By Sahidur Pub Mar 28 Upd Mar 30

ধান্যকুড়িয়া ভ্রমণ: ব্যর্থ পরিকল্পনার সফল বেড়ানো

জীবনের সব পরিকল্পনা সফল হয় না, কিন্তু কিছু ব্যর্থতা আমাদের নিয়ে যায় সুন্দর গন্তব্যে। বন্ধুদের সাথে ধান্যকুড়িয়া এক অপ্রত্যাশিত ভ্রমণের গল্প নিয়ে সাজানো।

ধান্যকুড়িয়া ভ্রমণ: ব্যর্থ পরিকল্পনার সফল বেড়ানো
ভ্রমণ · ইতিহাস · বন্ধুত্ব

ব্যর্থ পরিকল্পনার সফল বেড়ানো

ধান্যকুড়িয়া  ·  উত্তর ২৪ পরগনা  ·  একটি অপ্রত্যাশিত দিন

তিনটি ছোট্ট পরিবার  ·  "বেড়ো"দের দল  ·  ২২ মার্চ ২০২৬

কোনো কোনো দিন হঠাৎ করেই সুন্দর হয়ে ওঠে — পরিকল্পনার জোরে নয়, বরং পরিকল্পনার ব্যর্থতার গুণে। জীবনের এই বিচিত্র নিয়মটা আমরা বুদ্ধিতে জানি, কিন্তু অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি কদাচিৎ। সেদিন — ২২শে মার্চ, ২০২৬ — সেই বিরল অভিজ্ঞতাটাই হলো আমাদের। চারটি পরিকল্পনা একে একে ভেঙে পড়েছিল, আর তাদের ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে হেঁটে আমরা পৌঁছলাম এমন একটি জায়গায়, যেটার কথা আগের দিন সন্ধ্যার আগে কেউ ভাবেওনি।


আমরা "বেড়ো" — এবং এর কোনো ব্যাখ্যা নেই

আমরা নিজেদের "বেড়ো" বলি। কেন "বেড়ো"? — সেটার কোনো সাহিত্যিক ব্যাখ্যা নেই, অভিধানে সংজ্ঞা নেই। কিন্তু এই শব্দটা উচ্চারণ করলে বুকের ভেতরে যে হালকা উষ্ণতা জ্বলে ওঠে, সেটাই আমাদের দলের আসল পরিচয়।

আসলে এটা ছেলেদের একটি পুরনো বন্ধুর দল — ক্লাস ফাইভ থেকে একসাথে বড় হওয়া কয়েকজন। ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে যদি বড় হয়েও বন্ধুত্ব অটুট থাকে, তাহলে এই ব্যস্ততার জীবনে সেটা এক প্রকার আশীর্বাদ। এখন সবাই বিবাহিত, সংসারী — তাই দলটাও ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আংশিকভাবে পারিবারিক। বউয়েরা এসেছে, বাচ্চারা এসেছে, আড্ডার ভাষাটা একটু বদলেছে — কিন্তু মূল সুরটা একই আছে।

আমাদের WhatsApp গ্রুপের নাম "Team of Bero's" — সেই গ্রুপে রোজকার গল্প হয়, রাজনীতি থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত তর্ক হয়, ভবিষ্যতের নানা পরিকল্পনা তৈরি হয় আর ভেঙেও যায়। মাঝে মাঝে — মাঝে মাঝে — সত্যিই বেরিয়ে পড়া হয়। সেদিন ছিল সেই বিরল "মাঝে মাঝে"র একটি দিন।


পরিকল্পনার উত্থান-পতন — একটি WhatsApp মহাকাব্য

শুরুটা হয়েছিল ঈদের দিন দুপুরে। সবাই আলমের বাড়িতে জমায়েত হয়েছিলাম। আলম সদ্য বিবাহিত — দাম্পত্য জীবন তখন শরতের নীল আকাশ, আর সেই আকাশে মেঘের মতো উড়তে ইচ্ছা হবেই। তাই সেই নীল আকাশ থেকেই প্রথম প্রস্তাব এলো — "কাল সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়?" সকলে সমর্থন জানাল।

