By Ziya Pub Mar 24 Upd Mar 24

বারাসাতের নীল আকাশ - দশম পর্ব : অর্ণবের বাড়িতে তিতলির প্রথম পদার্পণ ও পারিবারিক আড্ডা

বারাসাতের নীল আকাশ সিরিজের দশম পর্বে অর্ণবের বাড়িতে তিতলির প্রথম আগমন। মায়ের হাতের ইলিশ মাছ আর আলুপোস্তোর গন্ধে ভরা এক সুন্দর রবিবারের পারিবারিক গল্পের স্বাদ নিন এই পর্বে।

বারাসাতের নীল আকাশ - দশম পর্ব : অর্ণবের বাড়িতে তিতলির প্রথম পদার্পণ ও পারিবারিক আড্ডা

Bengali Serial Fiction  ✦  দশম পর্ব

বারাসাতের নীল আকাশ

"ছাদের আকাশ"

 

গ্রীষ্ম এলে বারাসাত অন্যরকম হয়।

দুপুরবেলা রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ ঘরে ঢোকে। দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক নামে। কুকুরেরা ছায়া খোঁজে। কাক ডাকে — কিন্তু সেই ডাকেও একটা ক্লান্তি।

কিন্তু সন্ধ্যায় বারাসাত আবার জেগে ওঠে।

ছাদে ছাদে মানুষ বেরোয়। বাতাস আসে — তবু গরম। পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা জমে। চায়ের দোকানে ভিড় বাড়ে।

বারাসাতের সন্ধ্যা সারা বছরই সুন্দর।

কিন্তু গ্রীষ্মের সন্ধ্যা আলাদা — একটু বেশি আপন, একটু বেশি নিজের।


মে মাসের শুরু।

অর্ণব অফিস থেকে ফিরে মাকে বলল, "মা, একটা কথা আছে।" মা রান্নাঘরে। আলু কাটছেন।

"বলো।"    "তিতলিকে একদিন বাড়িতে আনতে চাই।"

মা থামলেন। ছুরি রাখলেন। ঘুরলেন। অর্ণবকে দেখলেন।

"কবে আনবি?"    "রবিবার?"

"রবিবার আমি ভালো রান্না করব। কী খায় মেয়েটা?"    "জানি না।"    "জিজ্ঞেস করেছিস?"    "না।"

মা একটু হাসলেন। "এত কিছু জানিস, এটা জানিস না?"

"মা—"    "ঠিক আছে। জিজ্ঞেস করে আয়।"

"আর বাবাকে বলিস। বাবা জানেন না এখনো।"

বাবা জানলেন।

সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে। অর্ণব বলল।

"মজুমদার পরিবার?"    "হ্যাঁ।"    "সুরেশ মজুমদারের মেয়ে?"

অর্ণব অবাক হল। "চেনেন?"

"এই শহরে সব চেনা।" বাবা বললেন — ঠিক মায়ের মতো করে।

অর্ণব হাসল।

"কেমন মেয়ে?"    অর্ণব একটু ভাবল।

"ভালো।"    "ভালো মানে?"

"মানে সত্যিকারের ভালো। সরাসরি কথা বলে। সৎ। বই পড়ে। ছবি আঁকে। আর—"

"আর?"    "আর আমাকে দিয়ে লেখায়।"

"মানে?"    "মানে তার সাথে থাকলে লিখতে ইচ্ছে করে। এতদিন লিখতে পারিনি। এখন পারি।"

বাবা চুপ করে রইলেন। চায়ে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন —

"রবিবার আনো।"

শুক্রবার রাতে তিতলিকে বলল।

"রবিবার আমাদের বাড়িতে আসবে?"    "হঠাৎ?"    "হঠাৎ নয়। মা বললেন আনতে।"

"তোমার মা জানেন?"    "জানেন।"    "বাবা?"    "জানেন।"

"আমার একটু ভয় লাগছে।"

"তোমার বাড়িতে আমি গিয়েছিলাম। তোমার বাবার সামনে পড়েছিলাম।"    "তখন তুমি ভয় পাওনি?"    "পেয়েছিলাম। কিন্তু করেছিলাম।"

তিতলি হাসল। "ঠিক আছে। আসব।"

"কী খাও বলো। মা জিজ্ঞেস করেছেন।"    "মা জিজ্ঞেস করেছেন?"    "হ্যাঁ।"

"সব খাই।"    "সত্যি?"    "সত্যি। একটাই শর্ত।"

"মায়ের হাতের রান্না হতে হবে। হোটেলের না।"

অর্ণব হাসল। "সেটাই হবে।"

"মাছ রাঁধব। ইলিশ পাওয়া যাবে এখন?"    "পাওয়া যাবে।"

"আলুপোস্তো থাকবে। আর মিষ্টি।"    "মা, এত?"

