পতন: পঁয়ষট্টি তলা থেকে দেখা এক জীবনের শেষ ঝলক
পঁয়ষট্টি তলা থেকে নিচে পড়ার সেই সাত সেকেন্ডে অর্ণব চক্রবর্তীর চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার ফেলে আসা শৈশব, বাবা-মা এবং হারানো দিনগুলোর স্মৃতি। এক জীবনের গল্প যা শেষ মুহূর্তে এক ঝলকে ধরা দেয়।
পদার্থবিজ্ঞান বলে, পঁয়ষট্টি তলা থেকে মাটি পর্যন্ত পড়তে সময় লাগে মাত্র ছয় থেকে সাত সেকেন্ড। কিন্তু অর্ণব চক্রবর্তী জানত না পদার্থবিজ্ঞান। সে জানত শুধু এটুকু — রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে রেলিং পেরিয়ে পা সরিয়ে নেওয়ার পর যে শূন্যতা তাকে গ্রাস করল, সেই শূন্যতায় একটা গোটা জীবন ভেসে উঠল। এক নিঃশ্বাসে। এক ঝলকে।
কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা "স্কাই ওয়ান" টাওয়ার। বিড়লা রোড আর পার্ক স্ট্রিটের সংযোগে। নিচে হলুদ ট্যাক্সির স্রোত, হাওড়া ব্রিজের দিক থেকে ভেসে আসা কুয়াশা। অর্ণব পড়ছে। আর পড়তে পড়তে — শেষ মুহূর্তে — কতো কথা মনে পড়ছে তার।
প্রথমে এল বাতাস। একটা ঠান্ডা, নির্মম বাতাস। কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে। চুল উড়ল উপরের দিকে — যেন আকাশ তাকে ফিরিয়ে নিতে চাইছে। পেট থেকে উঠে এল সেই চেনা শূন্যতা — ঠিক ছোটবেলায় দোলনা থেকে ঝাঁপ দিলে যেমন হতো।
দোলনা। সেই দড়ির দোলনা। শ্যামবাজারের ছোট্ট দোতলা বাড়ির ছাদে জামগাছে বাঁধা। বাবা বেঁধে দিয়েছিলেন — সুবীর চক্রবর্তী, স্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই, লম্বা রোগা গোঁফওয়ালা মানুষ, হাতে সবসময় বই। কিন্তু সন্ধ্যায় সেই বই নামিয়ে রাখতেন। দোলাতেন আর গাইতেন।
"আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি..."
পাঁচ বছরের ছোট্ট অর্ণব কথার মানে বুঝত না। কিন্তু বাবার গলার উষ্ণতা বুঝত। সেই মিষ্টি গলা এখন কানে এল — তিরিশ বছর পেরিয়ে, পঁয়ষট্টি তলার শূন্যে ভাসতে ভাসতে।
মায়ের কথা মনে পড়ল। সুমিত্রা। ছোটখাটো গোলগাল মানুষ, সারাক্ষণ ব্যস্ত। রান্নাঘর থেকে মাছের ঝোলের গন্ধ উঠত বিকেলে। সেই গন্ধ — এই পতনের মাঝেও — নাকে এসে লাগল যেন। কতকাল পরে। পাড়ার মাঠে বলটা পুকুরে পড়লে লাফ দিয়ে আনত অর্ণব। কাদামাখা শরীরে বাড়ি ফিরলে মা চিৎকার করতেন, তারপর নিজেই গামছায় মুছিয়ে দিতেন। বকুনির মধ্যে এত ভালোবাসা মাখানো থাকত।
পুজোর সময় নতুন পাঞ্জাবি পরিয়ে দিতেন মা। চুলে তেল দিয়ে সিঁথি কেটে দিতেন। অর্ণব অস্বস্তিতে মাথা নাড়াত, মা হাসতেন। ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করত — "মা দুর্গা, একটা ক্রিকেট ব্যাট দাও।" সেই ইচ্ছেগুলো কত সহজ ছিল। কত নিখুঁত ছিল।

ক্লাস সেভেনে উঠতেই পায়ের নিচের মাটি নড়ে গেল। কণ্ঠস্বর বদলাল, উচ্চতা বাড়ল, আর একদিন হঠাৎ বুঝল — পাশের বাড়ির রিমাকে দেখলে বুকের মধ্যে কেমন একটা হয়। মাথায় লম্বা দুই বেণি, হাসলে গালে টোল। আগে সারাদিন কথা বলত, এখন রিমার সামনে গেলে কথা আটকে যেত।
সেই প্রথম ভালো লাগা। সেই প্রথম বুকে ব্যথা।
স্কুলে বন্ধু তিনজন — সৌম্য, জয়দীপ, তমাল। টিফিনে পাঁচ টাকার চাউমিন। জয়দীপ একদিন স্যারের পিছনে বোর্ডে ছবি এঁকে দিল। দুজনকে মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখলেন স্যার। দাঁড়িয়েও হাসি থামছিল না। সেই হাসি — সেই অফুরন্ত হাসি — কখন থেকে হারিয়ে গেল?