রাত সাড়ে সাতটায় গ্রুপে মেসেজ পড়ল — "কাল কোথায় বেরোবি?" প্রথমে নীরবতা। সেই নীরবতা যে অনীহার নয়, বরং গভীর ভাবনার — সেটা বোঝা গেল কিছুক্ষণ পরেই। এরপর যা হলো, সেটাকে বলা যায় আমাদের দলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে নাটকীয় পরিকল্পনা অধিবেশন।

প্রথম স্বপ্ন — মৌসুমী দ্বীপ। সমুদ্র, বালি, নির্জনতা — শুনতেই মন ভালো হয়ে যায়। বঙ্গোপসাগরের কোলে সেই দ্বীপটির কথা উঠতেই গ্রুপে একটা উত্তেজনার ঢেউ এলো। কিন্তু মৌসুমী দ্বীপ মানে কম করেও দুই দিনের ব্যাপার। দলে ছোট বাচ্চা আছে, সবার ব্যস্ত জীবন — দুই দিনের ছুটি বের করা তখন সম্ভব ছিল না। এই স্বপ্ন তাই তোলা রইল ভবিষ্যতের জন্য, অনির্দিষ্টকালের জন্য।

(পড়ুন: কোনোদিন হবে না।)

দ্বিতীয় স্বপ্ন — ইকো পার্ক। কলকাতার কাছে, যাতায়াত সহজ, বাচ্চাদের জন্যও ভালো — কাগজে-কলমে নিখুঁত পরিকল্পনা। কিন্তু সেদিনটা ছিল ঈদের পরের দিন। ঈদের ছুটিতে ইকো পার্কে যাওয়া মানে সেখানে গিয়ে মানুষের মাথা গোনা, গলাগলি ভিড়ে দম বন্ধ হওয়া। বেড়াতে যাওয়া আর জনস্রোতে ভেসে যাওয়া এক জিনিস নয় — এই মত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো। বাদ।

তৃতীয় স্বপ্ন — টাকি। নদীর ধার, মিনি সুন্দরবন, কাশবন — নামটা উঠতেই যেন কানে হাওয়ার শব্দ এলো। অসাধারণ জায়গা, সন্দেহ নেই। কিন্তু দূরত্বটা একটু বেশি হয়ে গেল ছোট বাচ্চা নিয়ে এক দিনের ট্রিপের জন্য। এই পর্যায়ে জসিম — দলের সবচেয়ে বাস্তববাদী এবং সবচেয়ে গম্ভীর মানুষটি, যে নিজে গম্ভীর হয়েও সবাইকে হাসানোর চেষ্টা করে — লিখল: "চল বিকেলে খারিবাড়ি গিয়ে চা খেয়ে আসি।" ছোট্ট এই মেসেজটা গ্রুপের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করল, কিন্তু বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষাটা থামাতে পারল না।

চতুর্থ স্বপ্ন — মুক্তারপুর নদীর ধার। নদী আছে, পরিচিত পথ আছে, ঝামেলা কম। কিন্তু এটা আমাদের পুরনো চেনা জায়গা — বহুবার যাওয়া, বহুবার দেখা। নতুনত্ব নেই, অজানার টান নেই। তাই এটাও বাদ।

এই দেওয়া-নেওয়ার মাঝেই কেউ একজন বলল — ধন্যকুরিয়াতে একটা পার্ক হয়েছে, সত্যজিৎ পার্ক। রাজবাড়ি আছে, বিদ্যাধরী নদী আছে, কলকাতা থেকে খুব বেশি দূর নয়। নামটা অনেকের কাছেই নতুন। অজানা জায়গার নাম শুনলে বেড়োদের মনে যে কৌতূহলের আলো জ্বলে, সেটা জ্বলল। অনলাইন রেটিং দেখা হলো। গ্রুপে পোল হলো — ভোট পড়ল পক্ষে। সিদ্ধান্ত হলো। সকাল সকাল রওনা দেওয়া হবে।


পরদিন সকাল — বেপাত্তাদের রহস্য

পরদিন সকালে ঘটল সেই পরিচিত ঘটনা, যা প্রতিটি বন্ধুর দলের ইতিহাসে অন্তত একবার লেখা থাকে।