"মেয়ে আসছে। এটুকু তো হবে।"

মায়েরা এরকমই।

কেউ আসলে খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে ভালোবাসেন।


রবিবার। সকাল থেকে বাড়িতে রান্নার গন্ধ।

মা ভোর থেকে উঠেছেন। বাবা বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন — কিন্তু মাঝে মাঝে ভেতরে উঁকি দিচ্ছেন।

সকালের মেসেজ

"কটায় বেরোচ্ছ?"    "এগারোটায়।"    "ঠিক আছে।"

"তোমার মা কেমন মানুষ?"

"আমার মায়ের মতো। মানে — সব বোঝেন, সব জানেন, কিছু বলেন না। শুধু খাওয়ান।"

"আমার মায়ের মতোই।"    "তাহলে মিলে যাবে।"

এগারোটা পঁচিশে তিতলি এল।

আজকের পোশাক — হালকা গোলাপি সালোয়ার। চুল বাঁধা। হাতে একটা মিষ্টির বাক্স। "আমিও মিষ্টি এনেছি।" সে বলল। একটু হেসে।

মা বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। তিতলি প্রণাম করল। মা হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন।

"এসো মা। বসো।"

এই একটা "মা" ডাকে তিতলির মুখে কী একটা হল। অর্ণব দেখল।

বসার ঘরে বসল। বাবা এলেন।

"কী পড়েছ?"    "গ্রাফিক ডিজাইন। কলকাতায়।"

"কাজ করো?"    "হ্যাঁ। একটা সংস্থায়।"    "ভালো লাগে কাজটা?"

তিতলি একটু ভাবল। "লাগে। তবে নিজের কিছু করতে চাই।"

"কী করতে চাও?"    "ছবির প্রদর্শনী। নিজের আঁকা।"

বাবা মাথা নাড়লেন। "ভালো। নিজের স্বপ্ন থাকা উচিত।"

তিতলি একটু অবাক হল — এত সহজে বললেন।

"আপনি কি স্বপ্নে বিশ্বাস করেন?"

"আমি শিক্ষক ছিলাম। শিক্ষকরা স্বপ্নে বিশ্বাস না করলে পড়াবে কী?"

তিতলি হাসল। অর্ণব দেখল। বাবার সাথে তিতলির কথা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে। যেন পরিচিত।


বসার ঘরে — দুই প্রজন্মের কথা

খাবার সময় হল।

মা খাবার দিলেন।

ইলিশ মাছের ঝোল। আলুপোস্তো। ডাল। শাকভাজা। ভাত।

"এত রান্না করেছেন!"    "তুমি এলে।" মা বললেন। "বসো।"

খেতে বসল সবাই। তিতলি একটু খেল। তারপর বলল —

"মাসিমা, ইলিশটা অসাধারণ হয়েছে।"

মা খুশি হলেন। "খাও। আরো নাও।"    "পারব না। পেট ভরে যাবে।"    "পেট ভরলে ক্ষতি নেই।"

অর্ণবের দিকে একবার তাকাল। অর্ণব চোখ দিয়ে বলল — বলেছিলাম না? তিতলি চোখ দিয়ে বলল — হ্যাঁ।

খাওয়া শেষ। মিষ্টি। মা আর তিতলির মিষ্টি মিলিয়ে অনেক।

"দুটো দোকানের মিষ্টি একসাথে।"    "কোনটা ভালো?"    "দুটোই।"

"আপনি সমান ভাগ করলেন।"

"শিক্ষক তো। পক্ষপাত করতে শেখাননি।"


দুপুরে একটু বিশ্রাম।

"তোমার মা অনেক ভালো।"    "বললাম না?"    "বললে। কিন্তু না দেখলে বোঝা যায় না।"

"কী দেখলে?"    তিতলি একটু ভাবল।

"দেখলাম — মা তোমাকে দেখেন। মানে সত্যিকারের দেখেন। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে একবার তোমার দিকে তাকালেন — যেন দেখলেন ছেলে ঠিকঠাক আছে কিনা।"

অর্ণব চুপ করে রইল। "এটা লক্ষ্য করেছ?"    "করি। আমি মানুষ দেখি।"    "ছবি আঁক তো।"    "হ্যাঁ। তাই।"

"তোমার মাকে আঁকতে ইচ্ছে করছে।"    "সত্যি?"

