সবাই অসহায় — শুধু কেউ সোনার খাঁচায় কাঁদে, কেউ রাস্তায়
জীবনের মঞ্চে আমরা সবাই অভিনেতা—কেউ টালির ছাদের নিচে, কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, কিন্তু অশান্তি সবার সঙ্গী। গরিব হোক বা ক্ষমতাবান, প্রত্যেকেই নিজের মতো করে কিছু না কিছু হারানোর ভয়ে বেঁচে থাকে। সামাজিক মর্যাদা আর ক্ষমতার এই অন্তহীন দৌড় আসলে এক মায়া—যেখানে সবাই উপরে উঠতে চায়, অথচ কেউই সত্যিকারের শান্তিতে নেই। হয়তো মুক্তির শুরুটা এখানেই—তুলনা থামিয়ে, অন্যের ভেতরের অসহায়ত্বটা বুঝে, আর এই মুহূর্তটাকেই নিজের করে নিয়ে। কারণ শেষমেশ, আমরা সবাই একই গল্পের ভিন্ন চরিত্র—একটু হারিয়ে যাওয়া, তবু গভীরভাবে মানবিক।
সবাই অসহায় — শুধু কেউ সোনার খাঁচায় কাঁদে, কেউ রাস্তায়
গরিব থেকে প্রধানমন্ত্রী, পিঁপড়া থেকে সিংহ — ক্ষমতা, মর্যাদা আর সুখের পেছনে মানুষের অন্তহীন দৌড়ের একটি সৎ, একটু হাস্যরসাত্মক পর্যালোচনা

বলুন তো — পৃথিবীতে এমন একটাও মানুষ আছে কি, যে সকালে উঠে বলে "আহা, আজকের দিনটা একদম নিখুঁত, কোনো ঝামেলা নেই, জীবনটা বড্ড সুন্দর"? থাকলে তার ফোন নম্বরটা দিন। বিজ্ঞানীরা তাকে গবেষণার নমুনা হিসেবে সংরক্ষণ করতে চান।
বাকি সবাই — মানে আপনি, আমি, পাড়ার কাকু, ফুটপাথের চায়ের দোকানদার, নবান্নের বাবু, এবং ওই সিংহটাও যে এইমাত্র একটা হরিণ সাবাড় করল — সকলেই কোনো না কোনোভাবে অসহায়। ফারাক শুধু একটাই: কেউ টালির চালের নিচে কাঁদে, কেউ এয়ার কন্ডিশনড ঘরে।
আজকে সেই মহান সত্যিটা বলব যেটা কোনো দার্শনিক সরাসরি বলেননি — কারণ বললে তাঁর বই বিকোত না। সত্যিটা হল: মানুষের তৈরি "সামাজিক মর্যাদা" আর "ক্ষমতার সিঁড়ি" আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কমেডি শো। আর আমরা প্রত্যেকে তার এক-একজন অভিনেতা — কেউ জানি না শো-টা কখন শেষ হবে।
প্রথম পর্ব: সামাজিক সিঁড়ি
অর্থাৎ — প্রত্যেকে উপরে তাকায়, নিচে তাকানোর ফুরসৎ নেই
চলুন শুরু করি "সামাজিক স্তরবিন্যাস" নামক জিনিসটা দিয়ে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন hierarchy। আমরা কলকাতার লোকেরা বলি: "ওই লোকটা আমার চেয়ে ভালো আছে" — এই কথার অন্তহীন চেন।
গরিব মানুষ রোজ ভোরে উঠে ভাবেন, "যদি একটু পয়সা থাকত! মধ্যবিত্তরা কত আরামে থাকে — ভাত-মাছ খায়, বাচ্চাকে ইস্কুলে পাঠায়, মাসে একবার পার্কস্ট্রিটে যায়। আহা!" তিনি জানেন না যে ওই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক প্রতি মাসে লোনের কিস্তির কথা ভেবে ঘুম থেকে উঠতে পারছেন না।
মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক ভাবছেন, "যদি বড়লোক হতাম! ওদের কোনো চিন্তা নেই। বিদেশে যায়, মস্ত গাড়িতে চলে, রেস্টুরেন্টে মেনু না দেখেই অর্ডার করে!" তিনি জানেন না যে ওই বড়লোক কাকু রোজ সকালে উঠে শেয়ারবাজারের দিকে তাকিয়ে বুকে হাত দিয়ে বসেন।