গ্রুপের বাকি কয়েকজন বেড়ো — যারা সব পরিকল্পনায় সরব ছিল, যারা "হ্যাঁ হ্যাঁ যাব" বলে ভোট দিয়েছিল, যারা ইমোজি পাঠিয়েছিল ডজন ডজন — তারা সেদিন ভোর থেকেই একে একে বেপাত্তা। জীবনের ব্যস্ততা, চাকরি, সংসার, ঘুম — এই চারটি মহাশক্তি তাদের নিজের নিজের ঘরের চার দেওয়ালে আটকে রেখেছে।

"আর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — বাদ গেল সেই আলম, যে এই পুরো অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী, যে ঈদের দুপুরেই প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল! কিন্তু শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের আগমন হওয়ায় তাকে থেকে যেতে হলো। মনটা যে তারও আমাদের সঙ্গেই ছিল, সেটা আমরা ভালো করেই জানি।"

শেষমেশ আমরা তিনটি পরিবার মিলে রওনা হলাম — ছোট দল, কিন্তু মন ভরা উৎসাহ নিয়ে। কারণ আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ভেবে নিয়েছিলাম — যদি কেউ না যায়, একাই যাব।


ধান্যকুড়িয়া — প্রথম দর্শন

গোলাবাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে চেপে টাকি রোড ধরে ধান্যকুড়িয়া — পথটা বেশি দীর্ঘ নয়, কিন্তু যতই এগোনো যায়, শহরের গোলমাল ততই পিছনে পড়তে থাকে। কংক্রিটের জায়গায় আসে গাছ, দোকানের সাইনবোর্ডের জায়গায় আসে মাঠ।

গুগল ম্যাপে গন্তব্য সেট করা ছিল। কিন্তু ধান্যকুড়িয়ায় পৌঁছে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মনে হলো আমরা দেড়শো বছর আগের এক সময়ে হারিয়ে গেছি। রাস্তার দুই ধারে ইতিহাস ছড়িয়ে আছে। একটু এগোলেই পুরনো আমলের তোরণ, ভাঙা রাজবাড়ির দেওয়াল, শতবর্ষী গাছের সারি।

পার্কের দিকে হাঁটতে শুরু করতেই বুঝলাম — এটা কেবল একটা পার্কে বেড়াতে আসার গল্প নয়। এই গ্রামটা নিজেই একটা গল্প, যার পাতায় পাতায় সময় লেখা আছে।

সত্যজিৎ পার্কটা আসলে একটি দীর্ঘ রাস্তা — প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার। রাস্তার দুই পাশে বিদ্যাধরী নদীর দুটি শাখা বয়ে গেছে, আর নদী আর রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে গাছের সারি — যেন দুটি সবুজ দেওয়াল দিয়ে ঘেরা একটি শান্ত করিডর। সেই পথে হাঁটলে দুই দিকেই জলের দেখা মেলে, মাঝে মাঝে গাছের ফাঁক দিয়ে নদীর চিকচিকে রোদ এসে পড়ে পায়ের কাছে। মাথার উপরে খোলা আকাশ, পায়ের নিচে ছায়া আর রোদের পালাবদল।

এই রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে কোনো তাড়া ছিল না, কোনো গন্তব্যের চাপ ছিল না — শুধু ছিল সেই বিরল অনুভব, যখন পথটাই যাত্রার সেরা অংশ হয়ে ওঠে।


সত্যজিৎ পার্ক — বিদ্যাধরীর দুই বাহুর মাঝে

ধান্যকুড়িয়া সত্যজিৎ পার্কের সবচেয়ে অসাধারণ বিষয়টা হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান। বিদ্যাধরী নদীর দুটি শাখা এই গ্রামকে দুই দিক থেকে ঘিরে রেখেছে — যেন দুটি বাহু দিয়ে কেউ আলতো করে ধরে রেখেছে গ্রামটাকে। সেই দুই শাখার মাঝের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে একটু পরপর দুই দিকেই জলের দেখা মেলে। নদীর উপর মেঘলা আকাশের ছায়া পড়ে, দূরে গাছের সারি জলে উলটো ছবি আঁকে।