"হ্যাঁ। ওই মুখটা — রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ছেলেকে দেখার মুখটা — সেটা আঁকতে ইচ্ছে করছে।"

অর্ণব কিছু বলল না। কিন্তু মনে মনে ভাবল — এই মেয়েটা অন্যরকম। অন্যরকম দেখে।

বিকেলে মা বললেন, "ছাদে যাও। বাতাস আছে।"

"তুমিও এসো মাসিমা।" তিতলি বলল। "না না। তোমরা যাও। আমি চা বানাই।"


ছাদের আকাশ — সন্ধ্যার কমলা আভায়

পুরনো ছাদ। একটু ঢেউখেলানো। রেলিং-এ মরচে ধরেছে। কিন্তু দৃশ্যটা অসাধারণ।

পশ্চিমে সূর্য নামছে। আকাশে কমলা আভা।

বারাসাতের ছাদে ছাদে মানুষ। দূরে কোথাও কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে।

তিতলি রেলিং ধরে দাঁড়াল। "বাহ।"    "কী?"    "এই দৃশ্য। তুমি প্রতিদিন এটা দেখো?"

"দেখি।"    "কখনো লিখেছ এই দৃশ্য?"    "লেখার চেষ্টা করেছি। ঠিকমতো হয়নি।"

"কেন?"    "কারণ দৃশ্যটা এত বেশি যে কথায় ধরা যায় না।"

তিতলি ছাদের দিকে তাকাল। "আমি একদিন এঁকে দেব।"    "ছাদটা?"    "ছাদটা না।"

"ছাদে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা আকাশ দেখে — তাকে।"

অর্ণব তিতলির দিকে তাকাল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। গোলাপি আলো পড়েছে মুখে। চুলে বাতাস লাগছে।

মা চা নিয়ে এলেন। ছাদে।

দুজন নিল। মা একটু দাঁড়ালেন। আকাশ দেখলেন।

"সন্ধ্যার আকাশটা বারাসাতে সবচেয়ে ভালো।" মা বললেন।

"আমিও তাই বলছিলাম।" তিতলি বলল।

মা তিতলির দিকে তাকালেন। একটু। তারপর হাসলেন।

"তুমি ভালো মেয়ে।"

বলে চলে গেলেন।

তিতলি থমকে গেল। অর্ণব দেখল। "কী হল?" তিতলির চোখ একটু ভিজে গেছে।

"কিছু না।"    "তিতলি।"

"তোমার মা এত সহজে বললেন। 'তুমি ভালো মেয়ে।' — এত সহজে — এত আন্তরিকভাবে।"

"মা এরকমই।"    "ভাগ্য তোমার।"    "তোমারও মা আছেন।"

"আছেন। কিন্তু আরেকজন মা পাওয়া—" থামল। বাকিটা বলল না।

কিন্তু অর্ণব বুঝল।

সন্ধ্যা নামল। আকাশে তারা।

ছাদে দুজন। বারাসাতে আলো জ্বলছে।

দূরে ট্রেনের শব্দ।

"তুমি জানো — আমি এই শহরে বড় হয়েছি, কিন্তু কখনো এই শহরকে এতটা ভালো লাগেনি।"    "কেন এখন লাগছে?"

"কারণ এই শহরে তোমার সাথে হাঁটি। তোমার চোখ দিয়ে দেখি। আর তুমি আমার চোখ দিয়ে।"

"দুটো চোখ মিলে একটা সম্পূর্ণ দেখা।"    "হ্যাঁ।"

নীরবতা। বাতাস আসছে। গরমের বাতাস। তবু ছাদে সহ্য হয়।

"একটা কথা বলব?"    "বলো।"

"আজকে এখানে এসে — মায়ের রান্না খেয়ে — ছাদে দাঁড়িয়ে — মনে হচ্ছে।"    "কী মনে হচ্ছে?"

তিতলি একটু থামল। রেলিং ছেড়ে দিল। অর্ণবের দিকে ঘুরল।

"মনে হচ্ছে — এই বাড়িটা চেনা। এইখানে আগেও এসেছি মনে হচ্ছে।" একটু হাসল। "বোকার মতো শোনাচ্ছে।"

"বোকার মতো নয়।"    "কেন?"

