বারাসাতের নীল আকাশ - ষোড়শ পর্ব : অর্ণব ও তিতলির ভালোবাসার এক বছর পূর্ণ
বারাসাত স্টেশনের সেই পরিচিত বেঞ্চে এক বছর পর আবার দেখা হলো অর্ণব ও তিতলির। বসন্তের সকালে পুরনো স্মৃতি আর জীবনানন্দ দাশের কবিতার বইয়ে শুরু হলো তাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
ষোড়শ পর্ব — শেষ পর্ব
বারাসাতের নীল আকাশ
"যেখান থেকে শুরু"
— ✦ —বসন্ত আবার এল।

পৃথিবীর এই নিয়মটা বদলায় না।
শীত যায়। বসন্ত আসে। গাছে পাতা আসে। ফুল ফোটে। বাতাসে একটা নতুনের গন্ধ।
বারাসাতে এই বছরের বসন্তটা একটু আলাদা লাগল অর্ণবের।
কারণটা সে জানে।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ
রবিবার। সকাল দশটা।
অর্ণব তৈরি হচ্ছে। মা দেখলেন।
"কোথায়?"
"স্টেশনে।"
মা একটু থামলেন। "স্টেশনে কেন?"
অর্ণব হাসল। "তিতলি বলেছে।"
মা আর জিজ্ঞেস করলেন না। মায়েরা বোঝেন।
স্টেশনে পৌঁছাল। সেই স্টেশন। বারাসাত। প্ল্যাটফর্মের সেই বেঞ্চ। ঠিক এক বছর আগের মতো। বসন্তের বিকেল। কিন্তু এখন সকাল।
তিতলি আগেই এসেছে। সেই বেঞ্চে। বসে আছে। হাতে একটা বই। হলুদ মলাটের।
অর্ণব দেখল। থমকে গেল।
এই দৃশ্যটা। ঠিক এক বছর আগের মতো। সেই বেঞ্চ। সেই মানুষ। সেই বই।
কিন্তু তফাৎ আছে। এবার সে জানে। এবার পরিচিত। এবার নিজের।
এগিয়ে গেল। পাশে বসল। তিতলি বই থেকে মুখ তুলল। হাসল। সেই হাসি। প্রথম দিনের।
"এসেছ।" — "এসেছি।"
"দেরি হয়নি।" — "তুমি আগে।"
"আমি সবসময় আগে।" — "জানি।"
দুজন বসল। সেই বেঞ্চে। পাশাপাশি। প্ল্যাটফর্মে মানুষ। ট্রেন আসছে যাচ্ছে। জীবন চলছে।
তিতলি বইটা রাখল। "দেখো।" অর্ণব দেখল। হলুদ মলাট। জীবনানন্দ দাশ। সেই বই।
"এক বছর আগে এই বই নিয়ে এখানে বসেছিলাম।" তিতলি বলল। তিতলি বইটা অর্ণবের হাতে দিল। "খোলো।"
অর্ণব খুলল। ভেতরে একটা পাতা। হাতে লেখা। তিতলির হাতের লেখা।
"এক বছর আগে এই বেঞ্চে বসেছিলাম একা।
একটা বই হাতে।
মনে কিছু ছিল না।
তারপর কেউ পাশে বসল।
জিজ্ঞেস করল — কী পড়ছেন?
সেই থেকে আর একা নই।
— তিতলি"
অর্ণব পড়ল। আবার পড়ল। বইটা বন্ধ করল। তিতলির দিকে তাকাল।
"এটা লিখলে কখন?" — "গতকাল রাতে।"
"কারণ মনে হল — এই মুহূর্তটার একটা স্মৃতি থাকুক।" তিতলি বলল। "বইয়ের ভেতরে।"
"এই বই কে রাখবে?" — "তুমি।"
"হ্যাঁ।" তিতলি বলল। "এই বইটা তোমার। রাখো।"
অর্ণব বইটা ধরে রইল। হলুদ মলাট। ভেতরে তিতলির হাতের লেখা। এক বছরের গল্প। কয়েকটা লাইনে।
"আজকে কেন আনলাম জানো?" — "কারণ আজকে ঠিক এক বছর।"
"হ্যাঁ।" তিতলি বলল। "আজকের দিনেই প্রথমবার দেখেছিলাম।"
অর্ণব মনে করল। মার্চ। বসন্ত। সেই বিকেল।
"তুমি মনে রেখেছিলে।" — "সবসময় মনে ছিল।"
"আমার সঠিক তারিখটা মনে ছিল না।"
তিতলি হাসল। "আমি মনে রাখি।"
তিতলি বেঞ্চটা দেখল। প্ল্যাটফর্ম দেখল। তারপর বলল, "কারণ সেদিন থেকে জীবনটা বদলে যেতে শুরু করে।"
ট্রেন এল। থামল। মানুষ নামল। উঠল। ট্রেন চলে গেল। দুজন বসে রইল। বেঞ্চে।
তিতলি বলল, "এক বছরে কতটা পথ হেঁটেছি।"
"কারণ সহজ ছিল।" তিতলি বলল। "কারণ সঠিক মানুষের সাথে পথ সহজ হয়ে যায়।"
"তুমি কি আমাকে সঠিক মানুষ মনে করো?"