পার্কটি তিনটি আলাদা অংশে বিভক্ত, প্রতিটিতেই পিকনিক করার জায়গা। নদীর ধারে সিমেন্টের বেঞ্চগুলোতে বসলে সামনে জল, পেছনে গাছ — সময় যেন একটু থেমে যায়। সবুজ ঘাসের বিছানা, মাঝে মাঝে ফুটে থাকা ফুলের গাছ, দিগন্তে লম্বা তালগাছের সারি — এই দৃশ্য দেখতে দেখতে বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে, যেটা শহরে থাকতে থাকতে কখন যে জমে গিয়েছিল, টেরই পাওয়া যায়নি।

আর পার্কের বাইরে? রাজবাড়িগুলির চারদিকে পুকুর, শান বাঁধানো ঘাটের ভগ্নাবশেষ, আম বাগানের নিচে পাতার গালিচা — প্রকৃতি এখানে ইতিহাসের সাথে মিলেমিশে গেছে এত গভীরভাবে যে কোথায় শেষ হয় একটা, কোথায় শুরু হয় অন্যটা — বোঝা যায় না। গাছের শিকড় ইটের ফাটল ধরে নেমে গেছে, পুকুরের পাড়ে পুরনো প্রাচীরের গায়ে শেওলা জমেছে — এই অবিচ্ছেদ্য আলিঙ্গন দেখে মনে হয়, এই মাটি ইতিহাসকে ভুলতে চায় না।


রাজবাড়িগুলির সামনে দাঁড়িয়ে — বাইরে থেকেই যা পেলাম

আমরা কোনো রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকিনি। ভেতরে ঢোকার সুযোগও ছিল না অধিকাংশ ক্ষেত্রে — দরজা বন্ধ, তালা লাগানো। কিন্তু বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে যা দেখলাম, তা কোনো মিউজিয়ামের সাজানো প্রদর্শনীর চেয়ে কম নয় — বরং বেশি, কারণ এখানে কাচের আড়াল নেই, শুধু খোলা আকাশ আর পাথরের স্মৃতি।

গাইন রাজবাড়ি — ইতিহাসের গর্বিত ধ্বংসাবশেষ

ধান্যকুড়িয়ার গাইন পরিবার ছিল এই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার পরিবার। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত তাদের প্রাসাদ আজও দাঁড়িয়ে আছে — কিছুটা জীর্ণ, কিছুটা লতাপাতায় ঢাকা, কিন্তু মাথা উঁচু করে। সময়ের আঘাতে দেওয়ালের রং উঠে গেছে, ছাদের কিছু অংশ ধসে পড়েছে, তবু সেই প্রাসাদ দাঁড়িয়ে থাকে — যেন অতীতের গর্বিত প্রতিনিধি হয়ে।

প্রাসাদের বিশাল প্রবেশদ্বার দেখলে থমকে যেতে হয়। দুই পাশে কোরিন্থীয় স্তম্ভ — সেই গ্রিক ঐতিহ্যের পাতার নকশা আঁকা মাথা — যার উপরে বহু বছরের গাছের শিকড় আস্তে আস্তে নেমে এসেছে, যেন প্রকৃতি স্থাপত্যকে নিজের করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। দেওয়ালের গায়ে শতবর্ষের ধুলো জমেছে, কিন্তু কারিগরদের হাতের কাজ আজও টিকে আছে। কার্নিশে সারিবদ্ধ ভাস্কর্য, স্তম্ভের গায়ে সূক্ষ্ম পাতার নকশা — এই ব্রিটিশ-ইটালীয় ধাঁচের নির্মাণশৈলী বাংলার মাটিতে এসে হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ আলাদা এক রূপ, যেখানে পাশ্চাত্যের হাড় আর প্রাচ্যের আত্মা একসাথে বাস করে।