"কারণ কিছু জায়গা আছে যেখানে প্রথমবার গেলেও মনে হয় — এখানে ছিলাম। হয়তো মনের কোথাও এই জায়গাটার ছবি ছিল। বাস্তবে দেখলে মিলে যায়।"

"তুমি কি কখনো সাধারণ কথা বলো?"    "মাঝে মাঝে।"    "কখন?"

"যখন তুমি সাধারণ প্রশ্ন করো।"

"তাহলে আমি অসাধারণ প্রশ্ন করি?"    "করো।"

"তুমি কখনো জিজ্ঞেস করো না — কেমন আছ, কী খেয়েছ। জিজ্ঞেস করো — কী ভাবছ, কী অনুভব করছ।"

"কেমন আছ জিজ্ঞেস করলে উত্তর হয় — ভালো। কিন্তু কী অনুভব করছ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে ভাবতে হয়।"

"ভাবাটা ভালো।"    "হ্যাঁ।"

রাতের তারা ফুটে উঠছে।

"ওইটা।" তিতলি একটা তারা দেখাল। "কোনটা?"    "ওই উজ্জ্বল তারাটা।"    "শুকতারা।"

"হ্যাঁ। ছোটবেলায় বাবা বলতেন — শুকতারা দেখে কিছু চাইলে ...।"

অর্ণব তারাটার দিকে তাকাল। "এখন কী চাইতে ইচ্ছে করছে?"

তিতলি কিছু বলল না। অনেকক্ষণ। আকাশ দেখল। তারপর বলল —

"আজকের মতো আরো অনেক দিন।"

নীরবতা। বারাসাতের রাতের আকাশে শুকতারা। গরমের বাতাস। দূরে কোথাও রেডিওতে গান। পুরনো গান। রবীন্দ্রনাথের।

"...তোমার মিলন চাই হে সুন্দর..."

"কে বাজাচ্ছে?"    "পাশের বাড়ির কাকু। প্রতি সন্ধ্যায় রেডিও বাজান।"    "কতদিন?"    "আমার ছোটবেলা থেকে।"

"সেই একই গান?"    "রবীন্দ্রনাথের নানা গান। কিন্তু প্রতি সন্ধ্যায়।"

"কী সুন্দর।" আস্তে বলল। "কী?"    "এই নিয়মটা। প্রতি সন্ধ্যায় গান। বদলায় না।"

"পৃথিবী বদলে যাচ্ছে — কিন্তু কাকুর সন্ধ্যার গান বদলায় না।"

"এইটুকুর মধ্যে একটা গল্প আছে।"    "আছে।"    "লিখবে?"    "ভাবব।"    "ভাবা মানে লেখা হবে।"    "কীভাবে জানলে?"

"কারণ তুমি একবার ভাবলে ছাড়তে পারো না।"    "তোমাকে পড়েছি।"

"পড়েছি — তুমি কোনো কিছু মনে ধরলে সেটা নিয়ে থাকো। যতক্ষণ না বুঝতে পারো।"    "এটা দোষের?"

"না। এটা লেখকের গুণ।"

"এখানে কতক্ষন থাকবে? নিচে এসো। রাতে খেয়ে নেবে।"    "মা, এখনো সন্ধ্যা।"    "সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে। নামো।"

"মাসিমা, এত খাব না।" তিতলি বলল। "আজকে খাও। কাল থেকে কম দেব।"

"কাল থেকে?" তিতলি একটু অবাক।

মা হাসলেন। "মানে — যখনই আসবে।"

তিতলি চুপ করে রইল। তারপর বলল, "আসব।"

মা বললেন, "আসবে।"

দুটো শব্দ। কিন্তু এই দুটো শব্দে একটা ভবিষ্যৎ ছিল।


দরজায় বিদায় — দুই মায়ের আশীর্বাদ

যাওয়ার সময়।

"আবার এসো।" বাবা বললেন। "আসব।" তিতলি বলল।

মা হাতে কিছু দিলেন। কৌটো।

"কী এটা?" তিতলি বলল। "নাড়ু। বানিয়েছিলাম। নিয়ে যাও। মাকে দিও।"

তিতলির চোখ একটু ভিজল।

"মাসিমা—"    "নাও নাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে ভালো লাগবে না।"

"অর্ণব।"

"হুম।"

"তোমার পরিবারকে ধন্যবাদ।"

"কারণ তারা আমাকে নিজের মনে করিয়েছেন। প্রথম দিনেই।"

"মায়ের নাড়ু নিয়েছো?"   