তিতলি তাকাল। "তুমি কি আমাকে?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে উত্তর পেয়ে গেছ।"
বেলা বাড়ল। স্টেশনে রোদ পড়েছে। বসন্তের রোদ। নরম। সোনালি। বেঞ্চে দুজন। পাশাপাশি। হাতে হাত।
শব্দলোক
তিতলি বলল, "শব্দলোকে যাবে?" উঠল দুজন। বেঞ্চ থেকে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে। বারাসাতের রাস্তায়। বসন্তের সকাল। রোদ। বাতাস। ফুলের গন্ধ।
শব্দলোকে এল। নিতাইদা ছিলেন। দেখলেন। হাসলেন। "আয়।" ভেতরে গেল। সেই ছোট্ট পেছনের ঘর। দুটো চেয়ার। বসল। নিতাইদা চা দিলেন। বললেন কিছু না। শুধু চায়ের কাপ রেখে গেলেন। দরজা ভেজিয়ে।
চা হাতে। তিতলি বলল, "নিতাইদা কখনো প্রশ্ন করেন না।" — "করেন না।"
"কিন্তু সব জানেন।" — "জানেন।"
"কীভাবে?"
অর্ণব হাসল। "কারণ বই পড়েন। বই পড়া মানুষ মানুষ পড়তে পারেন।"
চা শেষ। বই দেখল দুজন। একটা বই তুলল তিতলি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
"কোন অংশটা?" — "যেখানে বলেছেন — প্রেম একটা শিক্ষা। শেখার শেষ নেই।"
"এক বছরে তুমি কী শিখলে?"
অর্ণব ভাবল। "শিখলাম — দেখতে। ছোট ছোট জিনিস। দেওয়ালের রং। বাচ্চার হাসি। বৃষ্টির পরের মাটির গন্ধ। পুরনো বাড়ির গল্প।"
"আর শিখলাম — থাকতে। মুহূর্তে থাকতে।"
"তুমি কী শিখলে?"
"শিখলাম — বলতে। যা মনে আসে। তোমার কারণে। তুমি শোনো। তাই বলতে ইচ্ছে করে।"
বেলা বাড়ল। শব্দলোক থেকে বেরোল। নিতাইদা বললেন, "আজ বেশি ঘুরবে?" "হ্যাঁ।"
"ভালো। রবিবার ঘোরার দিন।" নিতাইদা হাসলেন। "এই দোকানটা সেই গল্পগুলো দেখে।"
"নিতাইদা, আপনার নিজের গল্পটা কী?"