প্রাসাদের মূল ভবনটির দিকে তাকালে মনে পড়ে ইউরোপের কোনো মধ্যযুগীয় দুর্গের কথা — গোলাকার টাওয়ার, গথিক খিলানের সারি, বিশাল উঠোন। সামনের পুকুরে সেই প্রাসাদের ছায়া পড়ে — জলের মধ্যে একটা উলটো ছবি, যেন স্মৃতিটা নিজেই নিজেকে দেখছে, নিজের অতীতকে চিনে নিচ্ছে স্থির জলের দর্পণে।

গ্রামের আরেকটি রাজবাড়ির গেটের সামনে দাঁড়ালে আকাশের দিকে তাকাতে হয় — দুটি বিশাল গোলাকার মিনার দু'পাশে, মাঝে উঁচু খিলান, আর সেই খিলানের উপরে প্রস্তরমূর্তি। এই তোরণ দিয়ে একসময় জমিদারের পালকি ঢুকত, ঘোড়া ঢুকত, উৎসবের বাজনা ঢুকত। এখন সেই পথে ঢোকে শুধু বাতাস আর স্মৃতি।

গ্রামের সাদা মন্দিরটি আরেক বিস্ময়। বহু মিনার, খিলানযুক্ত বারান্দা — বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। পাশের পুকুরে তার প্রতিফলন দেখলে মনে হয় এটা দুটি মন্দির — একটা মাটির উপরে, একটা জলের নিচে। এই দ্বিগুণ সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, এই গ্রাম একসময় কতটা সমৃদ্ধ ছিল।

ধান্যকুড়িয়া হাই স্কুল — ইতিহাসের সুন্দরতম পুনর্জন্ম

আর ধান্যকুড়িয়া হাই স্কুল — এটি হয়তো এই গ্রামের সবচেয়ে মনোরম রূপান্তরের গল্প।

পুরনো রাজবাড়ির একটি ভবনকে স্কুলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। পিংক রঙের গ্রিক-কলামযুক্ত সেই ভবনে এখন পড়ে গ্রামের ছেলেমেয়েরা। যে উঠোনে একসময় জমিদারের বৈঠক বসত, যে ঘরে হিসাবের খাতা রাখা হতো — সেখানে এখন বই খোলা হয়, পাটিগণিত শেখা হয়, স্বপ্ন তৈরি হয়। জমিদারের বৈভব গেছে, কিন্তু সেই বৈভবের দেওয়ালে এখন ভবিষ্যৎ লেখা হচ্ছে প্রতিদিন। ইতিহাসের এই সুন্দর পুনর্জন্ম দেখে মনটা একটু ভালো হয়ে গেল।

কেন এই রাজবাড়িগুলো ধ্বংসস্তূপ হলো

এই রাজবাড়িগুলোর ইতিহাস শুধু পাথর আর ইটের নয়। এগুলো একটা সময়ের সাক্ষী — যখন বাংলার জমিদারশ্রেণী ইউরোপীয় স্থাপত্য ভালোবাসত, ইংরেজি পড়ত, কিন্তু মনের গভীরে ছিল এই মাটির টান, এই নদীর গান।

দেশভাগের ক্ষত, জমিদারি উচ্ছেদের আঘাত (১৯৫৩ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হয়), আর সময়ের নিরন্তর পরিবর্তন — এই তিনটি বড় ঢেউয়ে সেই বৈভব আজ ধ্বংসস্তূপ। যে পরিবার প্রাসাদ বানিয়েছিল, তারা একসময় দেশছেড়ে চলে গেছে, নাহয় বৈভব হারিয়ে সাধারণ জীবনে ফিরেছে। পেছনে থেকে গেছে পাথর আর স্মৃতি।

কিন্তু ধ্বংসস্তূপেও যে একটা নিজস্ব সৌন্দর্য থাকে — অসমাপ্ত বাক্যের মতো, অধরা সুরের মতো — সেটা সেদিন নিজের চোখে দেখলাম।


সেই বাগানবাড়ি — আর শান বাঁধানো ঘাটের কথা


রাজবাড়িগুলো ঘুরতে ঘুরতে একটি বড় প্রাসাদের পাশে চোখে পড়ল একটি বাগানবাড়ি। দরজায় তালা, কিন্তু পাঁচিলের ওপাশে দেখা যাচ্ছে বিশাল বাগান — আর তারও ওপারে, গাছের ফাঁক দিয়ে চিকচিক করছে একটা পুকুরের জল।

