেখানে শব্দ থাকে, লোকের প্রয়োজন নেই
চাঁপাতলার গলিটা অর্ণব চেনে ছোটবেলা থেকে।
এই গলিতে একটা পুরনো বইয়ের দোকান আছে — নাম "শব্দলোক"। দোকানটা এতটাই পুরনো যে দোকানের সামনের সাইনবোর্ডের রং উঠে গেছে অনেকটা, শুধু "শব্দ" অংশটুকু স্পষ্ট দেখা যায়, "লোক" অংশটা প্রায় মিলিয়ে গেছে। কিন্তু এই আধা-মুছে-যাওয়া নামটাই অর্ণবের কাছে বেশি সুন্দর মনে হয়। যেন শব্দেরা আছে, কিন্তু লোকের প্রয়োজন নেই — শব্দ নিজেই একটা জগৎ।
দোকানের মালিক নিতাইদা। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। সারাদিন একটা মোড়ায় বসে থাকেন, হাতে চা, চোখে মোটা কাচের চশমা। কাউকে বই কিনতে দেখলে খুশি হন না বিশেষ — বরং কেউ বই হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলে মুখে একটা তৃপ্তির হাসি আসে তাঁর।
একবার অর্ণব জিজ্ঞেস করেছিল, "নিতাইদা, বই না বিকলে ব্যবসা চলে কী করে?"
"ব্যবসা করতে আসিনি রে। আমি থাকতে আসছি।"
এই কথাটা অর্ণব কখনো ভোলেনি।
সেদিন ছিল রবিবার।
ইন্টারভিউর পর তিনদিন কেটে গেছে। অর্ণব ঘরে বসে ছিল, কিন্তু মনটা ঘরে ছিল না। মনটা ঘুরে বেড়াচ্ছিল — কখনো স্টেশনের বেঞ্চে, কখনো হলুদ মলাটের বইয়ের পাতায়, কখনো সেই সামান্য হাসির কাছে।
এটা কী? ভালো লাগা? না শুধু কৌতূহল?
অর্ণব নিজেই জানে না।
কিন্তু এটুকু জানে — রবিবার সকালে শব্দলোকে না গেলে মনটা আরো অস্থির হয়ে যাবে। বই তার পুরনো ওষুধ। যখনই মনটা গুলিয়ে যায়, একটা পুরনো বইয়ের গন্ধ সব ঠিক করে দেয়।
শব্দলোকে পৌঁছে অর্ণব প্রথমে দেখল নিতাইদাকে। যথারীতি মোড়ায়, যথারীতি চা।
"আয়, আয়," নিতাইদা বললেন। "কদিন আসিসনি?"
"কাজ ছিল।"
"কাজ!" নিতাইদা একটু হাসলেন। "তোর বয়সে কাজ মানে কী বুঝিস? বই পড়, ঘুরে বেড়া, একটু প্রেম-ট্রেম কর। কাজ পরেও হবে।"
অর্ণব হাসল। নিতাইদার কথায় সবসময় একটা দার্শনিক সারল্য থাকে।
সে ভেতরে ঢুকল।
শব্দলোকের ভেতরটা ছোট কিন্তু গভীর। মাথা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত বই। পুরনো কাঠের তাকে, নতুন বইয়ের পাশে পুরনো বই, বাংলার পাশে ইংরেজি, কবিতার পাশে উপন্যাস। কোনো শৃঙ্খলা নেই — অথচ একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে এই বিশৃঙ্খলায়।
এখানে ঢুকলে সময় থমকে যায়। বাইরে পৃথিবী কতটা ব্যস্ত, কতটা কোলাহলময় — ভেতরে ঢুকলে মনে হয় সেসব অন্য কোনো গ্রহের গল্প।
অর্ণব তাকের কাছে গেল। হাত বোলাল বইয়ের পিঠে — একটু যেন আদর করার মতো। এই অভ্যেস তার বহুদিনের। বই হাতে নেওয়ার আগে একটু ছুঁয়ে দেখে, যেন পরিচয় করে নেয়।
তখনই পায়ের শব্দ পেল।
ভেতরে আরো কেউ আছে।
সে মুখ ফেরাল।
তাকের আড়ালে, একটু ভেতরে, মেঝেতে বসে কেউ বই পড়ছে।
অর্ণব এক পা এগোল। তারপর থমকে গেল।
সাদা কুর্তা নেই আজ। আজ হালকা হলুদ রঙের একটা পোশাক। চুলটা আজও এলোমেলো — না, আজ একটু বেশি এলোমেলো। মেঝেতে বসে, হাঁটু ভাঁজ করে, বইটা কোলে রেখে পড়ছে সে। মুখে এমন একটা মনোযোগ, যেন পৃথিবীর আর কিছু নেই।
অর্ণবের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল।
সে চিনতে পারল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে, জানে না। মেয়েটা মুখ তুলল। হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে আছে টের পেল।
তাকাল। এক মুহূর্ত। তারপর একটু অবাক হল। তারপর চিনতে পারল। তারপর সেই হাসিটা এল — ঠিক আগেরবারের মতো, ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁক।
"স্টেশনের ভদ্রলোক।"
"হ্যাঁ।"
"আপনিও বই পড়তে আসেন এখানে?"