নিতাইদা একটু থামলেন। হাসলেন। "সেটা অন্য একদিন। আজ তোমাদের দিন। যাও।"
বারাসাতের রাস্তায়
হাঁটল। বারাসাতের রাস্তায়। চাঁপাতলা। কদমতলা। পুরনো বাড়ির গলি।
তিতলি বলল, "দেখো।" একটা পুরনো বাড়ির দেওয়াল। রং উঠে গেছে। কিন্তু রঙের আস্তরণে একটা সৌন্দর্য। "এটা আঁকব।" তিতলি বলল। মোবাইল বের করল। ছবি তুলল।
"তুমি সবখানে ছবি তোলো।" — "হ্যাঁ।"
"কবে সব আঁকবে?" — "সারাজীবন।"
ইছামতীর পাড়
তারপর তারা ট্রেন ধরে ইছামতীর দিকে গেল। নদীর পাড়। বসন্তের নদী। জল কম। কিন্তু আছে। চলছে। তিতলি বসল পাথরে। পা ঝুলিয়ে। অর্ণবও। নদীর দিকে তাকিয়ে।

তিতলি একটা পাথর তুলল। ছুঁড়ল। জলে। ঢেউ উঠল। ছোট। কিন্তু দূর পর্যন্ত গেল।
"সেদিনের ছোট্ট দেখা — ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে গেছে। দুটো জীবনে। দুটো পরিবারে। শহরের এই পাড়ে।"
অর্ণব চুপ করে রইল। তারপর বলল, "তুমি কবিতার মতো কথা বলো।" তিতলি হাসল। "তোমার প্রভাব।"
শিমুলগাছের মাঠ
বিকেলে শিমুলগাছের মাঠে। গাছে ফুল ফুটেছে। লাল। বসন্তের শিমুল। পড়ছে মাটিতে। লাল গালিচা।
তিতলি দেখল। "বাহ।" ছবি তুলল। তারপর গাছের নিচে বসল। লাল ফুলের মাঝে। অর্ণব পাশে।
"বাবাকে বলেছি।" — "কী বলেছ?"
"সব। তুমি লেখো। প্রদর্শনী হয়েছে। দুই পরিবার বসেছে।"
"বাবা কী বললেন?"
"বললেন — ছেলেটার চোখ সৎ। তার কাছে থাকলে ভালো থাকবি।"
অর্ণব চুপ করে রইল। বাবার কথাটা। এই গাছের নিচে। লাল ফুলের মাঝে।
"তোমার বাবাকে কখনো কৃতজ্ঞতা জানানো হবে না। কারণ এত বড় কথা — শোধ দেওয়া যায় না।"
তিতলি হাসল। "শোধ দিতে হয় না। শুধু সুখী থাকতে হয়।"
সন্ধ্যায় ছাদে
সন্ধ্যায় ছাদে। অর্ণবের বাড়ির। বসন্তের সন্ধ্যা। আকাশে রং। কমলা। গোলাপি। বেগুনি।

"এই রংটা শুধু দেখার। আঁকলে কিছুটা হারায়।" — "কী হারায়?" — "অনুভূতিটা।"
অর্ণব আকাশ দেখল। "লিখলেও তাই। কিছু জিনিস লিখলে হারায়। তাহলে শুধু দেখতে হয়। অনুভব করতে হয়।"
পাশের বাড়ির কাকুর রেডিও। প্রতি সন্ধ্যার মতো। রবীন্দ্রনাথ।
"আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ-ধুলার তলে..."
"এই কাকুকে দেখতে ইচ্ছে করছে।" তিতলি বলল। "কারণ প্রতি সন্ধ্যায় একই নিয়ম। এই মানুষের জীবনটা কেমন?"
"একদিন দেখাব।" অর্ণব বলল। "এই শহরটা একসাথে আমাদের।"
রাতের আকাশ
রাত নামল। তারা উঠল। ছাদে দুজন। বারাসাতের রাতের আকাশের নিচে।
"তৃতীয় গল্পটা শুরু করেছ?" — "শুরু করেছি।" — "কীসের গল্প?"
"এই শহরের। বারাসাতের। একটা শহরের গল্প। যে শহরে দুটো মানুষ থাকে। শহরটা তাদের চেনে। ভালোবাসে।"
"আমি আছি?" — "প্রথম পাতায়।"
"এই শহরে একটা স্টেশন আছে।
স্টেশনে একটা বেঞ্চ।
সেই বেঞ্চে একদিন বসেছিল একটা মেয়ে।
হলুদ মলাটের বই হাতে।
সেই মেয়েটাকে দেখে একটা ছেলে বুঝেছিল —
জীবনটা আসলে এত ছোট নয়।
যতটা ভাবা হয়।"
নীরবতা। বারাসাতের রাত। তারা। বাতাস। তিতলির চোখে জল।
"কাঁদছ?" — "একটু।" — "কেন?"
"কারণ তুমি আমাকে গল্পে রেখেছ। প্রথম পাতায়।"
"সবসময় থাকবে।" — "সব গল্পে?" — "সব গল্পে।"
তিতলি হাসল। ভেজা চোখে। "তাহলে আমি অমর।"
অর্ণব হাসল। "হ্যাঁ। আমার লেখায়।"
"এই এক বছরে — সব মুহূর্ত — সব কথা — সব হাসি — সব বৃষ্টি — সব ছাদ — সব চা — সব বিদায়— এগুলো মনে থাকবে?"