বড়লোক কাকু ভাবছেন, "যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকত! তাহলে কেউ ঠেকাতে পারত না।" তিনি জানেন না যে ওই নেতামশাই রাতে ভাবছেন কে তাঁকে কুপোকাৎ করতে চাইছে।
আর সেই ক্ষমতাধর নেতামশাই? তিনি ভাবছেন, "পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে কেউ কিছু বলতে পারত না।" আর পারমাণবিক অস্ত্র? সে চুপটি করে বসে আছে আর ভাবছে — "আমার কোনো চিন্তা নেই, কারণ আমার কোনো ব্যক্তিত্বই নেই।"
এই লেখাটা পড়ার পরে "আমি ভালো আছি" বলার অভ্যেসটা হয়তো একটু টলমল করবে। লেখক দায়ী নন। কারণ লেখকও নিজে ভালো নেই।

| স্তর | আসল সমস্যা | মনে করে |
|---|---|---|
| গরিব / শ্রমিক | আজ খাব কী? | মধ্যবিত্তরা সুখে আছে |
| মধ্যবিত্ত | লোনের কিস্তি, বাচ্চার কোচিং | বড়লোকদের কোনো চিন্তা নেই |
| বড়লোক | শেয়ার পড়লে বুক ধড়াস | ক্ষমতাবানরা নিশ্চিন্ত |
| নেতামশাই | কে কুপোকাৎ করতে চাইছে? | পারমাণবিক শক্তিই মুক্তি |
| প্রকৃতি / মহাবিশ্ব | কোনো সমস্যা নেই | সবাইকে শেষমেশ মাটিতে মেশাবে — নিঃশব্দে হাসছে |
"সবাই মনে করে উপরে গেলে সুখ আছে। উপরে গিয়ে দেখা যায় — আরো উপরে যাওয়ার সিঁড়ি।"
— একটি লিফটের আত্মজীবনী থেকে (অপ্রকাশিত)
দ্বিতীয় পর্ব: ক্ষমতার মরীচিকা
অথবা: "শক্তিশালী" মানুষগুলো রাতে ঘুমাতে পারে না কেন
ক্ষমতা নিয়ে মানুষের ধারণাটা অনেকটা এইরকম: "ওই লোকটার কাছে ক্ষমতা আছে, আমার নেই।" কিন্তু ওই লোকটাও ঠিক একই কথা ভাবছে — শুধু তার "ওই লোকটা" আরেকজন।
রাস্তার লোক ভাবছেন থানার পুলিশ সর্বশক্তিমান। থানার কনস্টেবল ভয় পাচ্ছেন OC-কে। OC কাঁপছেন DC সাহেবের ফোনে। DC সাহেব নার্ভাস মন্ত্রীর ডাকে। মন্ত্রীমশাই চমকাচ্ছেন বিরোধী দলের চিৎকারে। বিরোধী দল ভয় পাচ্ছে ভোটারকে। ভোটার ভয় পাচ্ছে থানাকে।
লক্ষ করুন — এটা একটা বৃত্ত। সবাই কাউকে না কাউকে ভয় পাচ্ছে। তাহলে আসলে কেউই ক্ষমতাবান নয়। ক্ষমতাটা হল একটা গরম আলুর মতো — সবাই ধরে আছে কিন্তু কেউ রাখতে চাইছে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, যত বেশি ক্ষমতা, তত বেশি paranoia। ক্ষমতাধর ব্যক্তির গড় রাতের ঘুম: ৪.৫ ঘণ্টা। উত্তর কলকাতার চায়ের দোকানদারের গড় ঘুম: ৭.৮ ঘণ্টা। বিজয়ী: চায়ের দোকানদার — কোনো সন্দেহ নেই।
এবার আসুন প্রকৃতির কথায়। সবাই বলে, "প্রকৃতি সবচেয়ে শক্তিশালী।" ঠিকই। কিন্তু প্রকৃতিরও ব্যাপার আছে। সে একটা তারা তৈরি করে, বিলিয়ন বছর ধরে রাখে, তারপর মস্ত বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়। কেন? কোনো কারণ নেই। প্রকৃতি নিজেও জানে না কেন করে। সেটাকে কি "ক্ষমতা" বলা উচিত, নাকি "অদ্ভুত নেশা"?