"প্রতি রবিবার।"
মেয়েটা একটু ভ্রু তুলল।
"আমিও।"
দুজনেই চুপ করে রইল একটু। এই চুপ করে থাকাটা আজ অন্যরকম — বিব্রত নয়, বরং একটু মজার।
অর্ণব বলল, "আমি কি বসতে পারি? মানে, এখানে অনেকেই মেঝেতে বসে পড়ে। নিতাইদা কিছু বলেন না।"
মেয়েটা পাশে সরে একটু জায়গা করে দিল। অর্ণব বসল।
কাছ থেকে দেখল এবার কী পড়ছে — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "অরণ্যের দিনরাত্রি"।
"সুনীল পড়ছেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"হুম। আগে পড়েছিলাম, আবার পড়ছি।"
"কেন আবার?"
"কারণ প্রথমবার যখন পড়েছিলাম, তখন বনের গল্পটা ভালো লেগেছিল। এখন মনে হচ্ছে এটা আসলে নিজেকে খোঁজার গল্প। মানুষ অরণ্যে যায়, কিন্তু যা খোঁজে সেটা আসলে নিজের ভেতরে।"
অর্ণব মাথা নাড়ল। এই মেয়ে বই পড়ে না — বই অনুভব করে।
"আপনার কথাটা মনে পড়ছে," সে বলল।
"কোন কথা?"
"যে কথা স্টেশনে বলেছিলেন। একই লাইন, অভিজ্ঞতা বদলালে অর্থ বদলায়।"
"আপনি মনে রেখেছেন?"
"হ্যাঁ।"
আর কথা হল না সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু সেই নীরবতায় কেমন একটা উষ্ণতা ছিল।
একটু পরে অর্ণব একটা বই নিল তাক থেকে — বিভূতিভূষণের "আরণ্যক"।
মেয়েটা দেখল। "আরণ্যক? আজ কি সবাই বনেই যাচ্ছে?"
"বিভূতিভূষণের বন অন্যরকম। সুনীলের বনে মানুষ নিজেকে খোঁজে, বিভূতিভূষণের বনে মানুষ প্রকৃতির কাছে ছোট হয়ে যায়। দুটো আলাদা অনুভূতি।"
মেয়েটা অর্ণবের দিকে তাকাল। সরাসরি। এবার তাকানোটা একটু দীর্ঘ।
"আপনি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন?"
"না। ইঞ্জিনিয়ারিং।" অর্ণব একটু হাসল। "কিন্তু পড়াশোনায় মন ছিল সাহিত্যের বইয়ে।"
"বারাসাতের ছেলে?"
"হ্যাঁ। জন্ম থেকে।"
"আমিও।" মেয়েটা বলল। "কদমতলার কাছে বাড়ি।"
অর্ণব চমকে গেল। "সত্যি? আমিও ওদিকে। মানে, কদমতলার পেছনের গলিতে।"
"তাহলে একই পাড়ার মানুষ।"
"হয়তো বহুবার দেখা হয়েছে, জানতামই না।"
কথাটা বলতে গিয়ে অর্ণব নিজেই একটু থমকে গেল। কথাটার মধ্যে একটা বিষণ্ণতা আছে — এত কাছে থেকেও না-জানা।
মেয়েটাও একটু থামল। তারপর —
"আমার নাম তিতলি।"
কথাটা হঠাৎ বলল সে। যেন নিজেই সিদ্ধান্ত নিল।
দুজনেই হাসল।
এই হাসিটা আলাদা। প্রথম দিনের হাসি ছিল অচেনা মানুষের সৌজন্য। আজকের হাসিতে একটু পরিচয় আছে, একটু আরাম আছে।
নিতাইদা এক কাপ চা এনে রাখলেন।
"দুজনে মিলে গল্প করছিস, চা খা।"
অর্ণব অবাক হল। "দুজনের জন্য দুকাপ না?"
