By Ziya Pub Mar 11

বাইক বিক্রির 'মিশন ইমপসিবল': যখন ক্রেতারা আসেন ম্যাগনেট আর ধূপকাঠি নিয়ে

গিন্নির কড়া নির্দেশ আর পকেটের টান—সব মিলিয়ে শখের বাজাজ পালসারটা বিক্রি করতে নেমেছিলেন লেখক। কিন্তু ডজনখানেক ক্রেতার অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা, জ্যোতিষতত্ত্ব আর অদ্ভূত দরদাম সামলাতে গিয়ে যা ঘটল, তা কোনো কমেডি সিনেমার চেয়ে কম নয়। কেন শেষ পর্যন্ত বাইকটি গ্যারেজেই রয়ে গেল? জানতে পড়ুন এই হাসির হাহাকারমাখা দিনলিপি।

বাইক বিক্রির 'মিশন ইমপসিবল': যখন ক্রেতারা আসেন ম্যাগনেট আর ধূপকাঠি নিয়ে
 
🏍️

বাইকটা বিক্রি হলো না

একটি মহাকাব্যিক ব্যর্থতার দিনলিপি

আমি ঠিক করলাম, বাইকটা বেচে দেব।

কারণ সহজ। বাইকটা পুরনো হয়েছে, পেট্রোল খায় বেশি, আর গিন্নি রোজ বলছেন — "ওই লোহার ভূতটা গ্যারেজ থেকে বের করো, নইলে আমি বের হব।"

তো বেচতে হবে। দেশের আইন না, গিন্নির আইন।


📱 প্রথম ঘটনা: OLX-এর মহাকাব্য

প্রথমে OLX-এ বিজ্ঞাপন দিলাম। লিখলাম: "2015 সালের Bajaj Pulsar। চালানো হয়েছে কম। কন্ডিশন ভালো।"

মিনিট দশেকের মধ্যে ফোন এলো।

"দাদা, বাইক কি চলে?"
"হ্যাঁ, চলে।"
"ইঞ্জিন কি আছে?"

আমি একটু থামলাম। "... হ্যাঁ, ইঞ্জিন আছে।"

"চাকা?"
"দুটো।"
"হ্যান্ডেল?"
"আছে।"
"আসন?"

এইবার আমি বললাম, "ভাই, বাইকের যা যা থাকার কথা, সব আছে। এটা সম্পূর্ণ বাইক। অর্ধেক বাইক না।"

লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, "ঠিক আছে দাদা, ভেবে জানাই।"

আর ফোন করেনি।


🧔 দ্বিতীয় ঘটনা: বিশেষজ্ঞ মশাই

দুপুরে একজন এলেন। বয়স পঞ্চাশের ওপর। সাথে একটা ছোট ব্যাগ।

বাইক দেখলেন। তারপর ব্যাগ খুললেন।

ভেতর থেকে বের হলো — একটা ম্যাগনেট।

বাইকের বিভিন্ন জায়গায় ম্যাগনেট লাগাতে শুরু করলেন। ট্যাংকে, চাকায়, মাডগার্ডে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কী করছেন?"

"বুঝতে পারছি না বুঝলে? দেখছি বডি অরিজিনাল কিনা।"
"ম্যাগনেট দিয়ে?"
"হ্যাঁ। ফাইবার হলে ম্যাগনেট লাগে না।"
"কিন্তু বাইকের বডি তো আয়রনই হয়।"

উনি হাত তুলে বললেন, "তুমি কী বোঝো বলো তো? আমি ২২ বছর ধরে বাইক কিনি।"

শেষমেশ ম্যাগনেট পরীক্ষায় বাইক পাস করল। উনি বললেন, "দাম কমাও ৮ হাজার।"

"কেন?"
"কারণ রং একটু ফ্যাকাশে।"

আমি বললাম, "রং ফ্যাকাশে হলে ম্যাগনেট লাগানো কেন দরকার ছিল?"

উনি ব্যাগ গুটিয়ে চলে গেলেন।


🙏 তৃতীয় ঘটনা: ভক্তিমান ক্রেতা

পরের দিন একজন এলেন লুঙ্গি পরে। চোখ বড় বড়।

বাইক দেখে প্রথমে হাত জোড় করলেন।

আমি ভাবলাম, ভদ্রলোক বোধহয় নমস্কার করছেন।

তারপর দেখলাম — উনি বাইকের সামনে একটা ধূপকাঠি জ্বালাচ্ছেন।

"কী করছেন?"
"আগে পুজো দিই। তারপর কথা।"

ধূপ দিলেন। চোখ বুঁজলেন। মিনিট দুয়েক ধ্যান করলেন।

"না। বাইকে নেগেটিভ এনার্জি আছে। কিনব না।"

"ধূপের ধোঁয়া থেকে বুঝলেন?"
"হ্যাঁ। ধোঁয়া পশ্চিমে গেছে। অশুভ।"
"পশ্চিমে বাতাস ছিল।"
"বাতাসও কি এমনি এমনি আসে?"