উচ্চমাধ্যমিকের বছর। বাবা চাইলেন ইঞ্জিনিয়ারিং। মা চাইলেন ডাক্তার। অর্ণব চাইল — সে নিজেও জানত না ঠিক। শুধু জানত বাংলা সাহিত্য পড়লে অন্য দুনিয়ায় চলে যায়। ভোররাতে পড়ত, পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান তখনও বন্ধ, দূরে কোথাও কুকুর ডাকত, আর অর্ণব জানালার পাশে বসে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাত। সেই রাতের আকাশ আর এই রাতের আকাশ একই। তারাগুলো একই। শুধু নিচের মানুষটা বদলে গেছে।
যাদবপুরে এসে স্বাধীনতা পেয়েছিল। বিতর্ক, গান, নাটক, আড্ডা। ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর তখনই এল মেঘনা। মেঘনা সেনগুপ্ত। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। কালো ঢেউ খেলানো চুল, চোখে বুদ্ধিমতী ঔজ্জ্বল্য। লিটারারি ক্লাবে অর্ণব নিজের কবিতা পড়ছিল — লুকিয়ে লুকিয়ে লেখা। পড়া শেষ হলে মেঘনা এগিয়ে এসে বলেছিল, "তুমি কবিতা লেখো? জানতামই না ইঞ্জিনিয়ারিংয়েও মানুষ থাকে।"
সেই এক লাইনেই বুঝে গিয়েছিল — এই মেয়ে আলাদা।
একদিন বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল লাইব্রেরিতে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, ভেতরে বইয়ের গন্ধ। মেঘনার পাশে বসে বুঝল — সে প্রেমে পড়ে গেছে। প্রেম নিবেদন হয়েছিল তৃতীয় বছরে, রবীন্দ্র সরোবরের ধারে, হাতে লেখা কবিতা নিয়ে। মেঘনা পড়ল, তাকাল, বলল — "এত দেরি কেন?"