"এক কাপই যথেষ্ট। ভাগ করে নিলেই হয়।"
— নিতাইদা বলেই চলে গেলেন।
তিতলি চায়ের কাপটা দেখল। তারপর অর্ণবের দিকে তাকাল। "নিতাইদা বেশ রহস্যময় মানুষ।"
"রহস্যময় না।" অর্ণব বলল। "সরল। আমরাই জটিল।"
"হয়তো।"
সে চায়ের কাপ তুলল। একটু খেল। তারপর অর্ণবের দিকে এগিয়ে দিল।
এই ছোট্ট মুহূর্তটায় কোনো কথা ছিল না। কিন্তু কথার চেয়ে বেশি কিছু ছিল।
সেদিন দুজনে বসে পড়ল — আলাদা বই, কিন্তু একসাথে।
মাঝেমধ্যে কথা হল। তিতলি একটা লাইন পড়ে বলল, "এই লাইনটা শুনুন।"
সে পড়ল — সুনীলের একটা লাইন, যেখানে একজন মানুষ অরণ্যে দাঁড়িয়ে ভাবছে, জীবনে কতকিছু পেতে চেয়েছিল, কতকিছু পায়নি, তবু ভালো আছে।
"কখনো কখনো না-পাওয়াটাও একটা পাওয়া। কারণ না-পেলে খোঁজাটা থাকে। যদি সব পেয়ে যেতাম, তাহলে আর খুঁজতাম না। খোঁজার মধ্যে একটা জীবনীশক্তি আছে।"
তিতলি একটু সময় নিল কথাটা বুঝতে। তারপর মাথা নাড়ল।
"আপনি কী খুঁজছেন?"
সরাসরি প্রশ্ন।
"জানি না ঠিকমতো। কিন্তু মনে হয়," সে একটু থামল, "মনে হয় এমন কিছু যেটা বুকের ভেতর শান্তি দেবে।"
তিতলি বইয়ের দিকে তাকাল। কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখে একটা ভাব ছিল — যেন সে বলতে চাইছে, আমিও।
বেলা গড়িয়ে গেল। রোদ সরে গেল।
শব্দলোকের ভেতরে আলো কমে এল একটু। নিতাইদা একটা পুরনো টেবিল-ল্যাম্প জ্বাললেন। সেই হলদেটে আলোয় ঘরটা আরো উষ্ণ হয়ে গেল।
তিতলি উঠল। "যেতে হবে। মা অপেক্ষা করছেন।"
দুজন বেরোল একসাথে। বাইরে বিকেলের আলো পড়েছে চাঁপাতলার পুরনো দেওয়ালে। একটা কাক ডাকছে দূরে। রাস্তায় সাইকেলের টুং টাং।
দুজন হাঁটতে শুরু করল। পাশাপাশি।
কথা বিশেষ হল না। তবু চুপ করে হাঁটাটা কেমন স্বাভাবিক লাগল দুজনের কাছেই।
পাশাপাশি, বিকেলের আলোয়
কদমতলার মোড়ে এসে তিতলি বলল, "আমার গলি এইদিকে।"
"আমারটা ওইদিকে।"
একটু দাঁড়াল দুজনে।
"পরের রবিবার?" তিতলি বলল। একটু ইতস্তত করে।
অর্ণব হাসল। "শব্দলোকে?"
তিতলি মাথা নাড়ল। হাসল। তারপর হাঁটতে শুরু করল।
অর্ণব দাঁড়িয়ে দেখল — সে চলে যাচ্ছে। সেই হলুদ পোশাকটা একটু হাওয়ায় উড়ছে।
প্রজাপতির মতো।
বাড়ি ফিরে অর্ণব ছাদে গেল।
বারাসাতের সন্ধ্যার আকাশ — ধীরে ধীরে নীল থেকে কমলা হয়, কমলা থেকে বেগুনি, বেগুনি থেকে কালো। প্রতিদিন হয়, তবু প্রতিদিন নতুন।
সে ভাবছিল — দুবার দেখা। দুবার কথা। এখনো অনেক কিছু অজানা।
তবু কেন মনে হচ্ছে, এই মানুষটাকে সে চেনে?
হয়তো কিছু চেনা-জানা কথার আগে থেকেই শুরু হয়। হয়তো আত্মার একটা ভাষা আছে, যেটা নাম জিজ্ঞেস করার আগেই কথা বলে নেয়।
জীবনানন্দ
"সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী — ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।"
বইটা বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল। ঘুম এল।
কিন্তু ঘুমের মধ্যেও একটা হলুদ পোশাক উড়ছিল হাওয়ায়।
✦ দ্বিতীয় পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
পরের রবিবার এল। কিন্তু শব্দলোকে তিতলি এল না। অর্ণব অপেক্ষা করল। সন্ধ্যা হল। তারপর হঠাৎ একটা বৃষ্টি নামল। আর সেই বৃষ্টিতে, কদমতলার মোড়ে, দুজনের আবার দেখা হল — এবার একটু কাছে, একটু বেশি।
অপেক্ষায় থাকুন — তৃতীয় পর্ব: "বৃষ্টি, তুমি কি জানতে?"
বারাসাতের পুরনো গলিতে যে বিকেলের আলো পড়ে, সেই আলোয় সব কিছু একটু সোনালি হয়ে যায় — মানুষ, স্মৃতি, ভালোলাগা। অর্ণব আর তিতলির গল্পও এই আলোর মতোই — ধীরে ধীরে সোনালি হচ্ছে।