সেই পুকুর দেখার লোভ সামলানো গেল না।

এখানে সৎভাবে স্বীকার করা উচিত যে আমরা অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকিনি। কিন্তু বাগানবাড়ির দরজা খোলাই ছিল। আর বেড়োদের দলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে "না" বলার মানুষ কেউ নেই।

ভেতরে ঢুকে মনে হলো অন্য একটা পৃথিবীতে পা দিলাম।

বাগানটা এখন অনেকটাই প্রকৃতির দখলে চলে গেছে। পুরনো আম বাগান — মাটিতে ঝরা পাতার পুরু স্তর, গাছের শিকড়ের উঁচু-নিচু ভাঁজে হোঁচট খাওয়ার বিপদ, আর গাছের ছায়া ভেদ করে নেমে আসা রোদের সোনালি টুকরো। সেই আলো-ছায়ার খেলায় বাচ্চারা দৌড়াল, চিৎকার করল — তাদের উচ্ছ্বাসে বাগানটা যেন জেগে উঠল একটুক্ষণের জন্য।

পুকুরের ধারে পৌঁছলাম। শান বাঁধানো ঘাটের অবশিষ্ট — পাথরের ধাপগুলো এখনো আছে, কিছু ভাঙা, শেওলায় সবুজ। একসময় এই ঘাটে নেমে কেউ জল তুলেছে, কেউ স্নান করেছে, কেউ বসে বসে ভাবনার জাল বুনেছে। সেই সব মানুষ নেই, কিন্তু ঘাটটা আছে — নীরব, ধৈর্যশীল, যেন অপেক্ষা করছে।

সেই ঘাটে বসে ছবি তুললাম। পটভূমিতে পুকুর, পুরনো পাড়, গাছের ছায়া। কোনো ফিল্টার লাগেনি, কোনো সাজসজ্জা নেই — শুধু একটা বিকেল, একটা পুকুর, আর কিছু মানুষ যারা সেই মুহূর্তটাকে ধরে রাখতে চেয়েছিল।


দুটো ছোট্ট মানুষ — যাদের আনন্দে বড়দের সার্থকতা

সেদিনের যাত্রায় সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছিল দুটো ছোট্ট মানুষ — একজনের বয়স সাড়ে চার, অন্যজনের মাত্র এক বছর নয় মাস।

ছোট্টটা — এক বছর নয় মাসের সেই পুচকে — কথা বলতে শিখছে এইমাত্র। দুই-তিনটে শব্দ, স্পষ্ট নয়, কিন্তু উৎসাহে কোনো কমতি নেই। ঘাসের উপর দাঁড়িয়ে সে হাঁটছে, হোঁচট খাচ্ছে, উঠে আবার হাঁটছে — মাথায় ধুলো, পায়ে ঘাসের দাগ, মুখে অদ্ভুত একটা গম্ভীর ভাব, যেন পৃথিবীটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখছে। বড়দের কেউ যখন হাঁ করে ইতিহাস দেখছে, সে তখন ঘাস খুঁটছে — অগ্রাধিকারের প্রশ্নে সে নিজেই নিজের বস।

আর বড়টা? সে দৌড়ে বেড়াচ্ছে — পাখি দেখলে চিৎকার, গাছ দেখলে ছুঁয়ে দেখা, পুকুর দেখলে পাথর ছোড়ার চেষ্টা। পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস তার কাছে বিস্ময়ের উৎস — ইতিহাস-টিতিহাস পরে, এখন পাথর ছোড়া দরকার।

মায়েরা দুজন মিলে ছোট্টটার দুই হাত ধরে হাঁটাচ্ছে — পেছনে নদীর জল চিকচিক করছে, সামনে সবুজ পথ এঁকেবেঁকে গেছে। এই ছবিটা ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল — কিন্তু সেই ছবির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর ছিল সেই মুহূর্তটা নিজে।


নবদম্পতির সেলফি — ধ্বংস ও সৃষ্টির একই ফ্রেমে

"দলে একজোড়া নবদম্পতিও ছিল — বাসার আর তার বউ। বিয়ের পর তাদের প্রথম ঈদের ঘোরা, আর সেই বিশেষ যাত্রার শুরুটাই হলো এক ভাঙা রাজবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। দাম্পত্য জীবনের প্রথম অধ্যায়েই এমন ঐতিহাসিক লোকেশন — স্মৃতি কিন্তু একেবারে ইউনিক!"