সেই সন্ধ্যায় লেকের জলে আলো ঢেউ খেলছিল। দূরে রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসছিল। মনে হয়েছিল — এই পৃথিবী আসলে অসম্ভব সুন্দর।

চার বছর একসাথে কাটিয়েছিল। দার্জিলিং, বকখালি, দীঘা। ঝগড়া হয়েছিল, মিটে গিয়েছিল। রাত তিনটায় ফোনে কথা — শুধু এমনি, কথা বলার জন্য। মেঘনা তার সব ছিল। সব।
পাশ করার পর বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি। ভালো মাইনে, নিরানন্দ কাজ। মেঘনা চলে গেল লন্ডনে। অর্ণব বলেছিল যেতে — ভালোবাসলে আটকানো যায় না। কিন্তু মনে মনে জানত এই যাওয়া শেষ হবে না।
প্রথম ছয় মাস ভিডিও কল। তারপর ব্যবধান বাড়ল। তারপর একদিন মেঘনা বলল — "অর্ণব, তুমি আমাকে ছেড়ে দাও। ওখানে কেউ আছে।"
এইটুকু কথায় একটা মানুষের পৃথিবী ভেঙে পড়তে পারে। সেই রাতে কাঁদেনি সে। কাঁদতে পারেনি। শুধু বসে ছিল অন্ধকারে, খালি ঘরে, ফোনের স্ক্রিনে মেঘনার শেষ মেসেজটা জ্বলছে।
সেই বছরেই বাবা অসুস্থ হলেন। ক্যানসার। থার্ড স্টেজ। অর্ণব সব ছেড়ে ঘরে ফিরল। রাত জেগে পাশে বসে থাকত। বাবা শুয়ে শুয়ে শুনতেন — রবীন্দ্রনাথের কবিতা, বিভূতিভূষণের উপন্যাস। চোখ বন্ধ হয়ে আসত, মুখে একটু হাসি।
"তুই লেখক হবি অর্ণব," শেষ দিকে বলেছিলেন। "প্রতিশ্রুতি দে।"
অর্ণব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বাবা চলে গেলেন শীতের এক সকালে। কুয়াশা ছিল বাইরে। মা কাঁদেননি তখন। কাঁদলেন পরে, রাতে, একা। বাবা চলে যাওয়ার পর ঘরের ছাদটা যেন নেমে এল। বাতাস ভারী হয়ে গেল।
চাকরিতে মন বসছিল না। একের পর এক ভুল। বস ডাকল। মাইনে কমল। তারপর ছাঁটাই। সৌম্য বিয়ে করল, জয়দীপ বিদেশ গেল, তমাল ব্যবসায় ডুবে গেল। হোয়াটসঅ্যাপে মাঝে মাঝে — "কেমন আছিস?" — "ভালো আছি।" এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ। মা অসুস্থ হলেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ। রাতে মায়ের পায়ে তেল মালিশ দিত অর্ণব। মা ঘুমিয়ে পড়লে বসে থাকত একা।
একাকীত্ব। রাত তিনটায় একা ঘরে জেগে থাকলে সেই শব্দের ওজনটা বোঝা যায়। কেউ নেই ফোন করার। কেউ নেই বলার — "আয়, চা খাই।" কেউ নেই বলার — "তুই আছিস তো, আমি আছি।"
এই বছর মা-ও চলে গেলেন। হঠাৎ করে, ঘুমের মধ্যে। সকালে উঠে ডাকল অর্ণব, সাড়া নেই। সেই ঠান্ডা হাতের স্পর্শ — সেটা ভুলতে পারেনি। এরপর ঘরে শুধু সে। একা।
কোম্পানিতে বড় ভুল হল। কোটি টাকার ক্ষতি। টিম লিড সে — দায় তার। চাকরি গেল। মামলার হুমকি এল। ইএমআই বাকি, বাড়ি ভাড়া বাকি, ব্যাংকে শেষ কয়েকটা হাজার।
একটা মানুষ একসাথে কতটুকু বহন করতে পারে? একা কতটা?