চলে গেলেন।

আমি সেদিন প্রথমবার ভাবলাম — বাতাস কি সত্যিই এমনি এমনি আসে? তারপর নিজেকে চড় মারলাম।


💸 চতুর্থ ঘটনা: দরকষাকষির মহারাজা

একজন ফোন করলেন। দাম জিজ্ঞেস করলেন। বললাম পঞ্চাশ হাজার।

"পঁচিশ দেব।" — "না।"
"তিরিশ।" — "না।"
"পঁয়ত্রিশ। ফাইনাল।" — "না।"

"আচ্ছা, পঁয়ত্রিশ হাজার আর একটা মিষ্টির বাক্স।"

"মিষ্টি দিয়ে বাইক কেনা যায় না।"
"রসগোল্লা হলেও না?" — "না।"
"চমচম?" — "না।"
"সন্দেশ?" — "না।"
"আচ্ছা বাদ দিন। পঁয়ত্রিশ ফাইনাল।"

লাইন কেটে দিলাম।

পাঁচ মিনিট পর আবার ফোন। "লাড্ডু হলে?"

লাইন কাটলাম।


🤳 পঞ্চম ঘটনা: ইউটিউবার ক্রেতা

একজন এলেন ক্যামেরা নিয়ে।

"আমি ইউটিউবে বাইক রিভিউ করি। আপনার বাইকটা রিভিউ করতে চাই।"
"কিনবেন?"
"আগে রিভিউ করি। রিভিউ ভালো হলে কিনব।"

বাইকে বসলেন। ক্যামেরা চালু করলেন। "হ্যালো ফ্রেন্ডস, আজকে দেখব একটা পুরনো Pulsar..."

আধঘণ্টা রিভিউ করলেন। সব দিক থেকে ভিডিও তুললেন। ইঞ্জিন চালু করলেন। সাউন্ড রেকর্ড করলেন।

"ভালোই তো। কিন্তু আমার চ্যানেলে এখন স্পোর্টস বাইকের ডিমান্ড বেশি। এটা চলবে না। আসি।"

চলে গেলেন।

ভিডিও পরে YouTube-এ পেলাম। ১২,০০০ ভিউ।

আমার বাইক বিখ্যাত হলো। বিক্রি হলো না।


👴 ষষ্ঠ ঘটনা: বাবার বন্ধু

পাড়ার কাকু এলেন।

"শুনলাম বাইক বেচছিস?"
"হ্যাঁ কাকু।"
"কত নেবি?"
"পঞ্চাশ।"

"আরে, তোর বাবার সাথে আমার বন্ধুত্ব কতদিনের জানিস? আমাকে ত্রিশে দে।"

"কাকু, বন্ধুত্বের সাথে বাইকের দামের সম্পর্ক কী?"
"আরে, সম্পর্ক না থাকলে সম্পর্ক কী কাজে আসে বলো তো?"

আমি চুপ করে রইলাম।

"পঁয়তাল্লিশ দিলে নেবি?" — "হ্যাঁ।"
"তিন মাসে?" — "না।"
"দু মাসে?" — "না।"
"এক মাসে?" — "না।"

"আরে, এখনই দিতে বলছি না তো! একটু সময় লাগবে। এখন হাতে নেই।"

"কাকু, হাতে টাকা না থাকলে বাইক কিনবেন কীভাবে?"
"হবে হবে। তুই চিন্তা করিস না।"

চলে গেলেন। আর আসেননি।

🏁 শেষ কথা

বাইকটা এখনও গ্যারেজে আছে।

গিন্নি এখন গ্যারেজে ঢোকেন না।

আমি বাইকটাকে মাঝে মাঝে দেখি। বাইকটাও আমাকে দেখে।

আমরা দুজনেই জানি — এই সম্পর্ক শেষ হওয়ার না।

হয়তো এটাই নিয়তি। হয়তো বাইক বিক্রি না হওয়াটাই ঈশ্বরের ইচ্ছা।

(দেখুন, ধর্মের প্রভাব আমার মাথাতেও ঢুকে গেছে।)

পরিশেষে বলি — পরের জন্মে বাইক কিনব না। সাইকেল কিনব। সেটাও বিক্রি হবে না। কিন্তু অন্তত ক্রেতারা ম্যাগনেট আনবে না।


— সমাপ্ত 🏍️💨

Analytics

Unique visitors

0

Visits

0

Reactions

0

💬 Comments (0)

No comments yet.

💌 Share Your Opinion With Us

📖 Read More Articles

Explore more articles and discover interesting stories from our blog.

View All Articles →