ধান্যকুড়িয়ার পুরনো রাজবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তারা সেলফি তুলল — পটভূমিতে ভাঙা প্রাসাদের খিলান, ঝুলে পড়া লতা, জরাজীর্ণ দেওয়াল, আর সামনে দুজনের উজ্জ্বল হাসি। এই দুটি বিপরীত জিনিস — নতুন জীবনের শুরু আর পুরনো বৈভবের শেষ — একই ফ্রেমে এত সুন্দর মিলে গেল যে দেখে মনে হলো একটা রূপক ছবি।

ভবিষ্যতে এই ছবি দেখলে তারা নিশ্চয়ই বলবে — "বিয়ের পরপর একটা জমিদারবাড়িতে গিয়েছিলাম।" বাড়িটা যে ভাঙা ছিল, সেটা উল্লেখ না করলেও চলবে।

দুপুরের এগ রোল — প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মাঝে

এতক্ষণ হাঁটার পর পেটে ক্ষিদের আওয়াজ উঠতে লাগল। গ্রামের পথে বড় রেস্তোরাঁ বা ফাস্টফুডের চেন থাকার প্রশ্নই নেই — কিন্তু ছোট দোকানের নিজস্ব একটা মায়া আছে।

একটা ছোট্ট দোকানে এগ রোল পাওয়া গেল। সৎভাবে বলতে গেলে — খুব মন্দ ছিল না, কিন্তু বারাসাত বা কলকাতার গলিতে যে লাচ্ছা পরোটার রোল পাওয়া যায়, এটা সেরকম কিছু ছিল না। সাধারণ পরোটা, সাধারণ ডিম, সাধারণ মশলা। তবে ক্ষিদের মুহূর্তে যেকোনো খাবারেই একটা বাড়তি স্বাদ যোগ হয় — সেটা এখানেও ব্যর্থ হয়নি। পাশাপাশি সমানতালে চলছিল আইসক্রিম, চিপস আর বিস্কুট।

তবে রোলটা খেতে খেতে যে আলোচনা শুরু হলো, সেটাই সম্ভবত সেদিনের সেরা বিনোদন। বেড়োদের দলে খাবারের পোস্টমর্টেম না হলে বেড়ানো সম্পূর্ণ হয় না — "ডিমটা কেমন হয়েছে?", "সস নেই কেন?", "পেঁয়াজ কোথায়?" — এই তিনটি অমর প্রশ্ন বারবার ঘুরে আসছিল। ক্ষিদেয় খাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু একই সাথে রান্নার বিচার চলছেই। এই দুটো কাজ বাঙালি একসাথে করতে পারে — এটাই বোধহয় আমাদের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।

আর রোল খেতে খেতেই শুরু হয়ে গেল পরবর্তী বেড়ানোর পরিকল্পনা। যে পরিকল্পনা আবার WhatsApp-এ গিয়ে চার ভাগে ভাগ হবে, আবার তিন ভাগ বাদ যাবে — এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু তবুও পরিকল্পনা করা বন্ধ হয় না। কারণ বেড়ো-দের আসল আনন্দ হয়তো বেড়ানোতে নয় — পরিকল্পনায়।


যা দেখা হয়নি — পরের বার যাওয়ার তালিকা

সময়ের অভাবে এবং সঙ্গে ছোট বাচ্চা থাকায় রাজবাড়িগুলোর ভেতরে ঢোকা হয়নি। এই অতৃপ্তিটুকু সঙ্গে নিয়েই ফিরলাম। পরের বার আরও সময় নিয়ে গেলে যা করা যাবে —