সেই রাতে বাবার পুরনো চেয়ারে অনেকক্ষণ বসে ছিল। ঘরে আলো নেই। মায়ের ছবি, বাবার ছবি, মেঘনার সাথে তোলা সেই পুরনো ছবি — যেটা ফেলতে পারেনি আজও। তারপর উঠে পড়ল।
পড়ছে সে। আর শেষ মুহূর্তে কতো কথা মনে পড়ছে তার।
বাবার দোলনা দেওয়ার সেই হাত। মায়ের রান্নাঘরের গন্ধ। দুর্গাপূজায় মায়ের শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ভিড়ের মধ্যে হাঁটা। জয়দীপের সেই দাঁত-বের-করা হাসি। রবীন্দ্র সরোবরে সন্ধ্যার আলোয় মেঘনার মুখ। বাবার শেষ রাতের হাসি — ছেলের পড়া শুনতে শুনতে।
মায়ের হাত। সেই ঠান্ডা, নিথর হাত।
কলকাতার আলো। হাজারো জানালায় হাজারো আলো। একটা জানালায় একজন মা শিশুকে ঘুম পাড়াচ্ছেন। একটা জানালায় একজন বৃদ্ধ একা টিভি দেখছেন। একটা জানালায় দুজন মানুষ ঝগড়া করছে — কিন্তু তারা একসাথে আছে। সবাই বহন করছে। একা একা। নিজের মতো করে।
বাবা ওপর থেকে দেখছেন? মা দেখছেন? তাঁরা কি চাইতেন এটা?
না। তাঁরা চাইতেন না।
বাবার সেই কথাটা মনে এল — পথের পাঁচালী পড়তে পড়তে বাবা কেঁদে ফেলেছিলেন, ছোট্ট অর্ণব জিজ্ঞেস করেছিল "বাবা, কাঁদছ কেন?" বাবা বলেছিলেন, "ভালো লেখা পড়লে কাঁদতে হয়। কান্না মানে দুর্বলতা নয়। কান্না মানে অনুভব করার ক্ষমতা আছে।"
অর্ণব অনুভব করতে পারত। অনেক কিছু। সে ভালোবাসতে পারত। সে ভালো মানুষ ছিল।
মানুষ মরতে চায় না কখনো।
মানুষ চায় কষ্টটা মরে যাক।
কিন্তু সে পথ খুঁজে পায় না।
আর তখন — ঠিক তখন — মাটি যখন আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত দূরে — অর্ণবের ভেতরে হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে উঠল।
বাঁচতে চাই।
হ্যাঁ। এই শেষ মুহূর্তে সে বুঝল — সে বাঁচতে চেয়েছিল। সে সাহায্য চেয়েছিল। শুধু একজন মানুষ দরকার ছিল, একটা হাত দরকার ছিল, একটা গলা দরকার ছিল — "থাক, আমি আছি" — এইটুকুই।
কিন্তু এই উপলব্ধি এল ঠিক সেই মুহূর্তে — যখন আর কিছুই করার নেই।
তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে খবরের কাগজে ছোট্ট একটা খবর — "স্কাই ওয়ান টাওয়ার থেকে পড়ে মৃত্যু এক যুবকের।" দুই লাইন। তৃতীয় পাতায়।
অর্ণব চক্রবর্তী। বয়স ৩৫। অবিবাহিত।
সেই দুই লাইনের পেছনে ছিল একটা পুরো জীবন। একটা শৈশব। একটা প্রেম। একটা পরিবার। অনেক কবিতা যা লেখা হয়নি। একটা প্রতিশ্রুতি যা রাখা হয়নি। আর একটা শেষ মুহূর্তের চিৎকার — যা কেউ শুনতে পায়নি।
সেইদিন সন্ধ্যায় সৌম্য ফোন করল জয়দীপকে। "শুনলি? অর্ণবের কথা?"
জয়দীপ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল, "আমরা কি জিজ্ঞেস করেছিলাম? সত্যি করে জিজ্ঞেস করেছিলাম — 'কেমন আছিস'?"
সেই প্রশ্নের উত্তর আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না।
আমরা প্রতিদিন যে কথা বলি না,
যে ভালোবাসা জানাই না,
যে সাহায্যের হাত বাড়াই না —
একদিন সেই না-বলাগুলোই কাউকে মেরে ফেলে।
এই নম্বরে একটা ফোন করত —
হয়তো গল্পটার শেষ অন্যরকম হত।
হয়তো।"

Lifeline Foundation-এ ফোন করুন —
+91 9088030303 · (033) 4044-7437
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা · সম্পূর্ণ বিনামূল্যে
কথা বলার মানুষ আছে। আপনি একা নন।