তৃতীয় পর্ব: জানোয়ারের দল
যেখানে সিংহও জানে না সে কেন "রাজা"
আমরা সিংহকে "বনের রাজা" বলি। কিন্তু সিংহকে কেউ জিজ্ঞেস করেছে কি সে রাজা হতে চায়? করেনি। সিংহ শুধু খিদে পেলে শিকার করে। তার কোনো নামফলক নেই। সে কাউকে বলে না, "এই এলাকাটা আমার, ট্যাক্স দাও।"
অথচ মানুষ? মানুষ একটা কাগজে সই করে বলে, "এই জমি আমার।" সেই কাগজ রক্ষার জন্য আরেকটা কাগজ। সেই কাগজ রক্ষার জন্য একটা দপ্তর। সেই দপ্তর চালাতে ট্যাক্স। সেই ট্যাক্সের হিসাব রাখতে আরেকটা দপ্তর। এইভাবে চলতে থাকে — আর শেষমেশ ওই জমিটা মাটিতেই পড়ে থাকে। মানুষটা চলে যায়।

সিংহ আর পিঁপড়া — দুজনেই কাজ করছে। কেউ মর্যাদার জন্য লড়ছে না।
এবার আসি পিঁপড়ার কথায়। লক্ষ লক্ষ পিঁপড়া একসাথে কাজ করছে — কোনো CEO নেই, কোনো বোর্ড মিটিং নেই, কোনো PowerPoint নেই। কেউ বলছে না, "আমি সিনিয়র পিঁপড়া, আমার সাথে এভাবে কথা বলবি না।" কাজ হচ্ছে। খাবার আসছে। দল টিকছে।
মৌমাছির "রানি" আছে — কিন্তু সেই রানি সবচেয়ে বেশি কাজ করে। শুধু ডিম পাড়তে পারার জন্য সে "রানি" — কোনো দম্ভ নেই, কোনো বিলাসিতা নেই। মানুষের রাজা-রানির সাথে তুলনা করুন — পার্থক্যটা নিজেই বুঝবেন।
"পিঁপড়া কখনো মর্যাদার জন্য লড়ে না। সে কাজ করে। মানুষ মর্যাদার জন্য লড়ে — এবং কাজ করে না।"
— একটি পিঁপড়ার অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে (প্রকাশক খুঁজে পাওয়া যায়নি)
চতুর্থ পর্ব: দার্শনিকের কথা
অথবা: ভাবতে ভাবতে যিনি খেতে ভুলে যান
Socrates বলেছিলেন, "আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।" এটা বলার পর এথেন্সবাসী তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলল। কারণ? কারণ তিনি বলে দিয়েছিলেন যে বাকিরাও আসলে কিছু জানে না। এই কথা শোনা বড় কঠিন।
দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখলে — "সামাজিক মর্যাদা" একটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ব্যাপার। কেউ "বড়লোক" নয়, কেউ "গরিব" নয় — এগুলো আমরা মিলে তৈরি করা গল্প। টাকা? কাগজের টুকরো যার দাম আমরা মিলে ঠিক করেছি। পদবী? কিছু শব্দ যেগুলো কেউ একদিন বানিয়েছিল।
Daniel Kahneman দেখিয়েছেন, একটা নির্দিষ্ট আয়ের পর সুখ আর বাড়ে না। মানে — দৌড়ের একটা জায়গা আছে যেখানে থামলেও চলে। কিন্তু কেউ থামে না। কারণ পাশের লোকটাও দৌড়াচ্ছে।
পঞ্চম পর্ব: তাহলে কী করব?
একজন মানুষের সত্যিকারের মুক্তির একটু হাস্যরসাত্মক নির্দেশিকা
এতক্ষণ পড়ে আপনি হয়তো ভাবছেন — "বেশ তো, সব বুঝলাম। এখন কী করব?" উত্তর সহজ। কিন্তু সহজ কাজটাই সবচেয়ে কঠিন।
"জীবন একটা ট্রেন যেখানে প্রতিটা স্টেশনই গন্তব্য — যদি তুমি নামতে জানো।"
— এই লেখার লেখক, যিনি নিজে এখনো নামতে শেখেননি

শেষ কথা
পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার পেছনে একটাই খেলা — "ওরা আমাদের চেয়ে কম।" কখনো বলেছি ওরা নিচু জাত, কখনো বলেছি ওরা ভিনদেশি, কখনো বলেছি ওরা ভুল ধর্মের। কিন্তু এই "ওরা কম" বলার দরকার পড়ে কেন? পড়ে কারণ ভেতরে একটা ভয় কুরে কুরে খায় — "আমি কি আসলে যথেষ্ট? আমি কি যথেষ্ট ভালো, যথেষ্ট সম্মানীয়, যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ?" অন্যকে ছোট করলে মনে হয় নিজে বড় হওয়া গেল। এই insecurity থেকেই জাতিভেদ, দাঙ্গা, যুদ্ধ — সব কিছুর জন্ম।
কিন্তু সত্যি কথা হল — আপনাকে কাউকে ছোট করতে হবে না। আপনি এমনিতেই যথেষ্ট।
আপনি একটা অলৌকিক দুর্ঘটনা — ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের বিবর্তনে, ৪.৬ বিলিয়ন বছরের পৃথিবীর ইতিহাসে, ৩ লক্ষ বছরের মানব-যাত্রায় — আপনি এখানে আছেন। এটা কম অলৌকিক নয়।
গরিব হোন বা বড়লোক, সাধারণ মানুষ হোন বা ক্ষমতাশালী — মরার সময় একটা ছোট্ট ছয়-ফুট মাটি সবার জন্য সমান। সেই মাটি কোনো পার্থক্য করে না। তাহলে এখন, বেঁচে থাকতে থাকতে, এত পার্থক্য কেন?
এই লেখাটা পড়ে যদি মনে হয় "আমিও এরকম ভেবেছিলাম" — তাহলে আপনি একা নন। আমরা সবাই একটু একটু অসহায়, একটু একটু হারিয়ে যাওয়া — এবং সেটাই মানুষ হওয়ার আসল পরিচয়।
