বারাসাতের নীল আকাশ - প্রথম পর্ব : স্টেশনের পুরনো ঘড়ি ও এক প্রেমের উপাখ্যান
বারাসাত স্টেশনের পুরনো প্ল্যাটফর্মে অর্ণব ও এক রহস্যময়ী তরুণীর প্রথম দেখার গল্প। জীবনানন্দ দাশের কবিতার হাত ধরে শুরু হওয়া এক অনন্য প্রেমের উপাখ্যান।
Bengali Serial Fiction ✦ একটি প্রেমের উপাখ্যান
বারাসাতের নীল আকাশ
প্রথম পর্ব
"যেদিন প্রথম দেখা"
বারাসাত স্টেশনের পুরনো ঘড়িটায় সেদিনও বেলা এগারোটা বেজেছিল।
অর্ণব জানত, ঘড়িটা সবসময় পনেরো মিনিট এগিয়ে থাকে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে — ঘড়িটায় যখন এগারোটা বাজে, তখন আসলে পৌনে এগারোটা। তবু কেন জানি, সেই বেমানান ঘড়ির দিকে তাকাতে ভালো লাগত তার। মনে হত, সময়টা যেন নিজেই একটু তাড়াতাড়ি যেতে চাইছে — যেন এই শহরে থাকতে চাইছে না বেশিক্ষণ।
কিন্তু অর্ণব চাইত।
বারাসাত তার কাছে শুধু একটা শহর নয়। এটা তার প্রাণ। কদমতলার মোড়ে বিকেলের আলো যেভাবে পড়ে, চাঁপাতলার গলিতে শীতের সকালে কুয়াশা যেভাবে ঝুলে থাকে — এসব দেখলে বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ব্যাখ্যা করা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।
সেদিন সে এসেছিল ট্রেন ধরবে বলে। কলকাতা যাবে — একটা চাকরির ইন্টারভিউ। পকেটে রেজ্যুমে, মুখে হাসি নেই। সাতাশ বছর বয়সে জীবনটা একটু বেশিই জটিল মনে হচ্ছিল তার।
প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে সে চা খাচ্ছিল। স্টেশনের সেই চা — ঘন, একটু বেশি মিষ্টি, মাটির ভাঁড়ে। এই চায়ের স্বাদ পৃথিবীর কোনো ক্যাফেতে পাওয়া যাবে না, এটা অর্ণব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত।
তখনই সে এল।
মেয়েটা এসে বসলো ঠিক তার পাশের বেঞ্চে। হাতে একটা কালো ব্যাগ, পরনে সাদা কুর্তা আর নীল চুড়িদার। চুলটা একটু এলোমেলো — বাতাসে, না নিজেই এলোমেলো রেখেছে, বোঝার উপায় নেই। কিন্তু সেই এলোমেলো চুলের মধ্যে একটা সৌন্দর্য ছিল, যেটা পরিপাটি করলে হয়তো হারিয়ে যেত।
সে একটা বই বের করল ব্যাগ থেকে।
অর্ণব চোখ সরাতে পারছিল না। শুধু মেয়েটার জন্য নয় — বইটার জন্যও। বইটা ছিল জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র। সেই বিখ্যাত হলুদ মলাটের বই।
বারাসাত স্টেশনে বসে, ট্রেনের অপেক্ষায়, কেউ জীবনানন্দ পড়ছে — এই দৃশ্যটা অর্ণবের কাছে অদ্ভুত রকম পরিচিত লাগল। যেন এই দৃশ্য সে আগেও কোথাও দেখেছে, হয়তো স্বপ্নে।
"বনলতা সেন?"
কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। অর্ণব নিজেও বুঝতে পারেনি কখন বলে ফেলেছে।
মেয়েটা মুখ তুলল। চোখ দুটো — কালো, গভীর, একটু অবাক।
"কী বললেন?"
অর্ণব একটু লজ্জা পেল। "মানে... বইটা। জীবনানন্দ। বনলতা সেন পড়ছেন?"
মেয়েটা একটু হাসল। হাসিটা সামান্য — ঠোঁটের কোণে সামান্য বাঁক। কিন্তু সেই সামান্য হাসিতে অর্ণবের বুকের ভেতর কী হল, সেটা সে নিজেও ঠিকঠাক বলতে পারবে না।
"না, এখন পড়ছি 'আট বছর আগের একদিন'।"
অর্ণব মাথা নাড়ল। "ওটাও অসাধারণ।"
"আপনি পড়েছেন?"