"সারাজীবন।" — "নিশ্চিত?" — "নিশ্চিত।"
অর্ণব বলল। "কারণ এগুলো সত্যি ছিল। সত্যি জিনিস ভুলা যায় না।"
আকাশের দিকে তাকাল দুজন। তারা। বারাসাতের নীল আকাশ। রাতে নীল নয়। কালো। কিন্তু তারায় ভরা। প্রতিটা তারা একটা আলো। ছোট। কিন্তু আছে। এই আলোগুলো মিলিয়ে পুরো আকাশ।
"মনে হয় — আমরা কত ছোট। কিন্তু সেটা খারাপ লাগে না। কারণ ছোট হলেও — এই মুহূর্তটা আছে। এই ছাদটা আছে। তুমি আছ। এটুকুই যথেষ্ট।"
অর্ণব চুপ করে রইল। তারপর বলল, "হ্যাঁ।" শুধু এটুকু।
নিচ থেকে মা ডাকলেন। "খাবার হয়ে গেছে।" দুজন হাসল। "আসছি।"
তিতলি আকাশের দিকে শেষবার তাকাল। অর্ণব ডায়েরি বের করল। লিখল। তৃতীয় গল্পের পরের কয়েকটা লাইন।
"এই শহরে একটা স্টেশন আছে।
স্টেশনে একটা বেঞ্চ।
সেই বেঞ্চে একদিন বসেছিল একটা মেয়ে।
হলুদ মলাটের বই হাতে।
সেই মেয়েটাকে দেখে একটা ছেলে বুঝেছিল —
জীবনটা আসলে এত ছোট নয়।
যতটা ভাবা হয়।
এবং জীবন আরো সুন্দর হয় —
যখন কেউ পাশে থাকে।
হাতে হাত।
বারাসাতের নীল আকাশের নিচে।"
তিতলি পড়ল। চুপ করে রইল। তারপর বলল, "এই গল্পটা শেষ করো।" — "করব।" — "কতদিনে?"
"সারাজীবন লাগতে পারে। কারণ এই গল্প চলছে। এখনো শেষ হয়নি।" — "কখন শেষ হবে?"
অর্ণব তিতলির দিকে তাকাল। "শেষ হবে না।"
নিচে নামল। মা অপেক্ষা করছেন। খাবার টেবিলে। তিতলি বসল। মায়ের পাশে।
"মাসিমা, আপনার রান্না খেলে মনে হয় বাড়িতে আছি।"
মা হাসলেন। হাত রাখলেন তিতলির মাথায়। "এটাই তোমার বাড়ি।"
খাওয়া হল। যাওয়ার সময়। মা বললেন, "সাবধানে যেও।" বাবা বললেন, "ভালো থেকো।"
কদমতলার মোড়
রাস্তায়। দুজন। কদমতলার মোড়ে।
"আজকে দিনটা ভালো ছিল।" — "হ্যাঁ।"
"পুরো বছরটাই ভালো।" — "হ্যাঁ।"
"পরের বছর?" — "আরো ভালো।"
"প্রতিবার বলো।" — "কারণ প্রতিবার সত্যি হয়।"
"এই এক বছরে তুমি আমাকে একটা জিনিস দিয়েছ।" — "কী?"
"নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছ।"
"আর আমাকে দিয়েছ," অর্ণব বলল, "পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখতে।"
তিতলি হাসল। "মিলে গেল।" — "সবসময় মেলে।"
তিতলি ঘুরল। যাবে। কিন্তু একটু থামল।
"তৃতীয় গল্পটার নাম কী রাখবে?" — "জানি না এখনো।" — "আমি বলব?"
"বারাসাতের নীল আকাশ।"
অর্ণব থমকে গেল। "এই নামটা?" — "হ্যাঁ।" — "কেন?"