"হ্যাঁ। মাকে দেব। মা বলেন — মায়ের হাতের নাড়ু মানে আশীর্বাদ।"

"এই নাড়ুতে তোমার মায়ের আশীর্বাদ আছে। মাকে দিলে — দুই মায়ের আশীর্বাদ একসাথে হবে।"

"দুই মায়ের আশীর্বাদ।"   

"হ্যাঁ।"   

"এটা কি যথেষ্ট?"

"যথেষ্টের বেশি।"

তিতলি চলে গেল। সে হাঁটছে। হাতে কৌটো। কদমতলার দিকে। মোড়ে পৌঁছে একবার ঘুরল। হাত নাড়ল। অর্ণবও নাড়ল। তারপর সে চলে গেল।

"গেল?"   

"হ্যাঁ।" মা একটু চুপ। তারপর বললেন —

"মেয়েটা ভালো। চোখে একটা সততা আছে। মায়েরা চোখ দেখেন।"

মা উঠলেন। "ঘুমা। কাল কাজ আছে।" চলে গেলেন।

বাবা বললেন, "মা পছন্দ করেছেন।"    "বুঝলাম।"

"মা পছন্দ করলে — বাকিটা সহজ।"

অর্ণব হাসল। "হ্যাঁ।"

রাতে ছাদে। একা।

তারাভরা আকাশ। শুকতারা।

তিতলি বলেছিল — শুকতারা দেখলে 'wish' করতে হয়।

সে 'wish' করল। মনে মনে। একটাই।

বাকি জীবনটা এরকম থাকুক।

এই শহরে। এই ছাদে। এই মানুষগুলো নিয়ে।

আর তিতলিকে নিয়ে।

রাতের মেসেজ

"বাড়ি পৌঁছেছি। মাকে নাড়ু দিলাম। মা জিজ্ঞেস করলেন — কার মায়ের? বললাম। মা হাসলেন। বললেন — ভালো মানুষ।"

"দুই মায়ের আশীর্বাদ।"    "হ্যাঁ।"    "যথেষ্টের বেশি।"    "হ্যাঁ।"

"অর্ণব!"

"হুম।"

"আজকের দিনটা মনে রাখব।"

"কেন?"

"কারণ আজকে একটা কথা বুঝলাম।"

"ভালোবাসা শুধু দুটো মানুষের মধ্যে নয়। দুটো পরিবারের মধ্যেও।"

"এই কথাটা আমার দ্বিতীয় গল্পে থাকবে।"    "রাখো।"   

"রাখব।"

"শুভরাত্রি।"    "শুভরাত্রি।"

ছাদে দাঁড়িয়ে অর্ণব। বারাসাতের রাতের আকাশ। পাশের বাড়ির কাকুর রেডিও বন্ধ হয়ে গেছে। শহর ঘুমিয়ে পড়ছে। কিন্তু শুকতারা জেগে আছে।

মনে পড়ল তিতলির কথা।

আজকের মতো আরো অনেক দিন।

সেই ইচ্ছেটা।

সেটাই তার ইচ্ছে। একই।

✦ দশম পর্বের সমাপ্তি ✦

পরের পর্বে

গ্রীষ্ম যাচ্ছে। বর্ষা আসছে। বারাসাতে প্রথম বৃষ্টি নামল। আর সেই বৃষ্টিতে একটা অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত — অর্ণব তিতলিকে একটা কথা বলল। যেটা এতদিন শুধু মনে ছিল। কখনো মুখে আসেনি। এবার এল। সহজভাবে। স্বাভাবিকভাবে। যেভাবে বৃষ্টি আসে।

অপেক্ষায় থাকুন — একাদশ পর্ব: "প্রথম বৃষ্টির কথা"

ভালোবাসা একটা পরিবার থেকে আরেকটা পরিবারে পৌঁছায় — যখন দুটো মানুষ একে অপরকে সত্যিকারের বোঝে। আজকে অর্ণবের মা নাড়ু দিলেন। তিতলির মা পেলেন। দুই মায়ের মধ্যে একটা সেতু তৈরি হল। এই সেতু শব্দে তৈরি নয় — তৈরি হয়েছে নাড়ুতে, আশীর্বাদে, হাসিতে। বারাসাতে এরকমই হয়। সহজে। আন্তরিকভাবে।

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →