যে নদী দেওয়াল হয়ে গেল
ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে শুকিয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর করুণ আর্তনাদ এবং ভারত-বাংলাদেশ জল-বণ্টন রাজনীতির এক মর্মস্পর্শী আখ্যান। কংক্রিটের দেয়াল কীভাবে একটি জীবন্ত নদীকে ইতিহাসে বন্দি করে ফেলেছে, এই গল্পটি তারই প্রতিফলন।
আমি কংক্রিট। আমি লোহা। আমি ১৯৭৫ সালের এপ্রিলের রোদে ঢালা সিমেন্ট, যার গায়ে এখনও সেই মজুরদের হাতের ছাপ আছে — যারা জানতও না তারা ইতিহাস গড়ছে না, ইতিহাস আটকাচ্ছে।
আজ একটা লোক এসেছে তার ছেলেকে নিয়ে।
ছেলেটার বয়স বড়জোর বারো। হাতে একটা প্লাস্টিকের বোতল, কপালে ঘাম, চোখে সেই প্রশ্ন যেটা বড়রা করতে ভুলে যায়।
"বাবা, নদী কোথায়?"
লোকটা — মাঝবয়সী, পাঞ্জাবির হাতা গোটানো, চুলে পাক ধরেছে — নিচে তাকাল। পদ্মার বুকে এখন ধুলো উড়ছে। চর জেগেছে যেখানে একদিন মাঝিরা নোঙর ফেলত। ছাগল চরছে সেখানে। ছাগল।
"নদী আছে," সে বলল। "মানুষ সরিয়ে দিয়েছে।"
ছেলেটা বুঝল না। আমিও একসময় বুঝতাম না — আমি তো শুধু গেট। আমাকে বলা হয়েছিল, আমি দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক হব। ১৯৭৫-এ ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন উদ্বোধনে, বাংলাদেশ তখনও বিশ্বাস করত যে প্রতিবেশী মানে আপন।
সেই বিশ্বাস কতটা টিকল, আমার গেটগুলো জানে।
"দ্যাখ," বাবাটা ছেলের কাঁধে হাত রাখল, "এই বাঁধ বানানো হয়েছিল কলকাতা বন্দর বাঁচাতে। হুগলিতে পলি জমে যাচ্ছিল, জাহাজ ঢুকতে পারছিল না। তাই ঠিক হল — গঙ্গার জল ঘুরিয়ে দাও।"
"কিন্তু পদ্মার কী হবে?"
লোকটা একটু থামল। বাতাসে পোড়া কেরোসিনের গন্ধ ভাসছে কোনো দূরের চরের গ্রাম থেকে। শুকনো নদীর বালি চকচক করছে দুপুরের রোদে — মৃত মাছের কাঁটার মতো।
"পদ্মার কথা তখন কেউ ভাবেনি বেশি। বা ভেবেছিল, কিন্তু সেই ভাবনা মিটিংরুমে থেকে গেছে।"
আমি জানি সেই মিটিংরুমের কথা। ১৯৭৭-এর চুক্তি, ১৯৯৬-এর ৩০ বছরের জল-বণ্টন চুক্তি — কাগজে কলমে ন্যায্য ভাগ, বাস্তবে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ পায় যা পায়, ভারত নেয় যা নেয়। রাজনীতি নদীর চেয়ে শক্তিশালী — এটা আমার চেয়ে ভালো কে জানে?
"তাহলে এটা প্রকৃতি না?" ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।
"না।" বাবার গলা শক্ত হল। "এই শুকনো বালি প্রকৃতির সিদ্ধান্ত না। এটা দিল্লির সিদ্ধান্ত। ঢাকার দুর্বলতা। আর আমাদের ভুলে যাওয়ার অভ্যাস।"
ছেলেটা বোতলের জল নদীর দিকে ছুঁড়ে দিল — যেন তৃষ্ণার্ত বালিকে একটু সান্ত্বনা দিতে চাইছে।
আমার গেট নড়ল না। আমি কখনো নড়ি না নিজের ইচ্ছায়।
আমাকে যে খোলে, সে রাজনীতিবিদ। আমাকে যে বন্ধ রাখে, সেও।
নদী কাঁদে। আমি শুনি। আমি কংক্রিট — আমার কাঁদার মুখ নেই।
তোমার বাবাও কি কখনো তোমাকে এমন কিছু দেখিয়েছেন যেটা পাঠ্যবইয়ে ছিল না, কিন্তু মাটিতে লেখা ছিল? এই গল্পটা তাঁকে পাঠাও।