"পড়েছি। অনেকবার।" সে একটু থামল। "তবে প্রতিবার নতুন মনে হয়। যেন প্রতিবার আলাদা কিছু বুঝি।"
"এটাই তো কবিতার বিশেষত্ব। একই লাইন, কিন্তু পাঠকের জীবনের অভিজ্ঞতা বদলালে অর্থও বদলায়।"
অর্ণব অবাক হল। এই কথাটা সে নিজেও মনে মনে বলেছে অনেকবার, কিন্তু এভাবে গুছিয়ে বলতে পারেনি কখনো।
ট্রেন এল না সঙ্গে সঙ্গে।
বারাসাতের ট্রেন মানেই একটু দেরি। এটা এই শহরের স্বভাব। যেন শহরটা নিজেই জানে — তাড়াহুড়োর কিছু নেই, একটু বসো, একটু কথা বলো।
সেদিন সেই দেরিটার জন্য অর্ণব মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়েছিল।
কথা হল। প্রথমে জীবনানন্দ, তারপর রবীন্দ্রনাথ, তারপর কখন যেন বারাসাতের কথা এল। মেয়েটা বলল, সে এখানে বড় হয়েছে, কিন্তু কলকাতায় কাজ করে। প্রতিদিন আপ-ডাউন।
"কী কাজ?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"গ্রাফিক ডিজাইন। একটা ছোট সংস্থায়।"
"পছন্দের কাজ?"
মেয়েটা একটু ভাবল।
"পছন্দের। তবে মাঝেমধ্যে মনে হয় — এই ডিজাইনের ভেতর নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি না। যেন অন্য কারো স্বপ্ন বানিয়ে দিচ্ছি।"
কথাটা অর্ণবের মনে লাগল। "সেটা হয়। আমিও চাকরির ইন্টারভিউতে যাচ্ছি। কিন্তু চাকরিটা আমার না, মনে হচ্ছে।"
"তাহলে যাচ্ছেন কেন?"
"কারণ জীবন। জীবন মানে শুধু নিজের পছন্দ না, একটু বাস্তবতাও।"
মেয়েটা চুপ করে রইল একটু। তারপর বলল, "সত্যি কথা।"
সেই চুপ করে থাকার মধ্যে একটা বোঝাপড়া ছিল। যেটা কথায় বলা যায় না, কিন্তু দুটো মানুষের মধ্যে হয়।
ট্রেন এল।
ভিড় হল। লোকে উঠল, নামল। অর্ণব উঠে গেল। মেয়েটাও উঠল — ভিন্ন দরজা দিয়ে।
ট্রেন ছাড়ার আগে অর্ণব একবার তাকাল। মেয়েটা তখনও বই পড়ছে — বা পড়ার ভান করছে, বোঝার উপায় নেই।
সে নামটাও জিজ্ঞেস করেনি।
মোবাইল নম্বরও নেয়নি।
কলকাতায় ইন্টারভিউ ভালো হল না।
অর্ণব সেটা অবশ্য আশাই করেছিল। ফেরার পথে ট্রেনে বসে সে ভাবছিল — আজকে কী পেলাম? একটা খারাপ ইন্টারভিউ।
কিন্তু মনটা বলছিল, না।
আজকে অন্য কিছু পেয়েছ।
বারাসাত ফেরার পথে, শেষ বিকেলের আলোয়, জানালা দিয়ে মাঠ দেখতে দেখতে অর্ণব ভাবছিল — সেই হলুদ মলাটের বই, সেই সামান্য হাসি, সেই কথা —
"একই লাইন, কিন্তু পাঠকের জীবনের অভিজ্ঞতা বদলালে অর্থও বদলায়।"
হয়তো সেটাই সত্যি। হয়তো আজকে তার জীবনের অভিজ্ঞতায় একটা নতুন লাইন যোগ হল।
বাড়ি ফিরে মা জিজ্ঞেস করলেন, "ইন্টারভিউ কেমন হল?"
"হল না।"
মা একটু চুপ করলেন। তারপর বললেন, "ভাত খেয়ে নে। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"
এটাই বাংলার মা। সান্ত্বনা দেন না, সরাসরি ভালোবাসেন।
অর্ণব বসে খেতে খেতে ভাবছিল — কাল স্টেশনে গেলে কি মেয়েটাকে দেখা যাবে?
যাবে না, এটা সে জানে।
তবু মনটা আঁকড়ে ধরছিল সেই একটুকরো সময়কে।
কদমতলার মোড়ে রাতের আলো জ্বলে উঠল।
বারাসাতে সন্ধ্যা হল।
কিন্তু অর্ণবের মনে, কোথাও একটা —
ভোর হচ্ছিল।
✦ প্রথম পর্বের সমাপ্তি ✦
পরের পর্বে
অর্ণব আবার দেখতে পাবে তাকে। এবার চাঁপাতলার পুরনো বইয়ের দোকানে। এবার নামটা জানা যাবে। এবার কথা আরো গভীর হবে।
পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন — "বারাসাতের নীল আকাশ" — দ্বিতীয় পর্ব: "বইয়ের গন্ধে ভালোবাসা"
পাঠকের কাছে একটি কথা
এই উপন্যাস প্রতিটি পর্বে একটু একটু করে এগোবে — যেমন ভালোবাসা এগোয়। তাড়াহুড়ো নেই। বারাসাতের মতোই — একটু ধীরে, একটু যত্নে।