"কারণ এই গল্পটা এই শহরের। এই আকাশের নিচে শুরু হয়েছিল। এই আকাশের নিচেই চলছে।"
অর্ণব আকাশের দিকে তাকাল। রাতের আকাশ। তারায় ভরা। বারাসাতের।
"বারাসাতের নীল আকাশ।" উচ্চারণ করল। মুখে। আস্তে। যেন পরখ করছে।
"ভালো।" সে বলল। তিতলি হাসল। "রাখো।" — "রাখব।"
তিতলি চলে গেল। গলিতে ঢুকল। মোড়ে দাঁড়িয়ে অর্ণব দেখল। শেষবার ঘুরল তিতলি। হাত নাড়ল। অর্ণবও নাড়ল। তারপর অদৃশ্য।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল। কদমতলার মোড়ে। বসন্তের রাতে। একা। কিন্তু একা নয়।
ডায়েরি বের করল। কলম বের করল। লিখল। তৃতীয় গল্পের পরের লাইন।
এই গল্পের কোনো শেষ নেই।
কারণ জীবনের গল্প শেষ হয় না।
শুধু নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
বারাসাতে।
একটা স্টেশনের বেঞ্চে।
একটা শব্দলোকে।
একটা নদীর পাড়ে।
একটা শিমুলগাছের নিচে।
একটা ছাদে।
দুটো হাত।
একটা আকাশ।
সারাজীবন।
— বারাসাতের নীল আকাশের নিচে লেখা।
পাশের বাড়ির কাকুর রেডিও বন্ধ হয়ে গেছে। রাত গভীর। বারাসাত ঘুমিয়ে পড়ছে। কিন্তু কোথাও কোথাও আলো। জানালায়। কেউ জেগে আছে। হয়তো লিখছে। হয়তো আঁকছে। হয়তো ভাবছে। হয়তো ভালোবাসছে।
মোবাইলে মেসেজ। তিতলির।
"বাড়ি পৌঁছেছি।" — "ভালো।"
"আজকের দিনটা মনে থাকবে।" — "সারাজীবন।" — "হ্যাঁ।"
"অর্ণব।" — "হুম।"
"গল্পটা লিখো।" — "লিখছি।"
"শেষ করো না।" — "কেন?"
"কারণ গল্প শেষ হলে — আমরাও শেষ হয়ে যাব।"
অর্ণব লিখল — "গল্প শেষ হবে না। আমরাও না।"
"Promise?" — "Promise."
"শুভরাত্রি।" — "শুভরাত্রি।"
"অর্ণব।" — "হুম।"
"Love You.."
দুটি শব্দ। সহজ। স্বাভাবিক। তিতলির মতো। "আমিও।"
ফোন রাখল। ছাদে উঠল। শেষবার। আজকের মতো। বারাসাতের রাত। তারা। বাতাস। ফুলের গন্ধ। বসন্তের।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ। ভাবল না। শুধু অনুভব করল।
এই শহর। এই আকাশ। এই রাত। এই জীবন। তিতলি।
তারপর ভেতরে গেল। ঘুমাতে। কিন্তু ঘুমানোর আগে ডায়েরি খুলল। শেষ লাইনটা লিখল। তৃতীয় গল্পের। আজকের মতো।
বারাসাতের নীল আকাশের নিচে
দুটো মানুষ হেঁটে চলে।
হাতে হাত।
কথা নেই।
কিন্তু সব আছে।
এই হাঁটাই গল্প।
এই থাকাই ভালোবাসা।
আর এই শহরই—
বাড়ি।"
কলম রাখল। বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করল। মুখে একটা হাসি।
বাইরে বারাসাত। ঘুমিয়ে। কিন্তু স্বপ্ন দেখছে। সবসময়ের মতো।
✦ সমাপ্তি ✦
"বারাসাতের নীল আকাশ"
— সম্পূর্ণ —
অর্ণব আর তিতলির গল্প এখানেই শেষ নয়।
কারণ কিছু গল্প শেষ হয় না।
শুধু বই বন্ধ হয়।
পাঠক উঠে যায়।
কিন্তু চরিত্ররা থাকে।
বারাসাতের সেই স্টেশনে।
শব্দলোকে।
কদমতলার মোড়ে।
শিমুলগাছের নিচে।
ইছামতীর পাড়ে।
ছাদে।
নীল আকাশের নিচে।
সারাজীবন।
এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হল—
তাদের জন্য যারা একদিন কোনো স্টেশনে বসে ছিল।
একা।
একটা বই হাতে।
আর অপ্রত্যাশিতভাবে কেউ পাশে বসেছিল।
সেই থেকে আর একা নয়।