  • গাইন রাজবাড়ির ভেতরের উঠোন ও পুরনো সংগ্রহ দেখা (খোলার সময় জেনে যাওয়া ভালো)
  • সূর্যাস্তের সময় নদীর ধারে থাকা — বলা হয় এটাই সেরা মুহূর্ত
  • গ্রামের ভেতরের পুরনো বাড়িগুলো আরও মনোযোগ দিয়ে ঘুরে দেখা
  • স্থানীয় বাজার থেকে দেশি মিষ্টি খাওয়া — এবার ঠিকমতো খাবারের ব্যবস্থা করে যাওয়া
  • বিদ্যাধরীর ধারে সন্ধ্যার আলোয় বসে থাকা

ফেরার পথে — যা মনে থাকবে

বিকেল গড়িয়ে আসছে। ফেরার সময় হলো।

মোটরসাইকেলে উঠতে উঠতে পেছনে ফিরে একবার তাকালাম — গাছের সারির আড়ালে সেই পুরনো মিনারগুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। ছোট্টটা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে — হাতে ঘাসের দাগ, পায়ে ধুলো, মুখে সেই একই গম্ভীর ভাব, যেন ঘুমের মধ্যেও পৃথিবী পরীক্ষা করে চলেছে। বড়টা মা আর বাবার মাঝে মোটরসাইকেলে বসে দু’পাশের দৃশ্য দেখছে, ধানের মাঠগুলো চোখের সামনে দিয়ে একের পর এক পিছিয়ে যাচ্ছে। বড়রা চুপ — সেই চুপ যা ক্লান্তির নয়, তৃপ্তির।

মৌসুমী দ্বীপের সমুদ্র পাইনি। ইকো পার্কের বিশাল লেক পাইনি। টাকির কাশবনের নদী পাইনি। মুক্তারপুরের চেনা আড্ডাও হলো না। চারটি পরিকল্পনা একে একে ব্যর্থ হয়েছিল।

কিন্তু তাদের ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে যা পেলাম —

পেলাম একটা ভাঙা রাজবাড়ির খিলানের নিচে দাঁড়িয়ে শতবর্ষের ইতিহাসের ঠান্ডা স্পর্শ।

পেলাম শান বাঁধানো পুরনো ঘাটে বসে একটুখানি নীরবতা — যে নীরবতা শহরে কিনতে পাওয়া যায় না।

পেলাম আম বাগানের পাতার ফাঁকে রোদের আলো, পুকুরের স্থির জলে গাছের উলটো ছায়া।

পেলাম ছোট্ট একটা মেয়ের প্রথম হাঁটার অদম্য চেষ্টা আর একটা ছেলের অনাবিল দৌড়ের আনন্দ।

পেলাম বন্ধুদের সাথে সেই পুরনো রসায়ন — যা ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে একটু চাপা পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিভে যায়নি।

চারটি পরিকল্পনা একে একে পথ বদলে নিয়েছিল। কিন্তু হয়তো প্রতিটি পরিবর্তন আমাদের একটু একটু করে এই জায়গার দিকেই নিয়ে আসছিল — যেখানে না এলে এই দিনটা থাকত না।


আর যে বেড়োরা যেতে পারেনি — তোমাদের জন্য শুধু একটাই কথা: পরেরবার একসাথে যাব, কথা দিলাম। কিন্তু সেদিনের সেই রোদ, সেই পুরনো ঘাটে বসে তোলা ছবি, সেই আম বাগানের ছায়া — সেগুলো আর ফিরে পাবে না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একবারই আসে। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না — এমনকি বেড়োদের জন্যও না।

ধান্যকুড়িয়া সত্যজিৎ পার্ক  ·  গাইন রাজবাড়ি  ·  বাগানবাড়ির সেই পুকুর

ছোট্ট তিনটি পরিবার  ·  একটি অপরিকল্পিত সুন্দর দিন

উত্তর ২৪ পরগনা  ·  ২২ মার্চ ২০২৬  ·  Team of Bero's

— একজন বেড়ো, যে ব্যর্থ পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে সফল বেড়ানো খুঁজে পেয়েছে

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →